নির্মূল কমিটি প্রতিষ্ঠার আগে ও পরে

১৯৭৩ সালে আমি ইসকাটনে ছিলাম। দোতলা বাড়ির নিচের তলায় পান্না কায়সার, ওপরে আমি। বাড়িটি বঙ্গবন্ধু দিয়েছিলেন। যে সব শহিদ পরিবারের ঘরবাড়ি ছিল না তাদের তখনকার সরকার এভাবে পুনর্বাসন করেছিল। যাদের ছিল তাদেরকেও দেয়া হয়েছে অনেক ক্ষেত্রে।

ওই বাসায় একদিন নাফিসা কবির এলেন। তিনি নিজেই আমার সাথে পরিচিত হতে চেয়েছিলেন। নাফিসা কবির শহিদ শহীদুল্লাহ কায়সার ও জহির রায়হানের বোন। আমার সাথে পরিচয়ের সূত্র হলো তাঁর স্বামী ডাঃ আহমদ কবির আমার স্বামী শহিদ ডাঃ আলীম চৌধুরীর সহপাঠী এবং বন্ধু ছিলেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় দুজনে যৌথ সম্পাদনায় ‘যাত্রিক’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করতেন। এ পত্রিকায় জহির রায়হান সহ তৎকালীন অনেক খ্যাতিমান কবি, সাহিত্যিক লিখেছেন। এসব সূত্রের চেয়েও যে বড় সম্পর্কটি আমাদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল তা হলো আমরা শহিদ পরিবারের সদস্য। একজনের ব্যথা অন্যজন অন্তর দিয়ে অনুভব করি।

নাফিসা কবির যুদ্ধাপরাধী ও তাদের বিচার সম্পর্কে আমাকে বুঝিয়ে বললেন। পান্নাকেও নিশ্চয় বলেছিলেন। নাফিসা আপা দু’ভাইকে হারিয়ে আমার মতোই শোকার্ত ছিলেন। তিনি তাঁদের কায়েতটুলির বাসায় একটি সভা করেন। শহিদ পরিবারের অনেকে ওখানে ছিলেন। ওখানে কীভাবে আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা আমাদের দাবী জানাবো এ সংক্রান্ত আলাপ হয়। নাফিসা কবিরের সাথে শাহরিয়ার কবিরও আন্দোলনকে সংগঠিত করতে সক্রিয় ছিলেন। কবির চৌধুরী, মুনতাসীর মামুন এবং আরও অনেকে এর সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। শহিদ বুদ্ধিজীবীদের স্ত্রীরা তো ছিলামই।

১৭ মার্চ আমরা শহিদ মিনারে সভা করি। অনেকে বক্তৃতা করেন। সভা শেষে ব্যানার, ফেস্টুন নিয়ে বঙ্গভবনে যাই। বঙ্গবন্ধু গেটের কাছে এসে আমাদের কাছ থেকে স্মারকলিপি গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, “বোন তোমরা ফিরে যাও। আমি অবশ্যই এর বিচার করবো।” এরপর আন্দোলনটি তখনকার মতো স্থগিত ছিল। ওই ’৭৩ সনেই বঙ্গবন্ধু বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠন করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেন। আমরা ন্যায়বিচার পাবো এই আশায় অপেক্ষমান ছিলাম।

১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আমাদের সব আশা-ভরসার পরিসমাপ্তি ঘটেছিল। শুধু তাই নয়, জিয়াউর রহমান, এরশাদ, খালেদা জিয়া ধারাবাহিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের সব অর্জন ধূলিসাৎ করেছেন। এ সব কাহিনী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকলেই জানেন।

আমাদের স্বজন হারাবার শোক শতগুণে বেড়েছে তখন সরকারের সকল কর্মকান্ডে। মনে হতো ত্রিশ লক্ষ শহিদের আত্মদান পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে গেল।

১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি শহিদজননী জাহানারা ইমাম ১০১ জন নাগরিক নিয়ে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠন করেন। আমরা গভীর অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষে এক ক্ষীণ আলোর রেখা দেখতে পেলাম। মনে হলো, না সব হারিয়ে যায় নি। নির্মূল কমিটির পরবর্তী কার্যক্রম এতোদিনে সকলের অন্তরে স্থায়ী আসন রচনা করতে সক্ষম হয়েছে। তবে স্বাধীনতা বিরোধী পাকিস্তানের প্রেতাত্মা বিএনপি জামায়াত এবং তাদের সাথে আঁতাত করা দলসমূহ অবশ্যই এ কমিটির ঘোর বিরোধী।

তাতে দমবার পাত্র নন নির্মূল কমিটির নেতা ও সদস্যগণ। আমাদের তিনটি স্তম্ভ সভাপতি শাহরিয়ার কবির, সহ-সভাপতি মুনতাসীর মামুন এবং সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল ওসব বিরুদ্ধ শক্তিকে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করেন না। যেখানে অন্যায় সেখানেই তাঁরা পর্বতসমান দৃঢ়তা নিয়ে রুখে দাঁড়ান। সঙ্গে থাকে অসম সাহসী কর্মীবাহিনী।

