নির্মূল কমিটি এক আন্দোলনের নাম

১৯ জানুয়ারি একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। ২৮ বছর আগে ১৯৯২ সালের এই দিনে কর্নেল কাজী নুরুজ্জামান ও লেখক, সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরের উদ্যোগে গঠিত হয় একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। শহীদজননী লেখক জাহানারা ইমাম হন এর আহ্বায়ক।

১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর  একাত্তরের কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী এবং তখনো পাকিস্তানের নাগরিক গোলাম আযমকে জামায়াতে ইসলামী তাদের আমীর ঘোষণা করেন। তখন মুক্তিযুদ্ধের সাত নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক কর্নেল কাজী নুরুজ্জামান এবং লেখক, সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির এর বিরুদ্ধে বড় ধরনের প্রতিবাদের প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র বিশ বছরের মাথায় চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধী, রাজাকার, আলবদর এবং আল শামসরা যখন রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠছিলেন সে সময় তাদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করার জন্য একটি সংগঠন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এই অনুভব থেকেই সেদিন প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল ১০১ সদস্য বিশিষ্ট একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। যা আজও সংগঠনটির লক্ষ্য ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়নি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধের সময় যেসব রাজাকার, আলবদর, আলশামস, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সদস্যদের সহায়তা করেছে তাদের বিচারের জন্য ১৯৭২ সালের ২৪শে জানুয়ারি দালাল আইন প্রণয়ন করা হয় এবং ১৯৭৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এই আইনের আওতায় ২,৮৮৪টি মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় সাজা দেওয়া হয় ৭৫২ জনকে। এদের মধ্যে মৃত্যুদন্ড, যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ-প্রাপ্ত আসামি ছিল। ১৯৭২ সালের ১৭ই মার্চ শহীদদের পরিবারবর্গের পক্ষ থেকে পাক যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ঢাকার রাজপথে মিছিল বের হয়। মিছিলে পাক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি করা হয়। শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী যিনি নির্মূল কমিটির সহসভাপতি, তিনিও ঐ মিছিলে উপস্থিত ছিলেন।

১৯৭২ সালের ১৬ই মে বঙ্গবন্ধু সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘বাংলাদেশে পাক হানাদার বাহিনীর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্দেশ্যে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্ডিন্যান্স প্রণয়নের কাজ এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে কলাবরেটর আইনের অধীনে কলাবরেটর-দালালদের বিচারের কাজ শুরু হয়ে গেছে।’

১৯৭৩ সালের ১লা জুনের এক খবরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পর্কে বলা হয়, ‘টোকিও ও নুরেমবার্গ বিচারের সময় যে মূলনীতি অনুসরণ করা হয়েছিল তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনে একটি বিল পেশ করা হবে।’

সে লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল আদালত গঠন করেন এবং বিচার কাজ অব্যাহত রাখেন।

কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যা এবং ৩রা নবেম্বর  জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যার মাধ্যমে এই বিচার প্রক্রিয়াকে বন্ধ করা হয়। ১৯৭৫ সালের ৩১শে ডিসেম্বর জেনারেল জিয়াউর রহমান সামরিক অধ্যাদেশ জারী করে দালাল আইন বাতিল করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। দালাল আইন বাতিল করার পর সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের কারাগার থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

