শিক্ষা ও দুর্নীতি : খাতাবন্ধ জীবনে অর্জিত শিক্ষায় দুর্নীতিবাজদের পুনরুৎপাদন হয়

  • 395
    Shares
লেখক : সাজ্জাদ হোসেন

প্রতিবছরই তো কত অফিসার অবসর নেন, তার মধ্যে কি কোন দুর্নীতিবাজ থাকেনা, যদি থাকে তাহলে দেশ থেকে কেন দুর্নীতি কমে না, কিংবা নিশ্চিহ্ন হয়না। মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত কিংবা ধনী প্রতিটা শ্রেণী থেকেই তো সন্তানরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষিত হয় তারপরও পরবর্তী জীবনে অধিকাংশ অফিসাররা একই চরিত্রের হয় কেমন করে! দেশের বড় বড় বিপদের দিনে পাশে থাকার মত মেধাবী কি নেই? আছে নিশ্চয়ই। কিন্তু পড়ালেখা শিখলে যে সৎ হতে হবে এটা তো বাধ্যতামূলক না, তাই নাহ!! এজন্য বড় বড় কর্মকর্তারা দুই একজন সৎ হলে আমরা তাদের সততার গল্পে মিডিয়ায় ঝড় তুলি কারণ এটা এখন বিরল যে বড় অফিসাররা দুর্নীতিবাজ হবে না । অবশ্য অনেকেই সততার সাথে জীবন যাপন করেন সেই বিষয়টি এখানের আলোচ্য বিষয় না কারণ সংখ্যাটি খুবই নগন্য । শিক্ষা কিভাবে দুর্নীতি পুনরুৎপাদন করছে সেটি দেখানোই এই লেখার প্রতিপাদ্য বিষয়।

শিরোনামটাতে নিজের মত করে বাক্য গঠন করা হয়েছে । এজন্য এই লেখার এই পর্যায়ে শিরোনাম সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু কথা বলা দরকার। “খাতাবন্ধ” বলতে আসলে জন্ম থেকে মৃত্যুর বিশেষ একটা চক্রাকার প্রক্রিয়া বোঝানো হয়েছে। এই চক্রে আছে জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ, চাকরির মাধ্যমে স্থায়ী আবাসন, পরিকল্পিত সময়ে বিয়ে, চাকরির (অর্থের) পিছনে ছুটাছুটি, এক সময় মৃত্যু। সন্তানও বাবার জমানো টাকায় পড়াশোনা করে বাবা-মায়ের মত জীবনের খাতাবন্ধ করেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বড় বেতনের চাকরিতে থেকে জীবনের খাতা বন্ধ করতে পারলে আপাতত সার্থক জন্ম ধরা হয়। এই ধরেন পড়ালেখা শিখে এএসপি, ম্যাজিস্ট্রেট, আইজিপি, সচিব তথা মোটা অংকের বেতনে, জীবন তরুণ প্রজন্মের কাছে আদর্শের হয়ে উঠছে। এই ধরণের স্বপ্ন পূরণ বা আদর্শিক-সার্থক জীবনের সাথে দুর্নীতির উর্বরতা তথা দুর্নীতি বৃদ্ধির যৌক্তিক সম্পর্ক বিদ্যমান। সেই আলোচনা ধরেই লেখাটি চলমান থাকবে এবং যুক্তির মাধ্যমে শিরোনামের যথার্থতা প্রমাণের চেষ্টা করা হবে।

শিক্ষার সাথে দুর্নীতির সরল রৈখিক সম্পর্ক ও সম্ভাবনা বিদ্যমান। এমপি-মন্ত্রীরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষিত বা না-শিক্ষিতও হতে পারে কিন্তু তাদের সরাসরি দুর্নীতিতে জড়ানোর সুযোগ নেই। আমলাদের মাধ্যমে কাজ হাচিল করেন তারা ধরে নিয়ে তাদের এই আলোচানার বাইরে রাখা হয়েছে।তবে তারা শিক্ষিত হয়ে এই চক্রাকার জীবন যাপনে হয়ত দুর্নীতিবাজ হয়ে উঠতেও পারেন। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে না-শিক্ষিত ব্যক্তিরা দুর্নীতি করার সুযোগ পায়না, জন্য এখানে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষিতদের নিয়ে বলা হচ্ছে। তবে যাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই তারা ক্ষমতাবান হলেও এই শিক্ষিতদের দ্বারাই দুর্নীতি করান । সাধারণ জনগণ এই সকল দুর্নীতির ভুক্তভোগী হয়ে যায়। মূলত ব্যক্তিস্বার্থ ও আত্মকেন্দ্রীক জীবন যাপনের জন্যেই মানুষ সামষ্টিক চিন্তা ভুলে দুর্নীতিতে লিপ্ত হয় আর শিক্ষা এই সুযোগটা এনে দেয় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষিতদের।

