সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

  • 221
    Shares

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি নাম, একটি ইতিহাস। বাঙালির হাজার বছরের এই শ্রেষ্ঠ সন্তান বাংলার কোমল পলিমাটির বুকে এক ভাগ্যবতী জননীর কোলে জন্মেছিল বলে হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিন্ন করে বাঙালি দেখেছিল বিজয়ের লাল সূর্য, বাঙালি পেয়েছিল একটি স্বাধীন মানচিত্র, একটি সংবিধান, একটি পতাকা ও একটি জাতীয় সংগীত। বাংলা, বাঙালি, বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম, বাংলাদেশ এই শব্দগুলির সাথে বঙ্গবন্ধু নামটি মিশে আছে একাকার হয়ে। বঙ্গবন্ধু যেমন লড়াই সংগ্রাম করে আমাদেরকে বাংলাদেশ দিয়েছেন, বিনিময়ে বাংলার মাটি, মানুষ, বৃক্ষ, নদী ভালোবেসে আপণ করে নিয়েছে কালজয়ী এই মহানায়ককে। বঙ্গবন্ধু তাঁর সাহসী নেতৃত্ব, দীর্ঘ ত্যাগ তিতীক্ষা আর রক্তাক্ত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার জন্য জনগণকে প্রস্তুত করেছিলেন এবং ১৯৭১ সালে তাঁরই হুঙ্কারে বাঙালি লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে পাকিস্তানি অত্যাচারী শাসকগোষ্ঠীর কবল থেকে বাংলাকে মুক্ত করে। বঙ্গবন্ধু ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৩ বছর বিভিন্ন আন্দোলন, সংগ্রাম আর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলার মানুষকে মরতে শিখিয়েছিলেন বলেই তাঁর ডাকে ৩০ লক্ষ বাঙালি বুকের রক্ত আর ২ লাখ মা-বোনের লজ্জার বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল এবং পাকিস্তানের কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করে স্বদেশের মাটিতে আনা সম্ভব হয়েছিল। বাংলাদেশের জন্য সংগ্রাম করতে গিয়ে, স্বাধীনতার জন্য জনগণকে প্রস্তুত করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু ৪৮ বার গ্রেফতার হন এবং ১২ বছর কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটান। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস জানতে হলে বঙ্গবন্ধুর জীবন, দর্শন ও রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসকে জানতে হবে। আমি মনে করি বঙ্গবন্ধুর দর্শন ও রাজনৈতিক জীবনকে পরিপূর্ণভাবে বুঝতে পারলে বাংলাদেশের জন্মের চিরসত্য-ইতিহাস দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হবে সকলের নিকট। ইতিহাস বিকৃত করে কেউ কাউকে যেন বিভ্রান্ত করতে না পারে সেজন্য নতুন প্রজম্মকে সত্যিকারভাবে বঙ্গবন্ধুকে চিনতে ও জানতে হবে।

১৯২০ সালের ১৭ মার্চ ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে শেখ সাহারা খাতুনের কোলভরে মুজিব চোখ মেলে পৃথিবী দেখেন। পিতা শেখ লুৎফর রহমানের ৬ ছেলে মেয়ের মধ্যে মুজিব ছিলেন তৃতীয়। ১৯৪০ সালে শেখ মুজিব নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগদানের মাধ্যমে রাজনীতিতে হাতে খড়ি নেন। ১৯৪২ সালে তিনি এন্ট্রান্স (এসএসসি) পাশ করার পর কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে মানবিক বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসে ভর্তি হন এবং বেকার হোস্টেলে অবস্থান করে ১৯৪৭ সালে উক্ত কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি ইসলামিয়া কলেজ ছাত্রসংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে দেশ ভাগের পর ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি আইন বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু ১৯৪৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেবার কারনে ঐ বছরের ২৯ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে অযৌক্তিকভাবে জরিমানা করে। তিনি এই অন্যায় সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করতে গিয়ে জরিমানা না দিবার সিদ্ধান্তে অটল থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করেন। ছাত্রাবস্থায় মুজিবের সাথে পরিবারের সকলের মতে পিতৃমাতৃহারা চাচাত বোন শেখ ফজিলাতুন্নেছার সাথে বিয়ে হয়। কিন্তু তাঁর বিয়ে কোনো দিনও ছাত্ররাজনীতি এবং পরবর্তীতে জাতীয় রাজনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলে নি। বরং তাঁর সহধর্মিনী বঙ্গবন্ধুর সাথে শহীদ হবার পূর্ব পর্যন্ত একজন মহীয়সী ও সাহসী নারী হিসেবে প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে মুজিবকে অসীম অনুপ্রেরণা ও সাহস যুগিয়েছিলেন।