১৯৭৮ সালে ১১ই জুলাই গোলাম আযম অসুস্থ মাতাকে দেখার অজুহাতে পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়ে ৩ মাসের ভিসায় ঢাকা আসেন এবং জামায়াতে ইসলামকে পুনর্গঠন করেন। বঙ্গবন্ধু সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিলেন এবং সাম্প্রদায়িক ও যুদ্ধাপরাধী দল হিসাবে জামায়াতে ইসলামকে নিষিদ্ধ করেছিলেন কিন্তু পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান জামায়াতকে রাজনীতিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। জেনারেল এরশাদ ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করণের লক্ষ্যে জিয়াউর রহমানের আদর্শ অনুসরণ করে জামায়াতে ইসলামকে বিভিন্ন ভাবে সহযোগিতা করেন। জিয়ার শাসন আমল থেকেই মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার মানুষ ভুলতে বসেছিল। জিয়াউর রহমান এদেশের মানুষকে বোঝাতে চেয়েছিলেন একাত্তরকে আঁকড়ে ধরে দেশকে এগিয়ে নেওয়া যাবে না। একাত্তর ভুলে মূলভিত্তি হিসাবে জিয়া এবং এরশাদ বেছে নিলেন ১৯৪৭ সালকে। পাকিস্তানী ভাবধারায় তারা রাষ্ট্র পরিচালনা করতে শুরু করলেন এমনকি পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়াও একই পথ অনুসরণ করেন। ১৯৯১ সালে জামায়াতে ইসলামের সমর্থন নিয়ে বি এন পি সরকার গঠন করেন।

ফলে জামায়াতে ইসলাম সরকারের অংশীদার হিসাবে তাদের পুরানো চেহারায় ফিরতে শুরু করেন। একাত্তর সালে জামায়াতে ইসলাম যে অপরাধ করেছিল তা তারা বেমালুম ভুলে গেল। গোলাম আযমকে জামাতের আমীর নির্বাচিত করা হল। একাত্তরে যে লোকটা রাজাকার বাহিনী ও শান্তি কমিটি গঠন করে এদেশের লক্ষ লক্ষ মা বোনের ধর্ষণের নেতৃত্ব দিয়েছেন, বহু বোনকে করেছেন বিধবা, মাকে করেছেন সন্তানহারা- সেই লোকটি এদেশের রাজনীতি করবেন তা হতে পারে না। যিনি এদেশের স্বাধীনতা চাননি, তিনি এই স্বাধীন বাংলাদেশের নেতা হবেন তা এদেশের সচেতন মানুষ মেনে নিতে পারেননি। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তে ভেজা মাটিতে দাঁড়িয়ে গোলাম আযমের উদ্যত এদেশের বুদ্ধিজীবী তথা সিভিল সোসাইটি মেনে নিতে পারেননি। তাই তো সেদিন বিবেকবান মানুষেরা আবার ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন ৭নং সেক্টরের অধিনায়ক কর্নেল কাজী নুরুজ্জামান ও লেখক, সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরের উদ্যোগে এদেশের খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক, ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হল একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। ১৯৯২ সালের ১৯ই জানুয়ারি ১০১ সদস্যবিশিষ্ট একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হয় জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে। তিনি হন এর আহ্বায়ক। এর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী প্রতিরোধ মঞ্চ, ১৪টি ছাত্র সংগঠন, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক জোট, শ্রমিক-কৃষক-নারী এবং সাংস্কৃতিক জোটসহ ৭০টি সংগঠনের সমন্বয়ে পরবর্তীতে ১১ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ গঠিত হয়।

সর্বসম্মতিক্রমে এর আহ্বায়ক নির্বাচিত হন জাহানারা ইমাম। এই কমিটি ১৯৯২ সালে ২৬শে মার্চ ’গণআদালত’ এর মাধ্যমে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একাত্তরের নরঘাতক গোলাম আযমের ঐতিহাসিক বিচার অনুষ্ঠান করে। গণআদালাতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে দশটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপিত হয়। ১২ জন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত গণআদালতের চেয়ারম্যান শহীদজননী জাহানারা ইমাম গোলাম আযমের ১০টি অপরাধ মৃত্যুদন্ডযোগ্য বলে ঘোষণা করেন।

