মিশন পাকিস্তান: কাপ্তান জিয়া

  • 16
    Shares
উপাধ্যক্ষ কামরুজ্জামান

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ ২৩ বছরের লড়াই, সংগ্রাম, আন্দোলন, নির্যাতন প্রভৃতির পর ১৯৭০ এর নির্বাচনে নিরুঙ্কুশ জয়লাভ। অতপর র্দীঘ নয় মাসের সশস্ত্র যুদ্ধ। হারালাম ৩০ লক্ষ শহীদ, ৫ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম, ১ কোটি লোকের শরণার্থী হওয়া, ৫ লক্ষ শিশুর মৃত্যু, ৫০ লক্ষ মানুষের আমৃত্যু পঙ্গুত্বের জীবন। পশু হত্যা, ফসল-বাড়ি-মাঠ পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়া । পুরো জাতির দীর্ঘ মেয়াদে দারিদ্রতায় নিপতিত হওয়া । অবশেষে স্বাধীন জাতি বাঙালি। ৫ হাজার বছরের বাঙালির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্জন স্বাধীন সার্বভৌম দেশ, রক্ত দিয়ে কেনা প্রিয় মাতৃভূমি ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলদেশ’। কেন এই স্বাধীনতার চাওয়া? কেন মিলে মিশে না থাকা? কবির ভাষায় “স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চাই?”- না হয় বাদই দিলাম । রবীন্দ্রনাথের অবমাননা, নজরুলকে না মানা সেগুলোও বাদই দিলাম (যদিও এঁরা বাঙালির প্রাণ,কোনভাবেই বাদ দেয়া যায় না)। মাতৃত্বকে অবমাননা ? ভাষাকে না মানা ? ভাইকে হত্যা? বোনকে নির্যাতন? সম্মান, মর্যাদা, কাজ? এগুলোকে বাদ দিবো কী করে? জাতি, সম্প্রদায়, গোত্রে বিভেদ করে দেয়া, তা মানি কি করে?

আর বৈষম্য, সে তো পাহাড়সম! পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের সচিব পদমর্যাদায় ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের একজনও ছিল না । সাধারণ কর্মচারী থেকে শুরু করে উর্দ্ধতন কর্মকর্তা পর্যন্ত নিয়োগের ক্ষেত্রে দক্ষতা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তান থেকে নেয়া হতো সর্বোচ্চ ১৫% । ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত সেনা সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানের ২৫ জন সাধারণ সৈনিক ও ৯১ জন অফিসারের বিপরীতে আমাদের নেয়া হতো ০১ জন করে সৈনিক ও অফিসার। পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ হতো বাজেটের মাত্র ১৩.৫%। শিক্ষাক্ষেত্রে শুধু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তথ্যটা হলো, পশ্চিম পাকিস্তানে স্কুলের সংখ্যা বেড়েছিল প্রায় ৪ গুণ আর পূর্ব পাকিস্তানে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল ১,৪৫৪ টি স্কুল। প্রফেসর ড. মুনতাসীর মামুন ও ড.মাহবুবর রহমান রচিত ‘স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যূদ্যয়ের ইতিহাস’ গ্রন্থে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্যের সুনির্দিষ্ট তথ্য দেয়া আছে। সেখানে উল্লেখ আছে, ‘‘পাকিস্তান ছিল একটি অস্বাভাবিক রাষ্ট্র। বিশাল ভারতবর্ষের পূর্ব ও পশ্চিম দুই প্রান্তে হাজার মাইলের ব্যবধানে দুই ভিন্ন ভূখন্ড নিয়ে পাকিস্তান গঠিত হয়। জন্মলগ্নে পূর্ব অংশের নাম ‘পূর্ব বাংলা’ নামে অভিহিত হয়। ১৯৫৫ সালে এই নাম পরিবর্তন করে বলা হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান’। মোট জনসংখ্যার ৪৩.৭ ভাগ থাকতো পশ্চিম পাকিস্তানে আর পূর্ব পাকিস্তানে ৫৬.৩ ভাগ” (পৃষ্ঠা ৬০)। ভাষা,সংস্কৃতি,কৃষ্টি কিছুতেই মিল ছিল না। পাকিস্তানে আইন, মানবিকতা, নাগরিক অধিকার সবই ছিল ভূলন্ঠিত অথবা বুটের তলায়।