১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান নামে এই উপমহাদেশে নতুন দুটি ‘ডোমিনিয়নের’ সৃষ্টি হয়। পূর্ব-বাংলা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় পাকিস্তান অংশে যুক্ত হয়ে এখানকার জনগণ নতুনভাবে বাঁচবার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই পূর্ব-বাংলার জনগণের স্বপ্ন ভূলুণ্ঠিত হয়। তারা বুঝতে পারে এক ঔপনিবেসিক শাসনের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে আর এক ঔপনিবেশিক শাসনের খপ্পরে পড়েছে। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন আইন পরিষদে ‘পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণ উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে মেনে নিবে’ বলে ঘোষণা দিলে, তাৎক্ষণিকভাবে শেখ মুজিব এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেন। মূলত ১৯৪৮ সালে মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষায় পরিণত করার সংগ্রামে নিজেকে সমর্পণ করার মধ্য দিয়ে মুজিব পাকিস্তানি শোষকগোষ্ঠীর সকল অত্যাচার ও অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হন। তাই তো ’৪৮ সালের পরে বাঙালির অধিকার আদায়ের জন্য যতোগুলো আন্দোলন সংগ্রাম রচিত হয়েছে প্রায় তার সবগুলোই মুজিবকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। তিনি ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পূর্ব-পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হলে বন্দি থাকা অবস্থায় দলের যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হন যা বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনকে এক নতুন অধ্যায়ে শামিল হতে সহায়তা করে। ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য বঙ্গবন্ধু ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জেলে থাকা অবন্থায় টানা ১৩ দিন অনশন করেন। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সহযোদ্ধাদের জেল অনশন ভাষা আন্দোলনকারীদেরকে ২১ ফেব্রুয়ারিতে ভাষার দাবীতে আহুত ছাত্র ধর্মঘটকে সফল করতে এবং ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে দারুণভাবে উদ্বুদ্ধ করে। ১৯৫৩ সালে শেখ মুিজব পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং ১৯৬৬ সালে দলটির সভাপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত একই পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৪ সালের ১০ মার্চ পাকিস্তানি শোষকদের বিরুদ্ধে এবং তাদের দোসর মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে বাঙালি জনমতকে সংগঠিত করবার জন্য যুক্তফ্রন্ট গঠন করে নির্বাচন করার ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ অবদান রাখেন। ঐ নির্বাচনে ২৩৭টি আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট পায় ২২৩টি আসন যার মধ্যে আওয়ামী মুসলিম লীগের ছিল ১৪৩টি আসন। নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা ওয়াহিদুজ্জামানকে ১৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে গোপালগঞ্জ থেকে নির্বাচিত হন। এ বছরের ১৫ মে শেখ মুজিব প্রাদেশিক সরকারের কো-অপারেটিভ মন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৫৫ সালে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী মুসলিম লীগকে ঢেলে সাজাবার উদ্যোগে নেন এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদ ভাবাপন্ন একটি ধর্মনিরপেক্ষ দলে পরিণত করতে সচেষ্ট হন। এজন্য এ বছর ২১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি প্রত্যাহার করা হয় এবং বঙ্গবন্ধু পুনরায় দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এ বছর বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের আর একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল তা হলো যখন ২৫ আগস্ট করাচীতে পাকিস্তান গণপরিষদে পূর্ব-বাংলার নাম পরিবর্তন করে পূর্ব-পাকিস্তান করে তখন তিনি তার তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। ১৯৫৭ সনের ৩০ মে দলকে সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান খানের মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগও করেন ।

