আওয়ামী লীগের মতো সাফল্য বিশ্বের প্রথম দশটি রাজনৈতিক দলের অর্ধেকেরও নেই

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আজ (২৩ জুন) আয়োজিত এক ওয়েবিনারে ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত বার বছরে বাংলাদেশ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে উন্নয়নের মহাসড়কে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন তথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উন্নয়ন দৃশ্যমান নয়। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন উপেক্ষা করলে আওয়ামী লীগ সরকারের এই উন্নয়ন অর্থহীন হয়ে যাবে। প্রাপ্তি বা অর্জনের কথা যদি বলি আওয়ামী লীগের মতো সাফল্য বিশ্বের প্রথম দশটি রাজনৈতিক দলের অর্ধেকেরও নেই।’

নির্মূল কমিটির কুমিল্লা জেলা শাখার আহ্বায়ক অধ্যাপক দীলিপ মজুমদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই ওয়েবিনারের বিষয় ছিল: ‘আওয়ামী লীগের ৭২ বছর এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শ: প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি’। ওয়েবিনারে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, প্রাক্তন বাণিজ্যমন্ত্রী এবং মুজিব বাহিনীর অন্যতম অধিনায়ক জনাব তোফায়েল আহমেদ এমপি এবং প্রধান বক্তা ছিলেন নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির। আলোচক হিসাবে উপস্থিত ছিলেন নির্মূল কমিটির আইন সহায়ক কমিটির সভাপতি বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, শহীদ ভাষাসৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পৌত্রী সমাজকর্মী আরমা দত্ত এমপি, নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সমাজকর্মী কাজী মুকুল, নির্মূল কমিটি কুমিল্লা জেলা শাখার সদস্য সচিব এডভোকেট মাসুদুর রহমান শিকদার, কুমিল্লা কোর্টের সাবেক অতিরিক্ত পিপি এডভোকেট গোলাম ফারুক, কুমিল্লা সদরের ভাইস চেয়ারম্যান তারিকুর রহমান জুয়েল, ময়নামতি মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ডা. তৃপ্তিশ ঘোষ, কুমিল্লা জেলার বিএমএ-এর সাধারণ সম্পাদক ডা. আতাউর রহমান জসীম, নির্মূল কমিটির হোমনা শাখার সভাপতি মাহাবুব খন্দকারসহ কুমিল্লা জেলার নেতৃবৃন্দ।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, প্রাক্তন শিল্পমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধুর স্নেহভাজন জননেতা তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ গঠিত হয়েছিল, স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনের মাধ্যমে সেই লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। ‘বঙ্গবন্ধু’, ‘বাংলাদেশ’ ও ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’ প্রত্যেকটি শব্দ একে অন্যের সমর্থক। পাকিস্তান আমলে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে একটি মামলায় সোহরাওয়ার্দী সাহেব কোর্টে বলেছিলেন, ‘ইফ মুজিব ইজ ডিজঅনেস্ট, দেন দ্যা হোল ওয়ার্ল্ড ইজ ডিজঅনেস্ট’। বঙ্গবন্ধু ৬৬ সনে আওয়ামী লীগের সম্মেলন শুরু করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা’ গান দিয়ে- যা বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত।’

প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর সংগ্রাম-আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘২৩ ফেব্রুয়ারি বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কারামুক্ত নেতার গণসংবর্ধনা সভার সভাপতি হিসেবে বলেছিলাম, যে নেতা তার জীবনের যৌবন কাটিয়েছেন পাকিস্তানের কারাগারে, ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন, সেই প্রিয় নেতাকে কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞচিত্তে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভ‚ষিত করলাম। ১০ লাখ লোক ২০ লাখ হাত তুলে সমর্থন করল। তখন ঘোষণা করি এবার বক্তৃতা করবেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।’ আমার জীবনে ২৩ ফেব্রুয়ারি এক ঐতিহাসিক দিন।’ তিনি আরও বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর দুটি স্বপ্ন ছিল- স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক মুক্তি। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন এবং তাঁর সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আগামীতে অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্নও বাস্তবায়িত হবে।’

আওয়ামী লীগের সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন বিভিন্ন সময়ে মৌলবাদীদের সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন, ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মতো অসাম্প্রদায়িক দল যেখানে ক্ষমতায়, সেখানে কিছুদিন আগে সুনামগঞ্জের শাল্লায় যে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমাদের কিছু ভুলত্রুটি আছে, যা থেকে আমাদের শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।’