তাইতো বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি প্রতিরোধ করলো, মরলো। প্রতিবাদ করলো, জেল খাটলো, মা হারালো, ভাইকে হারালো, যুদ্ধ হলো। অবশেষে আরাধ্য ধন স্বাধীনতা পেলাম। পাকিস্তান হেরে গেলো। তাদের প্রতিশোধের নেশা পেল দু’ধরনের (১) হেরে যাবার প্রতিশোধ (২) মার্কিনী নীতি ও আদর্শ হারার প্রতিশোধ।

শুরু হলো সদ্য স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশেকে নিয়ে ঘরে-বাইরে নানাবিধ ষড়যন্ত্র, অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো, সর্বহারার নামে মানুষ হত্যা করা, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের নামে দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলা। আর পরাজিত রাজাকার, আলবদর, আল শাম্সরাতো ছিলই! সাথে ছিল তাদের ইন্ধন, সহযোগিতা, মিথ্যাচার। সেই সাথে যুক্ত ছিল পাকিস্তান ফেরত সেনাবাহিনীর সদস্য, অন্যান্য সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীরা। সম্ভবত সবচাইতে বড় সমস্যা ছিল ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ পাকিস্তানের আজ্ঞাবাহি পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত পদস্থ কর্মকর্তারা, যারা অনেকেই ১৬ ডিসেম্বর থেকে বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের দায়িত্ব প্রাপ্ত হলেন!

কোন কিছুতেই যখন বঙ্গবন্ধু তথা বাংলাদেশকে পরাস্থ করা যাচ্ছিল না বরং সকল ষড়যন্ত্র/সমস্যা মোকাবেলা করে বঙ্গবন্ধুর যোগ্য ও অসাধারণ প্রশাসনিক নেতৃত্বে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি সম্পন্ন একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্রে বাংলাদেশ পরিণত হচ্ছিল। ১৯৭৩-৭৪ অর্থ বছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ১০.৭১% আর বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন বছরে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.১২%। অন্যদিকে ১৯৭৫-৭৬ থেকে ২০০৮-০৯ পর্যন্ত ৩৪ বছরের জিডিপির গড় (সরল পদ্ধতিতে) প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪.৭১% (বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের অর্থনীতি, লেখক: মো: শাহাদৎ হোসেন এফসিএ, পৃষ্ঠা ৭৫)। ঠিক তখন তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে মার্কিন-পাকিস্তানি মদদে এদেশীয় উচ্চাভিলাষী কুলাঙ্গাররা। তাদের নেপথ্য নেতৃত্বে ছিলেন জিয়াউর রহমান।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড সম্পর্কে জিয়া সবই জানতেন তথাপি শাফায়াত জামিল সকালে বিগ্রেড অফিসে যাওয়ার পথে জিয়ার বাড়িতে যান। তিনি তখন সেভ করছিলেন। তাকে প্রেসিডেন্ট অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু হত্যার খবর দিলেন, তখন জিয়া বলেছিলেন ‘সো হোয়াট? লেট ভাইস প্রেসিডেন্ট টেক ওভার। উই হ্যাভ নাথিং টু ডু উইথ পলিটিক্স’। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর উল্লেসিত হয়ে ডালিমকে জিয়া বলেছিলেন ‘কাম হিয়ার (আবেগের সাথে ডাক দিল)! ইয়্যু হ্যাভ ডান সাচ্ আ গ্রেট জব। কিস মি! কিস মি! জিয়া গভীর আবেগে ডালিমকে জড়িয়ে ধরেন।’(মেজর রফিকুল ইসলাম:বাংলাদেশে সামরিক শাসন ও গণতন্ত্রের সংকট, পৃষ্ঠা ৫১)