১৯৯৪ সালে শহীদজননী জাহানারা ইমামের মৃত্যুর পর এই আন্দোলনে কিছুটা  ভাটা পড়ে। ২০০১ সালে বি এন পি জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসে এবং জামায়াত শিবিরের ক্যাডার বাহিনী কর্তৃক সারা দেশে সংখ্যালঘুদের উপর ধর্ষণ, হত্যা, জ্বালাও পোড়াও একাত্তরের দিনগুলির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে জামায়েত-শিবির মরিয়া হয়ে উঠে। ভোলার চরফ্যাশনে ২০০ নারীকে ধর্ষণ করা হয়, সিরাজগঞ্জের পূর্ণিমা রাণী শীলের উপর চালায় পাশবিক নির্যাতন, যশোরের মালো পাড়ায় ধর্মীয় সংখ্যালঘু নিম্ন বর্ণের হিন্দুদের উপর ভয়াবহ নির্যাতন দেশবাসীকে হতবাক করে দেয়। আবারও সাধারণ মানুষের পাশে থাকার দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা করে নির্মূল কমিটি। নির্মূল কমিটির নেতৃবৃন্দ ছুটে যান দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এবং পাশে দাঁড়ান মানবিক সাহায্য নিয়ে। জামায়াতে ইসলামের এক কর্মী সম্মেলনে ইঞ্জিনিয়ার ইন্সটিটিউটের গেটে এক দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধার উপর শিবির নেতারা নির্যাতন চালায়। বাংলাদেশের মানুষ সেদিন হতবাক হয়ে সেই নির্লজ্জ ঘটনা দেখেছে।

সোচ্চার হয়েছে নির্মূল কমিটি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে এক হয় সারা বাংলাদেশের মানুষ। ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার ঘোষণা দেয়। জাতীয় পার্টিও তার ইশতেহারে রাজাকারের বিচারের বিষয়টি যুক্ত করেন। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটকে জয়ী করতে নির্মূল কমিটি সহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে। নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন। যুদ্ধাপরাধীর বিচারের ঘোষণা দেন এবং ট্রাইবুনাল গঠন  করেন। যা নির্মূল কমিটির দীর্ঘদিনের আন্দোলনের বিজয় বলে মনে করা হয়। ২০১৩ সালে রাজাকার কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন সাজাকে কেন্দ্র করে গণজাগরণ মঞ্চ শাহবাগে গণআন্দোলন শুরু করলে নির্মূল কমিটি সর্ব প্রকার সহযোগিতা অব্যহত রাখে। কাদের মোল্লার ফাঁসীর দাবীতে সারাদেশে জনমত গঠনে জোরালো ভূমিকা পালন করে নির্মূল কমিটি। অতঃপর সরকার আইন সংশোধন করে রাষ্ট্রপক্ষকে আপীলের সুযোগ প্রদান করে কাদের মোল্লাকে ফাঁসীর আদেশ- দেন। নির্মূল কমিটি দেশের প্রচলিত আর দশটা সংগঠনের মত নয়। নির্মূল কমিটি একটি আন্দোলনের নাম। নির্মূল কমিটির দীর্ঘদিনের আন্দোলন সংগ্রামের পর আজ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন হয়েছে এবং এখনও চলমান রয়েছে। যে লক্ষ্যে নির্মূল কমিটি গঠন হয়েছিল সে লক্ষ্য পূরণ হয়েছে বলে নির্মূল কমিটির  আন্দোলন এখনও শেষ হয়নি। জামায়াতে ইসলামকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে নিষিদ্ধ করতে হবে। এছাড়া এদেশের সংখ্যালঘু স¤প্রদায়ের উপর নির্যাতন বন্ধে সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়নের জন্য দীর্ঘদিন ধরে  সরকারের নিকট দাবী করে আসছে। বঙ্গবন্ধু যে অসা¤প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, নির্মূল কমিটি সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছে।

শোষণহীন সমাজ, জঙ্গি মুক্ত বাংলাদেশ নির্মাণে, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গঠনে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ ও তত্ত্বাবধানে প্রণীত সংবিধানের ৪টি মূল স্তম্ভ ফিরিয়ে এনে ১৯৭২ সালের সংবিধান পুনঃস্থাপনই এখন নির্মূল কমিটির আন্দোলনের মূল লক্ষ্য।

 

লেখকঃ আসাদুজ্জামান বাবু

এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

দপ্তর সম্পাদক, কেন্দ্রীয় আইন সহায়ক কমিটি, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।

, ,
শর্টলিংকঃ