ইউজিসির গণশুনানী বনাম রাবির সম্মানহানি; মতামত বিশিষ্টজনদের

  • 460
    Shares

‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের বিরুদ্ধে দুর্নীতিগ্রস্থ ও বিকৃত মস্তিস্কের শিক্ষকদের মিথ্যা অভিযোগের কারনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান ও মর্যাদাহানি হয়েছে। এসব মিথ্যা অভিযোগ তদন্তের নামে ইউজিসি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া ৭৩ এর আইনের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছে। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক ও আপত্তিকর। একটি স্বায়ত্বশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে ডেকে ইউজিসি গণশুনানি কোন ভাবেই অব্যাহত রাখতে পারে না। ধীক্কার জানাই সেই সকল শিক্ষক নামধারী কুলাঙ্গারদের প্রতি যারা নিজেদের দুর্নীতি-অপকর্ম আড়াল করার জন্য মিথ্যা অভিযোগ ছড়ানোর মাধ্যমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মান-সম্মান নষ্ট করছে। ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের বিরুদ্ধে কতিপয় শিক্ষকের দুর্নীতির অভিযোগ এবং ইউজিসির গণশুনানির বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের প্লাটফরম ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধে বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ’ এর একাধিক শিক্ষক এসব কথা বলেন। তারা আরও উল্লেখ করেন, ‘মিজান-সজল (২০১৩-২০১৭) প্রশাসনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে হওয়া নানা অনিয়ম-দুর্নীতি-লুটপাটের বিচার বন্ধ রাখার জন্যই এসব ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে।‘

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মিজান-সজল প্রশাসনের নানা দুর্নীতি-অনিয়ম-লুটপাটের তদন্ত না করে ইউজিসি কর্তৃক বর্তমান প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগের গণশুনানির আয়োজন করায় ক্যাম্পাসে তীব্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাচ্ছে। কেননা অভিযোগকারীদেই বিরুদ্ধেই দুর্নীতির নানা অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে আরও জানা যায় অভিযোগকারীদের অনেকেই জামাত-বিএনপির সাথে ঘনিষ্ঠ এবং স্বাধীনতা বিরোধীদের ছাত্র সংগঠন ‘ছাত্র শিবিরের কাছ থেকে উৎকোচ গ্রহন করেছিলেন। এছাড়া প্রশ্ন উঠেছে ইউজিসির তদন্ত টিমের নিরপেক্ষতা নিয়েও।

শিক্ষা ও গবেষনা ইনিস্টিউটের প্রভাষক এন এ এম ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘চিহ্নিত কয়েকজন অসৎ ব্যক্তি নিজেদের দুর্নীতি চাপা দিতে উল্টো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নামে মিথ্যা অভিযোগ ও তথ্য প্রচার করছেন। যার ফলে শিক্ষকদের ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানহানি ও ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। তাদের হীন কর্মকান্ডে শিক্ষকসমাজ বিব্রত। বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা রক্ষার্থে শিক্ষকসমাজের এদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া জরুরি।’

বর্তমান প্রশাসনের বিরুদ্ধে যারা নানা অপ্রপচার ছড়াচ্ছেন তারা প্রায় সকলেই সাবেক ভিসি-প্রভিসি যথাক্রমে মিজান-সজলের ঘনিষ্ঠজন। সাবেক প্রশাসন এবং তাদের সহযোগীদের পরিচয় তুলে ধরে রাবি’র সাবেক শিক্ষার্থী ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য আখেরুজ্জামান তাকিম বলেন, ‘মিজান উদ্দিন -সরোয়ার জাহান সজল সাবেক এই প্রশাসন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অতিথি ভবনের জমি কেনার নামে ১৩কোটি ২৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে। শুধু তাই নয়! বঙ্গবন্ধু ও শহীদ বুদ্ধিজীবি ভাস্কর্য নির্মাণে প্রকল্পের জন্য বরাদ্দকৃত ৮২ লাখ টাকা হরিলুট করেছে। এই স্মৃতিফলকে জাতির পিতাকে চরমভাবে অবমাননা করা হয়। এমন কোন দুর্নীতি ও সেচ্চাচারীতা নাই যা সাবেক উপাচার্য মিজান উদ্দিন করেননি। টেন্ডার ছাড়া ২০ কোটি টাকার সার্টিফিকেট মুদ্রনের জন্য বিদেশি কাগজ কিনেছে। মিজানের কুকর্মের অন্যতম হোতা সাবেক গ্রন্থাগার প্রশাসক ও বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সফিকুন্নবী সামাদী হেকেপ প্রজেক্টের কোটি টাকা হরিলুট করেছে। লিফটের জন্য বরাদ্দকৃত ৮৪ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে কিন্তু লিফট নেই। ভাউচারে ১০ টাকার কলম ১১০০০ টাকায় কিনেছে।’