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ‘মিশন পাকিস্তান’ কার্যক্রম জোরদার ভাবে শুরু করলেন জিয়া। প্রথমেই তারা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নামটিকে পরিবর্তন করে ইসলামী প্রজাতন্ত্র বাংলাদেশ নামে ঘোষণা দিল। যদিও কয়েক ঘন্টার মধ্যেই তারা এ ঘোষণা প্রত্যাহার করে নেয়।

লেখাটির শুরুতেই বলে রাখা প্রয়োজন যে, জিয়া-এরশাদ-খালেদার শাসনামলকে অনেকেই ‘এ গবর্নমেন্ট অব মার্ডারার্স, বাই দা মার্ডারার্স এন্ড ফর দা মার্ডারার্স’ (বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার ঐতিহাসিক রায়, লেখক: রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী,পৃষ্ঠা ১২) হিসেবে অভিহিত করে থাকেন।

১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর কুখ্যাত ইনডেমিনিটি অধ্যাদেশ জারি করেন। এই অধ্যাদেশের ফলে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের কোনরূপ বিচারের আওতায় আনা যাবে না। তেমনি ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের সাথে জড়িতদের কারো বিরুদ্ধে কোন আদালতে, কোন আইনে অভিযোগ পেশ করা যাবে না।

শুধুমাত্র কি খুনিদের রক্ষা করার আইন প্রণয়ন করেছিল? তা নয়। সে সকল খুনিদের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতসহ সচিব পদমর্যাদায় তাদেরকে রাজত্ব করার অনুমতি, দায়িত্ব দিয়েছিল। তাদের জন্য কোন আইন ছিলনা। তারা যা করত সেটিই আইন বলে মান্য করতে হতো। সেই ধারাবাহিকতায় জেলের অভ্যন্তরে জাতীয় চার নেতাকে তারা হত্যা করে। ১৯৭৫ সালের ৫ নভেম্বর এক গেজেট নোটিফিকেশনে জেল হত্যা তদন্তের জন্য তিনজন বিচারকের সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন,এর চারদিন পর জিয়াউর রহমান সেই তদন্ত কমিটি বাতিল করেন। (প্রফেসর ড. মুনতাসীর মামুন,দৈনিক জনকন্ঠ,২০ অক্টোবর ২০০৯)।

১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর এক আদেশে দালাল আইন বাতিল করে আটককৃত বিচারাধীন বা সাজাপ্রাপ্ত ১১০০০ রাজাকার, আলবদর, আলশামস তথা দালালদের ছেড়ে দেয়া হয়। কোন আইন না করে শুধুমাত্র দরজা খুলে দিয়ে জেলখানা থেকে তাদের বের করে দেয়া হয়।
বঙ্গবন্ধু, জয়বাংলা ও আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে। সংবিধান পরিবর্তন করে চার মূলনীতিকে নির্বাসন দেয়। সংবিধানে ধর্ম নিরপেক্ষতাকে তুলে দিয়ে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম’ যুক্ত করে পাকিস্তানি ভাবধারাটা স্পষ্ট করে তুলে।

পাকিস্তানের ২৩ বছরের ধর্মীয় লেবাসের ব্যবসাটা অব্যাহত রাখতে এবং শোষণকে সহজ করতে জিয়া এ কাজ করেন। ‘বাংলাদেশ বেতার’ কে রেডিও বাংলাদেশে পরিবর্তন এবং জিন্দাবাদকে শ্লোগান হিসেবে গ্রহণ করে। ১৯৭৬ সালের ৩ মার্চ জিয়া ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ কে বাতিল করে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ গ্রহণ ও প্রচার করে।