১৯৫৮ সালে সামরিক জান্তা আইয়ুব খান ক্ষমতায় এলে শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উপর শুরু হয় নিপীড়ন-নির্যাতন। ১৯৬১ সালে সামরিক শাসন ও আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলবার লক্ষ্যে মুজিব গোপন রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করেন। এ সময়ই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের লক্ষ্যে কাজ করবার জন্য বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দের দ্বারা ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ নামে একটি গোপন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬৬ সাল বাঙালি ও শেখ মুজিব উভয়ের জন্য একটি ঐতিহাসিক বছর। কারণ এ বছর তিনি পেশ করেন তাঁর ঐতিহাসিক ৬ দফা কর্মসূচি, বাঙালির বাঁচার দাবী। তিনি গর্জে উঠলেন, ‘তোমাদের এই অত্যাচার মানি না আর তোমাদের শোষণ চলবে না, পুর্ব-পাকিস্তানের ন্যায্য হিস্যা দাও’। ৬ দফায় পূর্ব-পাকিস্তানের পূর্ণ সায়ত্ত্বশাসন দাবী করা হলো। অনেকেই একমত ৬ দফা স্বাধীনতার চিন্তা থেকেই রচিত। ৬ দফার সমর্থনে বঙ্গবন্ধু উল্কার মতো ছুটে বেড়ালেন বাংলার প্রতিটি জনপদে। ৬ দফার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন দেখে ভীত হয়ে পাকিস্তান সরকার ৬৮ সালের ৩ জানুয়ারি শেখ মুজিবকে ১ নম্বর আসামী করে মোট ৩৫ জন সেনা ও সিএসপি অফিসারের বিরুদ্ধে পাকিস্তান বিছিন্ন করার অভিযোগ এনে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের ও শেখ মুজিবসহ তাঁর সহযোগীদের গ্রেফতার করায় পূর্ব-বাংলার জনগণের উত্তাল আন্দোলন ক্রমান্বয়ে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিতে থাকে। ’৬৯-এ আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন সমগ্র বাংলায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন ১১ দফা দাবী সম্বলিত কর্মসূচি দিয়ে বাংলার ছাত্র সমাজকে আন্দোলিত করে। ’৬৯-এর ৮ জানুয়ারি ঢাকায় ৮টি বিভিন্ন দলের সমম্বয়ে গণতান্ত্রিক সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। সামরিক জান্তা আইয়ুব খান আন্দোলনকে দমন করতে হত্যা, নির্যাতনের আশ্রয় নেয়। ২০ জানুয়ারি ছাত্র নেতা আসাদকে হত্যা করা হয়, ২৪ জানুয়ারি কিশোর মতিউরকে হত্যা করা হয়, ১৮ ফেব্রুয়ারি রাবি শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহাকে হত্যা করা হয় এবং হত্যা করা হয় আগরতলা ষড়যন্ত্রের অন্যতম আসামী সার্জেন্ট জহুরুল হককে। এতোকিছুর পরও আইয়ুব খান গণঅভ্যুত্থান ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে গণদাবীর কাছে নতি স্বীকার করেন এবং ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারসহ শেখ মুজিব ও তাঁর সহযোগীদের মুক্তি দিয়ে ক্ষমতা ত্যাগ করেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে ১০ লাখ ছাত্রজনতার সমাবেশে বাঙালির নয়নের মণি মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেওয়া হয়। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ‘বঙ্গবন্ধু’ অবিসংবাদিত একক জাতীয়তাবাদী নেতাতে পরিণত হন।

আইয়ুব খানের বিদায়ের পর ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা দখল করে ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেন। নির্বাচনে পূর্ব-বাংলার জনগণ বিপুলভাবে ৬ দফার পক্ষে রায় দিলে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৩১০টি আসনের মধ্যে ২৯৮টি আসন আওয়ামী লীগ লাভ করে। আর অন্যদিকে জাতীয় পরিষদে ভুট্টোর দল পিপলস পার্টি পায় ৮৩টি আসন। বাংলার জনগণ মনে করলো দীর্ঘ ২৩ বছর পর এবার বুঝি আওয়ামী লীগকে কেন্দ্রের ক্ষমতা হস্তান্তর করে বাঙালির ভাগ্য নির্ধারণের সুযোগ দেওয়া হবে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরের নামে টাল-বহানা চালাতে থাকলো। ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহবান করেও সংখ্যা গরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধুর সাথে কোনোরকম আলোচনা না করেই ভুট্টোর পরামর্শে ১ মার্চ হঠাৎ করেই ইয়াহিয়া খান অধিবেশন স্থগিত করার ঘোষণা দেন। ইয়াহিয়ার এই ঘোষণায় সমগ্র বাংলা ফুসে উঠলো, বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘বে-ইনসাফী মানবো না, বাঙালিরা স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে বাঁচতে চায়’। বঙ্গবন্ধু সমগ্র পূর্ব-পাকিস্তানে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন এবং পরিচালিত হতে থাকলো বঙ্গবন্ধুর সফল কৌশলের সর্বোত্তম কীর্তি। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে গাড়ির চাকা ঘুরলো না, ব্যাংক-বীমা খুললো না, সারাদেশে পাকিস্তানি কারফিউ উপেক্ষা করে মিছিল সমাবেশ চলতেই থাকলো। বাঙালি মরণপণ করলো রক্ত চাও, রক্ত নাও কিন্তু স্বাধীনতা এবার দিতেই হবে। অবশেষে ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ১০ লাখ জনতার জনসমুদ্রে ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গেয়ে উঠলেন স্বাধীনতার অমর গান ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। ৭ মার্চ ’৭১ এ রেসকোর্স ময়দানে লক্ষ লক্ষ জনতার সামনে বঙ্গবন্ধুর তেজোদীপ্ত ভাষণ বাঙালির বুকে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। এ দিন জাতি, ধর্ম, দলমত নির্বিশেষে বাঙালির ঐক্যের মিলন ঘটেছিল এবং রেসকোর্স ময়দানে সমবেত লাখো জনতা ‘জয়বাংলা’ শ্লোগান দিয়ে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করেছিল। এ ভাষণকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভাষণ বলা যায়। আব্রাহাম লিংকন গেটিসবার্গে যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন তা হোয়াইট হাউস থেকে লিখে আনা হয়েছিল। কিন্তু শেখ মুজিব তাৎক্ষণিকভাবে ভাষণ দিয়ে বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন এবং স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়তে জাতিকে উদ্ধুদ্ধ করেছিলেন। সোনার তরী, গীতাঞ্জলি যত মূল্যবান কাব্য হোক না কেন, ‘আর দাবায়ে রাখতে পারবে না’ ’৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধে এর চেয়ে অন্য কোনো কাব্য শ্রেষ্ঠ হতে পারে না।

মূলত বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের পর পরই শুরু হয়ে যায় স্বাধীনতার জন্য খ- খ- যুদ্ধ। বাঙালির যার যা আছে তাই নিয়ে বাংলার সর্বত্র প্রতিরোধ গড়ে তুললো, আর পশ্চিমারা শুরু করলো হত্যালীলা। অবশেষে ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে পৃথিবীর সকল মানবতাকে পদদলিত করে নিরীহ ঘুমন্ত বাঙালির উপর পাকিস্তানিরা চালায় পৃথিবীর সবচেয়ে বর্বরোচিত হত্যাকা-। ২৫ মার্চ মধ্যরাতে গণহত্যার সময় এবং পাকিস্তানি আর্মিদের হাতে গ্রেফতার হবার পূর্বমুহূর্তে অর্থাৎ ২৬ মার্চ প্রত্যুষে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, যা ওয়্যারলেস বার্তার মাধ্যমে চট্রগ্রামে দলীয় নেতা জহুর হোসেন চৌধুরীরসহ আওয়ামী লীগ এর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে পৌঁছে যায়। ২৬ মার্চ প্রথম এই ঘোষণাটি চট্টগ্রাম থেকে রেডিওতে প্রচারিত হয় আওয়ামী লীগ নেতা হান্নানের মাধ্যমে এবং ২৬ মার্চ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাঙালি শুরু করে মরণপণ স্বাধীনতা সংগ্রাম। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে থাকলেও তিনিই ছিলেন বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের মূলপ্রেরণা। তাঁর আদর্শ, তাঁর বজ্রকণ্ঠ মানুষকে মরতে শিখিয়েছে। এজন্যই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতা হিসেবে শেখ মুজিব সম্পর্কে ‘নিউজ উইক’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় ‘চড়বঃ ড়ভ চড়ষরঃরপং’ অর্থাৎ রাজনীতির কবি। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে রাষ্টবিজ্ঞানী জিল্লুর রহমান খান-এর মূল্যায়নও স্মরণ করা যায়। তিনি লিখেছেন, শেখ মুজিবুর রহমান এমন এক রাজনৈতিক নেতা , যিনি ক্যারিশম্যাটিক এবং একই সঙ্গে একান্তই স্বদেশীয়। মহাত্মা গান্ধী, জহরলাল নেহেরু, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ -এরা সবাই পাশ্চাত্যে শিক্ষা লাভ করেছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু পড়াশোনা করেছেন গোপালগঞ্জ, কলিকাতা ও ঢাকায়। তিনি যা চাইতেন, জনগণ সেটাই করতেন। তিনি একজন সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী থেকে তৃতীয় বিশ্বের আন্যতম প্রধান ক্যারিশম্যাটিক নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। দীর্ঘ নয় মাসের মরণপণ সংগ্রাম, ত্রিশ লাখ বাঙালির তাজা রক্ত আর দুই লাখ মা-বোনের লজ্জার বিনিময়ে অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলার আকাশে উদিত হলো স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য, আমরা পেলাম স্বাধীন বাংলাদেশ ও লাল-সবুজের একটি পতাকা আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলেন বাঙালি জাতির পিতা।

স্বধিীনতা আন্দোলনে বিজয় লাভের পর পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে লন্ডন থেকে বৃটিশ এয়ারযোগে ১০ জানুয়ারি, ’৭২ স্বপ্নের স্বাধীন বাংলায় ফিরে আসেন মুজিব । স্বাধীনতার পরে একটি যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশকে ধ্বংসাবশেষের ভেতর থেকে গড়ে তোলবার দৃঢ় প্রত্যয়ে সকলে যখন বঙ্গবন্ধুর অবিচল নেতৃত্বে নিরলসভাবে কাজ করছিল তখন দেশের মধ্যে ’৭১-এর স্বাধীনতা বিরোধী ও পরাজিত শক্তি এবং সর্বহারা ও সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী চরমপন্থী কয়েকটি রাজনেতিক দল অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে হত্যা, লুটতরাজ, ডাকাতি, রাহাজানির মাধ্যমে দেশে যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল দেশবাসী তা ভালো করেই জানে। যুদ্ধের পরে বঙ্গবন্ধুর ডাকে যখন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও দেশদরদী সাধারণ জনগণ অস্ত্র জমা দিচ্ছিল তখন স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার সুযোগ নিয়ে অস্ত্র জমা না দিয়ে তা দেশের সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহারের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। এ রকম পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী ৭১’র পরাজিত শক্তি ও বাংলাদেশ বিরোধী আন্তর্জাতিক শক্তি স্বাধীনতার পর থেকেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার জন্য নানা রকম ষড়যন্ত্রের জাল বোনে। মৌলবাদী শক্তি স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময় থেকেই এই সত্যটি উপলদ্ধি করেছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও বঙ্গবন্ধুকে বাঁচতে দেওয়া হবে না। কারণ স্বাধীন বাংলাদেশকে পাকিস্তানপন্থী চেতনায় পরিচালিত করতে হলে, বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে হত্যা করতে হলে, বাংলাদেশের সংবিধান থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র মুছে ফেলতে হলে বাংলার মাটিতে বঙ্গবন্ধুকে বঁাঁচিয়ে রাখা যাবে না। অবশেষে বাঙালি জাতির জীবনে নেমে এলো সেই অভিশপ্ত রাত ১৫ আগস্ট।

১৫ আগস্ট আমাদের শোকের দিন, অশ্রু বির্সজনের দিন। এ দিন বাঙালি হারিয়েছে তাঁদের জাতির পিতা শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালি ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। শুধু শেখ মুজিবকে এদিন বাঙালি হারায় নি, হারিয়েছে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা, বঙ্গবন্ধুর তিনপুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, বঙ্গবন্ধুর দুপুত্রবধু সুলতানা কামাল খুকু, পারভীন জামানা রোজী, বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ আবু নাসের, বঙ্গবন্ধুর সেজ বোনের স্বামী আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, সেরনিয়াবাত এর কন্যা বেবী সেরনিয়াবাত ও পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, সেরনিয়াবাতের নাতি সুকান্ত বাবু, সেরনিয়াবাতের ছোট ভাই শহীদ সেরনিয়াবাত, বঙ্গবন্ধুর মেজ বোনের ছেলে শেখ ফজলুল হক মনি, মনির অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি, বঙ্গবন্ধুর প্রধান নিরাপত্তা অফিসার কর্ণেল জামিল ও আমীর হোসেন আমুর খালাত ভাই