‘থেমে নেই ওয়ান-ইলেভেনে ফ্রিডম পার্টির নেতাসহ বিএনপি-জামাতের পৃষ্ঠপোষকতা করা ষড়যন্ত্রকারীরা। জামাত-শিবিরের পৃষ্ঠপোষক এই শিক্ষকরাই একসময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই সময়ে শিবির-জামাতকে করেছে সুপ্রতিষ্ঠিত। এরকম হাজারো অপকর্ম করে গেছে সাবেক প্রশাসন। দুর্নীতি করে লক্ষ লক্ষ অবৈধ টাকা ইনকাম করে বিলাসী জীবন যাপন করা এই দুর্নীতিবাজরাই এখন দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে ব্যস্ত। মনে হয় দুর্নীতির টাকা শেষ হয়ে গেছে, তাই যন্ত্রণায় ছটফট করছে। তাদের সমস্ত অপকর্মের নথি জাতির সামনে আবারও উম্মোচন হোক।’

উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সিনিয়র শিক্ষক জানান, ‘উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম আব্দুস সোবহানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন থেকে স্বার্থান্বেষীমহল প্রগতিশীলতার মুখোশ পড়ে নানা ধরনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। কেননা এসব স্বার্থান্বেষীমহল ঠিক মতই জানে যে, অধ্যাপক আব্দুস সোবহান উপাচার্যের দায়িত্বে থাকলে কখনোই তারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতে পারবে না।’

ইউজিসির তদন্ত সম্পর্কে রাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম আব্দুস সোবহান তাঁর অবস্থান পরিষ্কার ভাবে তুলে ধরেছেন। ইউজিসির চেয়ারম্যানকে লেখা চিঠিতে তিনি বলেছেন, “যে-কোন অভিযোগ আমলযাগ্যো হলে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণপূর্বক তার তদন্ত হওয়াই বাঞ্চনীয়। আমি তাই দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই যে, আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগসমূহের তদন্ত হোক-এ বিষয়ে আমি শতভাগ সম্মত। তবে সেই তদন্ত কমিটি অবশ্যই যথাযথ আইনসিদ্ধভাবে গঠিত হওয়া বাঞ্চনীয়। বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্যকে আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা খর্ব করে অপদস্থ করা সমিচীন নয়।”

রাজশাহীর প্রগতিশীল আন্দোলনের সাথে জড়িত একাধিক ব্যক্তি জানান, ‘অধ্যাপক ড. এম আব্দুস সোবহান সেই মানুষ, যিনি সেনা পরিচালিত তত্ত্ববধায়ক সরকারের সময় অর্থাৎ ১/১১ সময় জাতির জনকের কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার মুক্তি আন্দোলনে ১০৪ দিন জেল জুলুম অত্যাচার সহ্য করেছিলেন; কিন্তু আপোষ করেননি; মুচলেখা দিয়ে পালিয়ে থাকেন নি ৷  যে বিশ্ববিদ্যালয়টি একসময় শিবিরের ক্যান্টনমেন্ট বলে পরিচিত ছিল সেই বিশ্ববিদ্যালয়কে তিনি তাঁর ১ম মেয়াদেই শিবির মুক্ত করেছিলেন।’