১৯৭৬ সালের ৩ মে অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধানের ৩৮ নং অনুচ্ছেদ বাতিল করে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। ১৯৭৭ সালের ২২ এপ্রিল জিয়া ৯ম সংশোধনীর মাধ্যমে এটিকে আইনে পরিণত করেন। ফলে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলাম, পিডিপি, নেজামে ইসলামসহ নিষিদ্ধ ঘোষিত ধর্মভিত্তিক দলগুলো রাজনীতি করার সুযোগ লাভ করে। রাষ্ট্র, সমাজ, রাজনীতিতে পূনর্বাসিত হয় যুদ্ধাপরাধী, রাজাকার, আলবদর, আল শামস বাহিনীর সদস্যরা। জিয়ার আমলে পাকিস্তনি হানাদার বাহিনী, রাজাকার,আলবদর বলা, লেখা নিষিদ্ধ ছিল । পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পরিবর্তে শুধুমাত্র ‘হানাদার বাহিনী’ বলতে হতো।

সেনাবাহিনীতে হাজার, হাজার মুক্তিযোদ্ধা সৈনিককে হত্যা এবং পাকিস্তানি আদলে বাংলাদেশকে সেনাশাসনের দেশে পরিণত করার মাস্টার হলেন জিয়া। অগণতান্ত্রিকভাবে দেশের ক্ষমতা দখলের নেতা হলেন জিয়া। মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকজনের দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও তাদের পদচ্যুত করা হয়। নাস্তার টেবিলে বসে জিয়া এক হাতে খাবার খেতেন, অন্য হাতে ফাঁসির আদেশে সই করতেন। শুধু সরকারি হিসাব মতে ১৯৭৭ সালের অক্টোম্বর থেকে পরবর্তী দুমাসের মধ্যে ১,১৪৩ জনকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করেন জিয়া। তার মার্শাল ল’ ট্রাইবুনাল গুলোতে প্রহসনের বিচারে সৈনিকদের জীবন-মরণের সিদ্ধান্ত নিতে বিচারকরা সময় নিতেন ১ মিনিটেরও কম অথচ আর্মি এ্যাক্ট অনুসারে তাদের বিচারক হবার কোন যোগ্যতা ছিল না। বিনা বিচারে অনেককে হত্যা করে গণকবর দেয়া হয়। মাত্র একটি অভ্যূত্থানের ঘটনায় সামরিক বাহিনীর ৮ শতাধিক সদ্যসের সাজা হয় এবং প্রায় ৬০০ জনকে ফাঁসির মাধ্যমে বা ফায়ারিং স্কোয়াডে হত্যা করা হয়। তাদের অধিকাংশই বিমান বাহিনীতে ছিলেন (লন্ডন টাইমস্,০৫/০৩/১৯৭৮)। ফলে বিমান বাহিনীতে মাত্র ১১ জন কর্মকর্তা জীবিত ছিলেন। এদের মধ্যে বিমান চালাতে পারতেন মাত্র ৩ জন (হিংস্্র সমর নায়কের তান্ডব-৩,আবেদ খান,দৈনিক জাগরণ ১৩/০৩/২০২০)। উল্লেখ্য জিয়ার শাসনামলে কমপক্ষে ২০ টি ক্যু এর ঘটনা ঘটেছে বলে জানা যায়।

লেখক, সাংবাদিক ও অন্যান্য বুদ্ধিজীবীদের নির্যাতনেও একধাপ এগিয়ে ছিলেন তিনি। খ্যাতিমান বিজ্ঞানী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালিন উপাচার্য ড. আব্দুল মতিনের বিরুদ্ধে তথাকথিত ট্রাইবুনালে বিচার করে ২ বছর সশ্রম কারাদন্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। তাঁর দোষ ছিল তিনি অসাম্প্রদায়িক ছিলেন, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ছিলেন, ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ভক্ত। বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী জিয়ার আমলে রাজনৈতিক বন্দি ছিল প্রায় ৬২ হাজার।