রিন্টুকে। মীরজাফর খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে আমাদের সেনাবাহিনীর কতিপয় স্বাধীনতাবিরোধী, পাকিস্তানপন্থী ক্ষমতালোভী অফিসার খুনী লে. কর্ণেল ফারুক, লে. কর্ণেল রশিদ, মেজর শাহরিয়ার, মেজর বজলুল হুদা, ক্যাপ্টেন নূর প্রমূখ যে নজীরবিহীন বর্বরোচিত নৃশংস হত্যাকা- সংঘঠিত করেছিল তা বাঙালির গৌরবকে ম্লান করেছে এবং সেই সাথে বাঙালির শৌর্য্যরে ইতিহাসকে করেছে কলঙ্কিত। ঘাতকদের নির্মমতা এতই ভয়ঙ্কর ছিল যে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশু কেউ রক্ষা পায় নি ঘাতকদের হাত থেকে। খুনী চক্র চেয়েছিল বঙ্গবন্ধুর বংশের নাম-নিশানা চিরদিনের জন্য মুছে ফেলতে, যেন ঐ মহানায়কের কোন উত্তরাধিকারী বাংলার মাটিতে গর্জে ওঠতে না পারে। বঙ্গবন্ধুর দুকন্যা দেশরতœ নেত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সেদিন দেশের বাইরে অবস্থান না করলে তাঁদের জীবনেও নেমে আসতো একই নির্মম পরিণতি। জাতির জনককে হত্যা করার পর এদেশে খন্দকার মোশতাক এর নেতৃত্বে সামরিক জান্তাদের জংলী শাসন শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের হত্যার বিচার না করে বরং খুনীদেরকে আইন করে রক্ষা করা হয় এবং নানাভাবে পুরস্কৃত করা হতে থাকে। বঙ্গবন্ধুর খুনীদের রক্ষা করার জন্য খুনি মোশতাক কতৃক জারিকৃত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান সংবিধানের চতুর্থ তফসিলে এক অনুচ্ছেদ সংযোজনের মাধ্যমে আইন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন। পৃথিবীর কোনো সভ্য গণতান্ত্রিক দেশে আইন করে খুনীদের রক্ষা করার এরকম দ্বিতীয় কোনো নজির নাই। এই খুনি চক্রকে বঙ্গবন্ধু হত্যার মূল বেনিফিসিয়ারি জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হিসেবে ক্ষমতায় থাকাকালীন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে পাঠিয়ে পুরস্কৃত করেন। ১৫ আগস্ট ট্রাজেডি রচনা করার পর বাংলাদেশের ও বাঙালির মূল্যবোধকে একে একে ধ্বংস করে দেশটিকে একটি সা¤প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করার ষড়যন্ত্র রচনা করা হয়েছিল । ১৫ আগস্ট ট্রাজেডির পর সংবিধানকে ক্ষত বিক্ষত ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভুলণ্ঠিত করা সহ জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যাকরা হয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়েছিল, বাংলাদেশ বেতার, টেলিভিশন থেকে বঙ্গবন্ধুকে নির্বাসিত করা হয়েছিল। শুধ কি তাই? বিএনপি’র পৃষ্ঠপোষকতায় রাজনীতিতে ধর্মের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে ধর্মব্যবসায়ীরা মৌলবাদী রাজনীতির শিকড়কে এতোই শক্তিশালী করেছিল যে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের আমলে বেগম খালেদা জিয়া ৭১’র যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানিয়ে তাদের গাড়িতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছিল।

বাংলাদেশে যে কোনো নাগরিকের হত্যাই বিচারযোগ্য এবং এ বিচারের ক্ষেত্রে আইনের চোখে সকলেই সমান। কিন্তু দুর্ভাগ্য বাঙালি জাতির যে, দীর্ঘ ২১ বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর স্বজনদের ঘৃণ্য হত্যাকা-ে র বিচারের সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। আইনকে শৃঙ্খলিত করে, আইনের শাসন প্রক্রিয়া বানচাল করে, ন্যায় বিচারের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করে সভ্য জগত থেকে দেশকে নির্বাসিত করা হয়েছিল। যেদেশে দীর্ঘ ২১ বছর ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) আইনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর স্বজনদের হত্যার বিচার বন্ধ ছিল অবশ্যই ধরে নিতে হবে সেদেশে ২১ বছর আইনের শাসন ছিল না। পনেরোই আগস্টের হত্যাকা-ের বিচার করতে না পারায় এক বিরাট কলঙ্কের বোঝা মাথায় নিয়ে ’৭৫ থেকে ’৯৬ এ দীর্ঘ একুশ বছর আমরা অন্ধকারে ডুবে ছিলাম। সৌভাগ্যের বিষয় ১৯৯৬ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর অনেক বাঁধা-বিপত্তি অতিক্রম করে দীর্ঘদিনের নির্বাসিত বিচার ব্যবস্থাকে অবশেষে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল। ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর জাতীয় সংসদে ইনডেমনিটি নামক কালো আইন বাতিল করার পর ঢাকাস্থ সেন্ট্রাল জেলে স্থাপিত বিশেষ দায়রা ও জজ আদালতে শুরু হয় আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরবিারের সদস্যদের হত্যাকা-ের বিচার। প্রায় ২ বছর বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার শুনানি ও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর ঢাকা জেলা ও দায়রা জজের আদালতে ’৭৫-এর পনেরোই আগস্টের বর্বর হত্যাকা-ের বিচারের রায়ে প্রকাশ্য ফায়ারিং স্কোয়াডে ১৫ জন ঘাতকের মৃত্যুদ- কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয় । পার্লামেন্টে ইনডেমনিটি আইন বাতিল করে সরকার ধীরে ধীরে যেভাবে দেশের প্রচলিত আইনে এই বিচারের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন তাতে শেখ হাসিনাকে একজন দক্ষ শাসক হিসেবে সহজেই আখ্যায়িত করা যায়। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, গণতান্ত্রিক রীতিনীতি আর আইনের শাসনের প্রতি গভীরভাবে শ্রদ্ধাশীল শেখ হাসিনা সরকার খুনিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ দিয়ে অন্য দশটি খুনের মামলার মতোই বঙ্গবন্ধু ও তাঁর স্বজনদের নির্মম হত্যার ক্ষেত্রে প্রকাশ্য বিচারের পথ অনুসরণ করেন। পনেরোই আগস্টের বর্বর হত্যাকা-ের বিচারের উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকার বাঙালির হৃদয়ের অন্তঃস্থলে চির ভাস্কর হয়ে থাকবেন।।বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায়ের মধ্য দিয়ে ংঁঢ়ৎবসধপু ড়ভ ষধি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই রায়ের মধ্য দিয়ে বাঙালির কলঙ্ক মোচন হয়েছে, বাঙালি সকল গ্লানি মুছে এক বন্য অন্ধকার থেকে মুক্তি পেয়ে শামিল হয়েছে আলোকিত অভিযাত্রায়। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায়ে বিচারক শুধু ঘাতকদের মৃত্যুদ- প্রদান করেন নি, রায়ে এমন সব সাহসী সত্য উচ্চারণ করেছেন যা দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করবে। রায়ের এক অংশে মাননীয় বিচারক কাজী গোলাম রসুল তৎকালীন সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নীরব ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছেন এবং বলেছেন ১৫ আগস্টের ঘটনা আমাদের জাতীয় ইতিহাসে সেনাবাহিনীর জন্য একটি চিরস্থায়ী কলঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। বিচারক রায়ে একথাও উল্লেখ করেন যে, ঘটনার পর কোনো কোনো আসামী দেশে-বিদেশে নিজেদেরকে আত্মস্বীকৃতি খুনি হিসেবেও পরিচয় দিয়ে দাম্ভিকতা প্রকাশ করে। আমাদের রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের গতানুগতিক বৈশিষ্ট স্মরণ করিয়ে দিয়ে রায়ের এক অংশে বিচারক বলেন যে, ‘এখানে একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূণ এবং তাহা এই যে অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পূর্বে ও পরে নেতার অনুসারীগণের ব্যবহারে অনেক পার্থক্য। ইহা কিছুটা বোধগম্য আমাদের দেশে নেতাভিত্তিক রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষিতে যেমন নেতা আছেন তো সব আছে, নেতা নাই তো কেউ নাই।’ বঙ্গবন্ধু হত্যার ফলে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের যে বিরাট ক্ষতি হয়েছে সেটাও বিচারক রায়ে স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেছেন। তিনি রায়ে উল্লেখ করেন, আসামীদের এই অপরাধ এমন একটি ক্ষতির কার্য যাহা শুধু ব্যক্তি বিশেষের জন্যই ক্ষতিকর নয় বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের পক্ষেও ইহা একটি মারাত্মক ক্ষতি। ৯৬’র আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রায় ঘোষিত হলেও সাজাপ্রাপ্ত আসামীরা রায়ের বিরুদ্ধে হাই কোর্টে আপীল করায় সেখানে আইন অনুযায়ী বিচারকি কার্যক্রম চলতে থাকায় রায় কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসলে আবারও অন্ধকার, বঙ্গবন্ধুর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের যারা খুন করেছে তাদের বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় ঘোষিত হলেও উচ্চ আদালতে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করে তাদের বাঁচাবার পাঁয়তারা, আবারও ২১ আগস্টের মত রক্তাক্ত ট্রাজেডী। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভের পর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসলে বাংলাদেশ আবারও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হতে থাকে যার ধারাবাহিকতা বর্তমানেও অব্যাহত রয়েছে। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে উচ্চ আদালতে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আটককৃত খুনী লে. কর্ণেল (বরখাস্ত) সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্ণেল (অব.) সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, মেজর (অব.) বজলুল হুদা, মুহিউদ্দিন আহমদ (আর্টিলারি) ও এ কে এম মহিউদ্দিন আহমদ (ল্যান্সার) এর ফাঁসি কার্যকর করায় কিছুটা হলেও জাতি কলঙ্কমুক্ত হয়। পলাতক ৭ দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীদের মধ্যে অন্যতম ক্যাপ্টেন (বরখাস্তকৃত) আব্দুল মাজেদকে গত ১২ এপ্রিল ২০২০ দিবাগত রাতে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যদণ্ড কার্যকর করা হয়। তবে এখনও বঙ্গবন্ধুর খুনি বেশ কয়েকজন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামী বিদেশে পলাতক থাকায় তাদের ফাঁসি কার্যকর না হওয়ায় বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়েছে তা বলতে পারি না। মহাজোট সরকারের আমলে শুরু হয় ৭১’র কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যারা বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-কে সমর্থন করেছিল এবং খুনীদের আশ্রয়-পশ্রয় দিয়েছিল। ইতোমধ্যে যুদ্ধাপরাধী আব্দুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, মতিউর রহমান নিজামী এবং মীর কাসেম আলী-এর ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে ও অন্য যুদ্ধাপরাধীদেরও বিচার প্রায় সম্পন্ন হওয়ার পথে।

বঙ্গবন্ধু আমাদের বাংলাদেশ দিয়েছেন, একটি লাল সবুজের পতাকা দিয়েছেন, একটি সংবিধান দিয়েছেন আর আমাদের হৃদয়ে বুনে দিয়েছেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের মন্ত্রসুধা। যাঁরা ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ এ গান গেয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছে, যাঁরা ‘শোন একটি মুজিবরের কণ্ঠ থেকে লক্ষ মুজিবরের ধ্বনি প্রতিধ্বনি আকাশে ওঠে রণি’ এই গান গেয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বুকে লালন করছে, মুজিবের কথা মনে হলে যাঁদের দুচোখ ছাপিয়ে জল আসে, মুজিবের জন্য পল্লীর নিভৃতে যে দুঃখিনী মা এখনও রোজা রেখে চোখের জলে বুক ভাসায় তাদের হৃদয় থেকে এই মহানায়কের নাম মোছার সাধ্যি কার? বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি শ্লোগান প্রায়ই উচ্চারিত হয় তা হলো ‘এক মুজিবের লোকান্তরে, লক্ষ মুজিব ঘরে ঘরে’। এই শ্লোগানটির মধ্যে শ্বাশ্বত-সত্য লুকিয়ে রয়েছে। বাংলার ঘরে ঘরে আজও এতো মুজিব ভক্ত দেখে মনে হয় তিনি যেন আমাদের মাঝেই বেঁচে আছেন। ঘাতকেরা ভেবেছিল তাঁকে কবরের মাটির তলায় চাপা দিলেই তিনি মুছে যাবেন, শেষ হয়ে যাবেন, কিন্তু বাস্তব সত্য হচ্ছে জাতির জনককে মাটির তলায় চাপা দিয়ে রাখা যায় নি। তিনি কবর থেকে স্বমহিমায় সগৌরবে উঠে এসেছেন এবং মিশে আছেন বাংলার ফসলের আভায়, কৃষকের হাসিতে, শ্রমিকের ঘামে, নদীর কাঁশ বনে, শিশির ভেজা সবুজ দুর্বা ঘাসে, মাঝির ভাটিয়ালী গানে, তরুণ যুবার স্পন্দিত বুকে, কবিতার পংক্তিমালায় আর সাহসী মানুষের মিছিলে। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন এই ধন্যপুরুষ চিরঅমর হয়ে থাকবেন বাঙালির চেতনায়। কবি শামসুর রহমানের কবিতারভাষায় : ধন্য সেই পুরুষ /যাঁর নামের উপর রৌদ্র ঝরে চিরকাল /গান হয়ে নেমে আসে শ্রাবনের বৃষ্টিধারা /যাঁর নামের উপর কখনও ধুলো জমতে দেয় না হাওয়া /ধন্য সেই পুরুষ /যাঁর নামের উপর পাখা মেলে দেয় জোস্নার সারস।

লেখক: ড. মো. হাসিবুল আলম প্রধান
প্রফেসর, আইন বিভাগ ও পরিচালক, শহীদ সুখরঞ্জন সমাদ্দার ছাত্র-শিক্ষক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

 

, , ,
শর্টলিংকঃ