বকুলের মালা

প্রতিদিনের মতো আজকেও নিতু রাস্তার পাশে একটি ছাতিম গাছের নিচে দাড়িঁয়ে শুভ্রের জন্য অপেক্ষা করছে। আজকে নিতুর মন ভালো না। নীল সাদা শাড়ি, বাতাসে কালো চুল উড়ছে,চোখে হালকা কাজল আর কপালে একটা ছোট্ট টিপ পড়া নিতু নামের মেয়েটি অনার্স ২য় বর্ষে প্রাণীবিদ্যা বিভাগে পড়ে। কিছুক্ষণ পর শুভ্র এলো। এসেই একটি সিগারেট ধরালো।

আজকেও তুমি লেইট? কোন দায়িত্ব নেই তাই না? একটা মেয়েকে প্রতিদিন এইভাবে রাস্তার পাশে দাড় করিয়ে রাখো, একটানা অনেকগুলো কথা বলার পর নিতুর চোখ দুটি ছলোছলো করছে। তুমি তো নিয়ম করে সিগেরেটের ধোঁয়া উড়িয়ে নামে মাত্র প্রেমিকের মহান দায়িত্ব পালন করছো, আর এদিকে আমি? প্রতিদিন একটার পর একটা বিয়ের সম্বন্ধ আটকাচ্ছি। শুভ্র একটা বকুলের মালা নিতুর চুলে পড়িয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বললো – ওগো এমন করো কেন? চাকরিটা পেয়ে গেলেই আমরা বিয়ে করবো, আমিও তো চাই তুমি আমার হও,
নিতু বাসায় যেয়ে দেখলো, আজকেও পাত্রপক্ষ এসেছে। কিছু করার নেই, প্রত্যেকবারের মতো নিতু শাড়ি চুড়ি পড়ে পাত্রের সামনে গেল।

পাত্রের নাম মোঃ রিয়াদ হাসান, সুর্দশন এবং সুপাত্র বটে। নিতুর বাবারও বেশ পচ্ছন্দ হয়েছে , অপাত্রে কন্যা দান করার মানুষ তিনি নন। এক সময় সেনাবাহিনীতে উচ্চপদে ছিলেন। তাই এসব তিনি ভালো বুঝেন। অনেক পরীক্ষা নিরিক্ষার পর ঠিক হলো আজকেই বিয়ে হবে। অবশেষে বিয়েটা হয়ে গেল।নিতুর সবকিছু এলোমেলো লাগছে। শুভ্রর সাথে কাটানো সোনালী দিনগুলো চোখের সামনে বার বার ভেসে উঠছে। বেচারা শুভ্র হয়তো এতোক্ষণে জেনে গেছে তার চার বছরের সাজানো ফুলের বাগান আজ অন্যকারও ফুলসজ্জার জন্য সাজানো হয়েছে। নিতু খাটের উপর বসে কাঁদছে, হঠাৎ রিয়াদ এককাপ চা এনে নিতুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো -চা খাও ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে। নিতু চুপচাপ কাপটি নিয়ে বাধ্য বউয়ের মতো চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে লক্ষ্য করলো চায়ে চিনি নেই, নিতু অনেক অবাক হয়ে গেল। রিয়াদ কিভাবে জানলো নিতু চিনি ছাড়া চা খায়। এভাবে আস্তে আস্তে নিতুর সাথে রিয়াদের সুসম্পর্ক গড়ে উঠে।২৫ বছরের বৈবাহিক সম্পর্কে নিতু এবং রিয়াদের ভালোবাসার ফসল তাদের একমাত্র কন্যা বকুল।নিতু ধীরে ধীরে শুভ্রের কথা ভুলে যায়। আজ প্রায় ২৫ বছর হয়ে গেছে।আজ বকুলের বিয়ে। মহা ধুমধাম করে বকুলের পচ্ছন্দের মানুষের সাথে বিয়ে হচ্ছে।বিয়েতে কারও মতামত ছিলো না। মূলত নিতুর উদ্যোগেই বকুলের বিয়েটা হচ্ছে। হঠাৎ আজ কেন যেন নিতুর শুভ্রের কথা খুব মনে পড়ছে। ২৫ বছর আগে নিতু পরিবারের সম্মানের কথা ভেবে নিজের ভালোবাসাকে বির্সজন দিয়ে রিয়াদকে বিয়ে করেছিলো। নিতু কখনো চাইনি তার একমাত্র মেয়ে বকুলের সাথেও এমন হোক। আজ নিজেকে দায়িত্ববান মা হিসেবে মনে হচ্ছে। নিতু ছাদে দাঁড়িয়ে একা একা এসব ভাবছে, হঠাৎ বকুল ফুলের সুগন্ধ নিতুর নাকে ভেসে এলো। নিতু পিছনে তাকিয়ে দেখলো একজন মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক চাদর গায়ে জড়িয়ে, বকুল ফুলের মালা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চাঁদের আলোয় লোকটির চেহারা অস্পষ্ট।

লেখাঃ ইশরাত জাহান নিতু
শিক্ষার্থী,নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

,
শর্টলিংকঃ