গোলাম আযমকে বাংলাদেশে আসার অনুমতি ও নাগরিকত্ব দেয়া হয় (১৯৯৪ সনে খালেদার জিয়ার আমলে নাগরিকত্ব দেয়া হয়)। স্মরণযোগ্য, পরাজয় অনুধাবন করে গোলাম আযম ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ এর পূর্বেই পাকিস্তানে পলায়ন করে এবং ১৯৭৮ এ পাকিস্তানি পাসপোর্টে বাংলাদেশে আসার পূর্ব পর্যন্ত ‘পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটির’ আহ্বায়ক হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কার্যক্রম সংগঠিত করে। রাজাকার শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী করে প্রমাণ করে তারা পাকিস্তান নামটি স্থাপন না করতে পারলেও বাংলাদেশকে পাকিস্তানি রাজনীতির উত্তরাধিকার বানাতে তৎপর । বিশেষভাবে উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীর ৩০০ জনের মধ্যে ২৫০ জন ছিল চিহ্নিত স্বাধীনতা বিরোধী। তারা সবাই বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে দালালের অভিযোগে অভিযুক্ত ও সাজা প্রাপ্ত হয়েছিল (অন্ধকারের পথে যাত্রা শুরু:আবেদ খান, দৈনিক জাগরণ, ১১/১২/২০১৯)।

বাংলাদেশে হ্যাঁ-না ভোটের প্রবক্তা ছিলেন জিয়া।“এটি জিয়ার কোন নতুন উদ্ভাবন ছিল না। পাকিস্তান শাসনামলে জেনারেল আইয়ুব খান অভিন্ন পদ্ধতিতে প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন।”(বাংলাদেশের রাজনীতি, আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনীতি, লেখক: অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম, পৃষ্ঠা ২২৬-২৭)। ১৯৭৭ সালে ৩০ মে তিনি হ্যাঁ-না ভোট নিয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে দেশের ৮৮.৫০% ভোটার ভোট দিয়েছে এবং তাদের মধ্যে ৯৮.৯% হ্যাঁ ভোট দিয়েছে। উল্লেখ্য এটি সাজানো ফল ছিল এবং শিশুসহ স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা ভোটার না হয়েও ভোট বাক্স বোঝায় করতে ভোট দিতে পেরেছিল। জিয়াউর রহমান একই সাথে রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধান থাকার জন্য ১৯৭৮ সালে ২৮ ফেব্রুয়ারি এক সামরিক ফরমান জারি করেন যা কেবল মাত্র পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির আদর্শের সাথেই যায়।

১৯৭৬ সালের ৫-৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিষিদ্ধ ঘোষিত জামায়াতে ইসলামের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এক সিরাতুন্নবী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন নবনিযুক্ত পাকিস্তান পন্থী বিমান বাহিনী প্রধান এমজি তাওয়াব। সেই সমাবেশে ‘তাওয়াব ভাই, তাওয়াব ভাই, চাঁদ তারা মার্কা পতাকা চাই’ এই শ্লোগান দেয়া হয়েছিল।

১৯৭৮ সালের ১২ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সিনেট অধিবেশনে কোরআন তেলাওয়াতের আগে জাতীয় সংগীত গাওয়া হলে জিয়াউর রহমানকে বিএনপির নেতা ডা. ইউসুফ বলেন,‘স্যার আমাদের পতাকায় ইসলামীর রঙ নেই, এটা আমাদের ভালো লাগে না। এটা ইসলামী তাহজ্জিব ও তমুদ্দুনের সাথে মিলছে না।’ উত্তরে জিয়াউর রহমান বলেন,“হবে, হবে, সবকিছুই হবে। আগে হিন্দুর লেখা জাতীয় সংগীত বদলানো হোক তারপর জাতীয় পতাকার কথা ভাববো।”(অন্ধকারের পথে যাত্রা শুরু:আবেদ খান, দৈনিক জাগরণ, ১১/১২/২০১৯)

লেখক: উপাধ্যক্ষ কামরুজ্জামান
সদস্য সচিব
অষ্টম জাতীয় সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি
একাত্তর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।

, , ,
শর্টলিংকঃ