ওয়েবিনারে প্রধান বক্তার ভাষণে শাহরিয়ার কবির আরও বলেন, ‘প্রাপ্তি বা অর্জনের কথা যদি বলি আওয়ামী লীগের মতো সাফল্য বিশ্বের প্রথম দশটি রাজনৈতিক দলের অর্ধেকেরও নেই। আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির পিতা হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। প্রধানত বাঙালি মুসলমানদের ভোটে উপমহাদেশে ১৯৪৭ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে ধর্মীয় দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান নামের যে কৃত্রিম মুসলিম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটেছিল, সেই পাকিস্তানে জিন্নাহ ও তার দল মুসলিম লীগকে চ্যালেঞ্জ করে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে তরুণ শেখ মুজিব কী কঠিন প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন মুসলিম লীগ ভেঙে ঢাকায় আওয়ামী লীগ নামক একটি অসাম্প্রদায়িক দল গঠন করেছিলেন তার বস্তুনিষ্ঠ বিবরণ পাওয়া যাবে বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে। আওয়ামী লীগের ইতিহাস ও বাংলাদেশের ইতিহাস একে অপরের সমার্থক। তবে এখন যারা আওয়ামী লীগের তরুণ নেতাকর্মী তারা আওয়ামী লীগের ত্যাগ ও সংগ্রামের ইতিহাস জানে না। একটানা এত বছর ক্ষমতায় থাকার কারণে হাল আমলের নেতাকর্মীরা দলের ইতিহাস, আদর্শ ইত্যাদি জানার চেয়ে দলের নাম ব্যবহার করে কীভাবে নিজেদের আখের গোছানো যায় তাতেই মত্ত থাকেন। আওয়ামী লীগের শতকরা এক ভাগ নেতাকর্মী বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ কিংবা বঙ্গবন্ধুর অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান ’৭২-এর সংবিধান পড়েছেন কিনা সন্দেহ।

শাহরিয়ার কবির আরও বলেন, ‘সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ সহ ধর্মের নামে রাজনীতির উপর নিষেধাজ্ঞা খারিজ করে জেনারেল জিয়া বাংলাদেশের মাটিতে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার যে বিষাক্ত বীজ বপণ করেছিলেন এবং যে বিষবৃক্ষের চারা জেনারেল এরশাদ ও খালেদা জিয়া সযত্নে লালন করেছেন, সেটি এখন মহীরুহে পরিণত হয়েছে। সরকারে আওয়ামী লীগ থাকলেও বিএনপি-জামায়াতের রাজনৈতিক দর্শনের বিষবৃক্ষের শেকড় সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা, রাজনীতি ও প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিস্তৃত হয়েছে। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের মহীরুহের শেকড় কেটে দিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধবিরোধী মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তি। অযত্ন ও অবহেলায় সেই মহীরুহ এখন মৃত্যুর দিন গুণছে। আওয়ামী লীগ শত শত কোটি টাকা ব্যয় করে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী সাড়ম্বরে উদযাপন করলেও জাতির পিতার রাজনৈতিক দর্শন তথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনরুজ্জীবিত করার কোনও উদ্যোগ নেয় নি। এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দলের গৌরবোজ্জল ইতিহাস, কিম্বা বঙ্গবন্ধুর প্রামাণ্যজীবনী লেখার উদ্যোগ নেয়া হয় নি, যা ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রদের অবশ্যপাঠ্য হওয়া উচিত।’

বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর দর্শন ছিল পৃথিবীর নির্যাতিত মানুষের দর্শন। বঙ্গবন্ধু শুধু বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য নয় বরং ফিলিস্তিন, ভিয়েতনামের মতো নির্যাতিত দেশগুলোর মুক্তির জন্যও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা করেছেন। জোসেফ টিটো, ইন্দিরা গান্ধী, ফিদেল ক্যাস্ট্রোর মতো অনেক বিশ্ব নেতৃবৃন্দ বঙ্গবন্ধুকে পরম শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। ‘বঙ্গবন্ধুর দর্শনের একটি বড় তত্ত্ব হল ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’  তিনি ‘ধর্মনিরপেক্ষতার’ ব্যখ্যা দিয়েছেন- ধর্মনিরপেক্ষ অর্থ ধর্মহীনতা নয়, বরং সকল মানুষের ধর্ম পালনের অধিকার রক্ষা করা। যা ছিল ’৭২-এর সংবিধানের অন্যতম অলঙ্কার। বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িকতার নজির সমগ্র ভারতবর্ষের জন্য বিরল।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্ষণের খবর পাওয়া যায়। কওমি মাদ্রাসা সহ সামাজিক বিভিন্ন মাধ্যমে নারীবিদ্বেষী জঙ্গীবাদী ওয়াজ-নসিহত প্রচার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মৌলবাদী শক্তি অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ। তবুও তাদের নির্মূল করা অসম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই পথেই চলেছেন। জঙ্গী মৌলবাদী শক্তিকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল না করা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর দর্শন বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হবে না।’

শহীদ ভাষাসৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পৌত্রী সমাজকর্মী আরমা দত্ত এমপি বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম না হলে ‘বাংলাদেশ’ নামক রাষ্ট্রটির জন্ম হত না। তিনি ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’ দলটির নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখিয়ে গেছেন। ‘দ্বিজাতিতত্ত্বকে লাথি মেরে ‘বাংলাদেশ’-এর মত অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠন ছিল বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বড় অর্জন। আমরাই বোধহয় শেষ প্রজন্ম যারা বঙ্গবন্ধুকে হৃদয়ে ধারণ করি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আশা রাখি- নতুন প্রজন্মও আগামীতে আমাদের মতো বঙ্গবন্ধুকে হৃদয়ে ধারণ করবে।’

ওয়েবিনারের অন্যান্য বক্তা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অনুসরণ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রাম বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনাকে সমর্থনের কথা বলেন।

বাংলা প্রবাহ/এম এম

,
শর্টলিংকঃ