‘অধ্যাপক ড. এম আব্দুস সোবহান বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবনের নাম জাতীয় নেতাদের এবং  মুক্তিযোদ্ধাদের নামে নামকরন করেন। তার দায়িত্বকালীন সময়ে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল নির্মাণ করা হয়। নির্মিত হতে যাচ্ছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নামে শেখ হাসিনা হল ও জাতীয় চার নেতার অন্যতম এ.এইচ.এম. কামারুজ্জামান হল, বঙ্গবন্ধু কমপ্লেক্স এবং নির্মাণ সমাপ্তির পথে শেখ রাসেল মডেল স্কুল। শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালায় বঙ্গবন্ধু কর্ণার স্থাপন, প্রশাসন ভবনের নিচতলায় বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি ও ৭ই মার্চের ভাষণের স্মৃতি স্মারক স্থাপন, প্রশাসন ভবনের নিচতলায় বিশ্ববিদ্যালয় আর্কাইভ প্রতিষ্ঠা, বঙ্গবন্ধু হলে জাতির পিতার ম্যুরাল, নবাব আব্দুল লতিফ হলের ২য় তলায় বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ও বঙ্গবন্ধু পাঠাগার স্থাপন, শহীদ শামসুজ্জোহা হলের সামনে শামসুজ্জোহার ম্যুরাল স্ফুলিঙ্গ, শহীদ হবিবুর রহমান হলের সামনে হবিবুর রহমানের ম্যুরাল(কলাম), ৪র্থ বিজ্ঞান ভবনের নাম বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ড.এম ওয়াজেদ আলীর নামে নামকরণ, শেখ কামালের নামে স্টেডিয়ামের নামকরন। ২০ তলা বিশিষ্ট বিজ্ঞান ভবন, ১০ তলা বিশিষ্ট শিক্ষক কোয়ার্টার ও সবুজ সীমানা প্রাচীরসহ আনুষঙ্গিক নির্মাণ এবং চতুর্থ বিজ্ঞান ভবন, কলা অনুষদ ভবন ও চারুকলা ভবন সম্প্রসারনের কাজ দ্রুতই শুরু হবে।’

উপাচার্য ড. এম আব্দুস সোবহানের আন্তিক প্রচেষ্টায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সর্বোচ্চ উন্নয়ন বরাদ্দ (৫১০ কোটি ৯৯ লক্ষ টাকা) দেওয়া হয়েছে। যা গত মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০) মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন করা হয়।

উপাচার্যের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এবং ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদ জানিয়ে রাবি শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি মাসুদ রানা বলেন, ‘যারা নিজের স্বার্থ হাসিল করার জন্য একজন বঙ্গবন্ধু প্রেমিকে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে সম্মানহানি করে তারা কখনো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হতে পারেনা। তারা জামাত বি এন পির পেতাত্মা। সবার প্রতি আহবান আসুন এদের আমরা বর্জন করি৷’

ফার্সি বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. ওসমান গনী বলেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক ছাত্র এবং একটি বিভাগের প্রফেসর ও সভাপতি হিসেবে আমি মনে করি যে, তারা শুধু ব্যক্তি প্রফেসর এম আব্দুস সোবহান স্যারের মান-সম্মান নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৬ হাজার ছাত্রছাত্রীর আত্মবিশ্বাস ও সম্মানে আঘাত করেছেন। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়ের মানহানী করার চক্রান্তে মেতে উঠেছে। এমন চক্রান্তকারীদেরকে ইতিহাস কখনো ক্ষমা করবেনা।’

বিশ্ববিদ্যালয়টির আবাসিক হলের প্রাধ্যক্ষদের নিয়ে গঠিত ‘প্রাধ্যক্ষ পরিষদ’ এর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে (১৬ সেপ্টেম্বর) বলা হয়েছে, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম. আব্দুস সোবহানের বিরুদ্ধে ‘অনিয়ম ও দুর্নীতি’র অভিযোগ তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) গণশুনানি আহ্বান করায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের প্লাটফরম ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধে বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ’ এর আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মজিবুর রহমানের সাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতেও (৩ সেপ্টেম্বর) ‘তদন্ত টিমকে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তদন্ত করার আহ্বান জানান এবং উপাচার্যের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ও ষড়যন্ত্রের নিন্দা জানান।’

চারুকলা অনুষদের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. হুমায়ুন কবির  বলেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের বিরুদ্ধে গঠিত তদন্ত কমিটি যেমন আইনসিদ্ধ নয় ঠিক তেমনই দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগকারী শিক্ষকদের বিরুদ্ধেই দুর্নীতির নানা অভিযোগ রয়েছে, তাদের অভিযোগও গ্রহনযোগ্যতা হারায়। অর্থাৎ বিষয়টি এমন হলো “চোরের মায়ের বড় গলা”। মূলত এই সকল শিক্ষকমন্ডলী নিজের দুর্নীতিকে আড়াল করতেই এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান রক্ষার্থে এদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া জরুরী।

বাংলা প্রবাহ/এম এম

, , ,
শর্টলিংকঃ