স্বাধীনতা অর্জন ও রক্ষায় আমাদের দায়িত্ব এবং করণীয়

জীবন দিয়ে ভাষার দাবী কিনতে হয়েছে আমাদের। আমাদের যেমন রয়েছে হাজার বছরের সমৃদ্ধ কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং শিল্পের ভান্ডার, তেমনি রয়েছে আজন্ম সংগ্রামে রক্ত ঝরার ইতিহাস। রয়েছে ঐতিহাসিক পলাশী থেকে ধানমন্ডি পর্যন্ত দেশের জন্য রক্ত দেয়ার অমোঘ ইতিহাস।

যুগেযুগে কালেকালে আমরা নির্যাতিত হয়েছি বিভিন্ন জাতি এবং গোষ্ঠীর হাতে- বর্গি, তুর্কি, আরব, পর্তুগিজ, ইংরেজ, পাকিস্তানিদের হাতে হতাহত আমাদের পূর্ব পুরুষদের রক্ত এ মাটিতে মিশে আছে। নীল কুঠিয়ালদের চাবুকের ক্ষত চিহ্ন এখনো লেগে আছে আমাদের পিতামহের পিঠে। অবশেষে শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে রবীন্দ্রনাথের মতো গুটি গুটি পায়ে গণসূর্যের মঞ্চে এলেন জনতার মহানায়ক হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সুদক্ষ নেতৃত্বে একনদী রক্তের বিনিময়ে তিনি ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর এনে দিলেন স্বাধীনতার লাল সূর্য।

আমাদের জাতীয় জীবনে সবচেয়ে ঘটনাবহুল ১৯৪৭-এ শুরু হয়ে ১৯৭১-এ পূর্ণতা পাওয়া মহান মুক্তিযুদ্ধ। ’৭১-এর মার্চ মাসের ২৬ তারিখে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা করেন। অপরাপর নেতৃত্ব এবং সাধারণ মানুষ সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন। যে সকল মহান আদর্শকে সামনে রেখে বীর জনগণ জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে আত্মনিয়োগ করেছিলেন, লাখো বীর প্রাণোৎসর্গ করেছিলেন তা হলো- বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা, এগুলো সংবিধানের মূলনীতি।

’৭১-এ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসর জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম, পাকিস্তানকে আল্লাহর ঘর ঘোষণা করে পাকিস্তানের অখ-তা রক্ষা  ও ইসলাম রক্ষার নামে ৩০ লক্ষ নিরীহ নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করেও বাংলাদেশের অভ্যূদয় ঠেকাতে পারেনি। যুদ্ধে পরাজিত হয়েও তারা ও তাদের দোসররা চক্রান্ত বন্ধ করেনি। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং একই বছরের ৪ নবেম্বর জাতীয় চার নেতাকে হত্যার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে পরাজয়ের প্রতিশোধ এবং আবার পাকিস্তানে ফেরার গভীর চক্রান্ত স্বল্প সময়ের জন্য তারা সফল করে।

বাঙালি জাতিয়তাবাদ মুছে ফেলে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ, চলচ্চিত্র আইনসহ কালো আইন ছিল এদেশকে আফগান বানানোর চক্রান্ত। বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের বিচার, মানবতার ঘাতকদের বিচারের পর সময় এসেছে ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়ার, যাতে মূর্ত এবং চর্চিত হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

এ সমস্ত লক্ষকে সামনে রেখে ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি শহীদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন, আর্ন্তজাতিক অপরাধ দমন ট্রাইবুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতিমুক্ত, বৈষম্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠাই যার উদ্দ্যেশ্য। নির্মূল কমিটির লক্ষ বাংলাদেশকে একটি অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ ও কল্যাণকামী রাষ্ট্রে পরিণত করা।

আমাদের মধ্যে এখনো পাকিস্তানী দালালদের প্রেতাত্মা ভর করে আছে। যাদের ভিত সমাজের গভীরে প্রবেশ করেছে। বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রত্যক্ষ সহায়তায় স্বাধীনতাবিরোধী গণশত্রুরা ডালপালা গজিয়েছে সমাজ কাঠামোর সর্বক্ষেত্রে। জামায়াতের ঘাতক বাহিনী- রাজাকার, আলবদর, আল শামস এখনো ওত পেতে আছে সর্বত্র। তারা যে কোন সময় যে কোন বিপর্যয় ঘটাতে পারে। যার মধ্যে আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালকে নানানভাবে বাধাগ্রস্ত করা, বর্হিবিশে^ দেশবিরোধী প্রচার করা, বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক উস্কানি এবং হামলা পরিচালনা করা, উদ্ভট রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করা ইত্যাদি।

মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার কার্যক্রম শেষ করলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা এখন মূল কাজ। যে অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ- এখনই সময় সকলকে জানতে হবে স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস। দেশ ও জাতিবিরোধী সকল চক্রান্ত প্রতিহত করে অবিলম্বে ’৭২-এর সংবিধান পুনঃপ্রবর্তন জরুরি। এক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের শত্রুদের কোন ছাড় দিলে তা হবে আত্মহত্যার নামান্তর। স্বাধীনতা যুদ্ধ, যুদ্ধকালীন গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী হত্যা, স্বাধীনতা উত্তর গণশক্রদের কার্যক্রম নতুন প্রজন্মকে জানানো আমাদের দায়িত্ব। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি সেই লক্ষে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে- পরবর্তী প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশপ্রেমিক বিশ্বনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

জয় বাংলা

বাংলাদেশ চিরজীবী হোক

লেখকঃ নাহিদা ফরিদা মুনমুন

সাধারণ সম্পাদক, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, রামগতি, লক্ষীপুর জেলা।

, , , ,
শর্টলিংকঃ