অনেক ছোটকাল থেকেই শিশুদের শেখানো হয় ” পড়ালেখা করে যে, গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে “।অর্থাৎ পড়ালেখার উদ্দেশ্য শিশুদের কাছে শিশুকাল থেকেই বিচ্যুত। উচ্চাভিলাষী জীবনের স্বপ্ন নিয়ে শিক্ষা জীবনের শুরু হয়। অসুস্থ প্রতিযোগিতাপূর্ণ শিক্ষাজীবনে ফাস্ট হওয়ার জন্য যে মানসিক চাপ প্রয়োগ করা হয় তা কেবল আত্মকেন্দ্রীক হয়ে উঠতে সাহায্য করে। নৈতিক শিক্ষা বা ধর্মীয় শিক্ষার আদলে মানুষের উচ্চ আদর্শ ও সাদাসিধা জীবন যাপনের তাগিদ শিক্ষা জীবনের কোথাও দেখা যায় না। পুঁজিবাদী শিক্ষা ব্যবস্থায় এদেশে নবম শ্রেণিতে বিভাজন শুরু হয় বিজ্ঞান, বাণিজ্য ও মানবিকের শিক্ষার্থী হিসেবে চিহ্নিত করণের মাধ্যমে। এখান থেকেই পেশাদার জীবনে দৌড়ের যাত্রা শুরু হয়। সমাজে শিক্ষার্থীদের তৈরীকৃত মেধা অনুসারে ভবিষ্যতে বেতন পেতে হবে সেই অনুযায়ী বোর্ডে স্টান্ড করতে হবে। না পারলে গোল্লায় যেতে পাঁচ মিনিটও সময় দিবেনা সমাজ। অর্থাৎ যে যেমন “ভালছাত্র” তার বেতন তেমন বেশি এটাই স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলেও দেশের ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে খুবই সীমিত আকারে। অথচ শিক্ষার হার বেড়েই চলেছে। তাহলে কি এ জাতির শিক্ষা কোন কাজে আসেনি? আসলেই আসেনি। এদেশের শিক্ষার দিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় চাষাবাদ আর পড়ালেখার মাঝে পার্থক্য শুধু আয়-ব্যয়ে । চাষী কষ্ট করে ফসল ফলায়ে তা দিয়ে দিনাতিপাত করে অন্যদিকে পড়ালেখা শিখে বিলাসী জীবন আর সংসার নিয়ে জীবন পার করে শিক্ষিত চাকুরীজীবিরা। এই বিলাসিতার জন্য দুর্নীতির আশ্র‍য় নিতে হয় তাদের। যাই হোক চাষাবাদ কিংবা শিক্ষা জনগণ যাই করুক আপনস্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত। আর দেশের চিন্তা কারোরই নেই বরং দেশের ক্ষতি করছে শিক্ষিতরা। চাষারা আসলে ঘুষ খাওয়ার মত সেয়ানা হয়ে উঠতে পারেনা।

অনেকে পড়লেখা শেষ করে  পছন্দ মত চাকরিও করে, আবার অনেকে অনিচ্ছায় সেটেল্ড হতে বাধ্য হয়। তবে সবারই স্বপ্ন বাড়ি- গাড়ির জন্য চলতে থাকে আমরণ চেষ্টা। যাদের দেশে বাড়ি-গাড়ি হয় তারা বিদেশে বাড়ি-গাড়ির চিন্তা করে। বেতন এবং অর্জিত সম্পদের উপর বউয়ের সৌন্দর্য, যোগ্যতা ও বংশীয় পরিচয় নির্ভরশীল অনেকটাই। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের দাসত্ব মেনে নিলে অবশ্য এত ভাবা লাগেনা। সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত অফিসাররা এজন্য কালোপথে পা দিতে একটুও ভাবেন না। যাদের অ্যাফেয়ার্স তারা প্রণয়ে জড়াতে সব ধরনের চাকরি করতে রাজি। জীবনের এই প্রবাহমানতায় বিয়ে, সংসার,সন্তান সব হয়ে যায় তার সাথে তাল মিলিয়ে সন্তানদের বড় করা আর ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য চলে অবৈধ পথে সম্পদের পাহাড় গড়ার বিকৃত প্রতিযোগিতা।

শেষ জীবনে এসে প্রত্যেকে কর্মস্থলের সর্বোচ্চ প্রমোশন পেয়ে যান। তখন দুর্নীতির জন্য অন্যের উপর নির্ভরশীল হতে হয়না নিজেই রাঘব বোয়াল হয়ে যান। যৌবনে তিনি দুর্নীতির অর্থের ভাগ পেতেন এখন তিনি অন্যদের কমিশন দেওয়ার পর্যায়ে আছেন। আসলে দুর্নীতি মাদকের মত, নীতি ছাড়তে চাইলেও মন ছাড়তে চায়না। এলাকার বড় অফিসার হিসাবে এলাকার শিক্ষার্থীদের দেখার নামে অনেকের চাকরির সুপারিশ, বন্দোবস্ত কিংবা ঘুষের মাধ্যমে চাকরির ব্যবস্থা করেন যার সবগুলোই দুর্নীতি।জীবনের পরতে পরতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষিতরা এভাবে দুর্নীতির একটা দুষ্টচক্র অবচেতন মনে মেনে চলেন আর ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে একটা বছর গেলেও একটা দুর্নীতিবাজ এদেশের ভাগ্য থেকে যায়না বরং বেড়েই চলেছে।

সরকার, শাসনব্যবস্থা, শাসক পরিবর্তন হলেও দেশের দুর্নীতির কোন কমতি নেই বরং দুর্নীতিবাজদের ভিতরে প্রতিযোগিতা বাড়ছে দিনদিন। অফিসারের ছেলেকে অফিসার বানানোর জন্য বাবার সকল প্রচেষ্টা বৈধতা পেয়েছে এইটা যে স্বজনপ্রীতি তা ভুলতে বসেছি আমরা। এভাবেই দুর্নীতিবাজদের পুনরুৎপাদন হচ্ছে যা কম্পিউটারের সফটওয়্যারের মত কাজ করে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে আপডেট নিয়ে সংখ্যা বাড়তেছে। মানুষের এই চক্রাকার জীবনের সাথে দুর্নীতি আবর্তিত হচ্ছে কালের আবর্তে রাত দিনের মত। ফলে দুর্নীতিতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি যেখানে দুর্নীতিবাজরা হলো ভাইরাস আর জনগণ হল তার বাহক আর দুর্নীতি হল জাতীয় ব্যাধি।

 

লেখক : সাজ্জাদ হোসেন, শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

শর্টলিংকঃ