নির্মূল কমিটির কাজের পরিধি ব্যাপক। একটি বলিষ্ঠ ও কার্যকর সংগঠন দাঁড় করাতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন নেতৃবৃন্দ। দেশজুড়ে ওয়ার্ড ও থানা পর্যায়ে তরুণ কর্মীদের জন্য কর্মশালা করা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নতুন প্রজন্মকে সচেতন করা। মুক্তিযুদ্ধের শহিদ স্মৃতি পাঠাগার স্থাপন। মুক্তিযুদ্ধ মেলা, দেশের প্রায় সকল জেলা-উপজেলায় সম্মেলন করা হচ্ছে নিয়মিতভাবে। পাশাপাশি রয়েছে প্রতিবছর শহীদজননী জাহানারা ইমাম বক্তৃতা। শহীদজননী জাহানারা ইমাম স্মৃতিপদক প্রদান, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার প্রতিনিধিদের সাথে মতবিনিময়, সব জাতীয় দিবস উদযাপন।

সামাজিকভাবে রয়েছে নির্মূল কমিটির বিস্তারিত কর্মসূচি। দুঃস্থ মুক্তিযোদ্ধা, দুঃস্থ শহিদ পরিবার এবং একাত্তরের নির্যাতিত মা-বোনদের সহায়তা, সা¤প্রদায়িক নির্যাতনের শিকার পরিবারের চিকিৎসা। আইনি ও আর্থিক সহযোগিতা নিয়মিতভাবে করা হয়। মানব ও প্রকৃতি সৃষ্ট দুর্যোগের সময় নির্মূল কমিটি সবার আগে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শুরু করে। তখন দেশের যে কোন প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি সাহায্য নিয়ে সবার আগে উপস্থিত হন।

রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পর্যায়ে যে কোন ভুল-ত্রুটি, অন্যায়, বৈষম্যের বিরুদ্ধে অতিদ্রুত সংবাদ সম্মেলন করা, স্মারকলিপি দেয়া, গণমাধ্যমে প্রতিবাদ প্রকাশ এবং করণীয় নির্ধারণ নির্মূল কমিটির নিয়মিত কাজ। কোন কোন ক্ষুদ্র গোষ্ঠী বা স¤প্রদায় যখন মৌলবাদী সন্ত্রাসীদের আক্রমণের শিকার হয় তখন সব ভয়ভীতি, হুমকি ধমকি উপেক্ষা করে তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রতিবাদ করা নির্মূল কমিটির অবশ্য কর্তব্য। সমাজের যে কোন অনাচারের বিরুদ্ধে সর্বাগ্রে ‘প্রেস বিজ্ঞপ্তি’ দিতে কখনও ভুল হয় না নির্মূল কমিটির।

গত কয়েক বছর ধরে নেতৃবৃন্দ দলে নতুন রক্ত সঞ্চালনের জন্য তরুণদের সম্পৃক্ত করছেন। আগ্রহী এবং নিবেদিতপ্রাণ তরুণরাও এগিয়ে আসছেন। এটি আমাদের মধ্যে আশা জাগিয়েছে। নেতাদের শতভাগ নির্মোহ, নির্ভেজাল, অকুণ্ঠ মানবতা। অসাম্প্রদায়িক চেতনা, দেশপ্রেম ও আন্তরিকতা নতুন নেতৃত্ব গঠনের ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা রাখছে। ভবিষ্যতে তাঁদের নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে নির্মূল কমিটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে অবশ্যই।

এই ব্যতিক্রমধর্মী অনন্য সংগঠনটি এখন দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বৈশ্বিক পরিমন্ডলেও যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছে। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস, মৌলবাদ ও মানবতার লঙ্ঘন যেখানেই হচ্ছে সেখানেই সোচ্চার প্রতিবাদও সক্রিয়ভাবে উপযুক্ত অংশগ্রহণ করে চলেছে। এটি আমাদের অনেক গৌরবের বিষয়। এতো কিছুর পেছনে কারও কোন ব্যক্তিগত প্রাপ্তির ছিঁটেফোঁটা গন্ধও নেই। শুধুই আছে মানবিকতা। আমরা তা মোটা দাগে জাহির করতে পারি। ভবিষ্যতের নেতাদের কাছে অনুরোধ রাখছি তাঁরা যেন সকল কলুষমুক্ত নির্মূল কমিটির পবিত্রতা ও সততার প্রতি নিবেদিতপ্রাণ থাকেন। রাজাকারমুক্ত অসাম্প্রদায়িক মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঋদ্ধ বাংলাদেশ গড়ায় যথাযথ ভূমিকা রাখেন।

লেখকঃ শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী

শিক্ষাবিদ ও শহীদজায়া। সহসভাপতি, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।

, , ,
শর্টলিংকঃ