স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থা ও করণীয়

  • 4
    Shares
অধ্যাপক ড. মো. হাসিবুল আলম প্রধান

ব্যাঙ্গালুরুর ন্যাশনাল ল’ স্কুল অফ ইন্ডিয়ার আমন্ত্রণে তাদের ২০১৯ সালের ২০-২১ জুলাই দুই দিনব্যাপী বার্ষিক কনফারেন্সে যোগদানের জন্য ওই বছর ১৯ জুলাই ব্যাঙ্গালুরু গিয়েছিলাম। সেমিনার শেষ করেও ব্যাঙ্গালুরুতে ২৫ জুলাই পর্যন্ত ছিলাম। ২৫ জুলাই সকালে ব্যাঙ্গালুরুতে অবস্থিত ড. দেবী প্রসাদ শেঠির নারায়না হৃদয়ালয় হাসপাতালে একটা প্যাকেজের অধীন নিয়মিত চেকআপ করাতে যাই। সকালে সেখানে গিয়ে মনে হলো এ যেন আরেক বাংলাদেশ। রোগীদের শতকরা ৮০ ভাগই বাংলাদেশ থেকে আগত। অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়ে জানতে পারলাম কেউ রাজশাহী, কেউ ঢাকা, কেউ জয়পুরহাট, কেউ রংপুর, কেউ নওগাঁ, কেউ মানিকগঞ্জ অর্থাৎ দেশের প্রায় সব জায়গা থেকে লোক এখানে চিকিৎসার জন্য এসেছে। এখানে বাংলাদেশী রোগীদের সংখ্যা এতো বেশি যে, তাদের সেবা দেয়ার জন্য একজন বাঙালী মহিলার নেতৃত্বে বিশেষ ডেস্ক খোলা হয়েছে। বাংলাদেশী রোগীদের অনেকের সঙ্গে কথা হলে তাদের একটাই কথা- অনেক কষ্ট, অনেক খরচ, তবু এসেছি কারণ দেশে ভাল চিকিৎসা নেই এবং রোগ যে সঠিকভাবে নির্ণিত হবে তারও নিশ্চয়তা নেই।

এ অভিজ্ঞতার কথাগুলো লিখলাম কারণ আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি মানুষ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। সেই বিশ্বাস হারানোর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হলো করোনাকালীন দুর্যোগ সময়ে রিজেন্ট হাসপাতাল, শাহাবুদ্দীন হাসপাতাল ও জেকেজির ভুয়া করোনা রিপোর্ট দিয়ে কোটি কোটি টাকার লুটপাটে। রিজেন্ট হাসপাতালের কর্ণধার সাহেদ করিম এবং জেকেজির চেয়ারম্যান ডাঃ সাবরিনা আরিফ চৌধুরী, শাহাবুদ্দীনের এমডিও অন্যরা ইতোমধ্যে র্যা ব ও পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছে এবং তাদের নানা দুর্নীতির খবর ও অপকর্ম বেরিয়ে আসছে। করোনা মহামারীর এই দুর্যোগকালীন সময়ে যারা এ ধরনের অমানবিক প্রতারণা অনায়াসে করেছে, এসব অমানুষ প্রতারকদের অপকর্মের খবর দেখে জাতি স্তম্ভিত। করোনার দুঃসময়ে এসে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি চিকিৎসা খাতে দুর্নীতি, প্রতারণা, অব্যবস্থাপনা ও হতাশার চিত্র। স্বাস্থ্য খাতে মানুষের জীবন নিয়ে কত ধরনের প্রতারণা হতে পারে, রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক সাহেদ গ্রেফতার হওয়ার পর এ সংক্রান্ত তার নানা কাহিনী প্রকাশ পাচ্ছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতা নিয়ে নানা প্রশ্ন প্রতিনিয়ত মানুষের মনে উদ্রেক হয়েছে। করোনা হয়নি এমন মানুষ চিকিৎসার অভাবে হাসপাতালের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে ঘুরে মরেছে দেখে মানুষ কষ্ট পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে বাংলাদেশ কৃষি, অর্থনীতি, শিক্ষা, বিদ্যুত, পরিবেশ ও প্রযুক্তি ইত্যাদিতে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করলেও চিকিৎসা ব্যবস্থার দুরবস্থা এই কারোনাকালীন দুর্যোগে মারাত্মকভাবে ফুটে উঠেছে। চিকিৎসা খাতের বেহাল দশা নিয়ে যখন নানা আলোচনা সমালোচনা চলছে, তারই মধ্যে গত ২১ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহা-পরিচালক অধ্যাপক ডাঃ আবুল কালাম আজাদ পদত্যাগ করেছেন। ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে যে তার কঠোর অবস্থানের কারণে সাহেদ, ডাঃ সাবরিনা আরিফ চৌধুরী ও ফয়সাল আল ইসলামের মতো প্রভাবশালী চক্র, যারা এতদিন স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণসহ স্বাস্থ্যসেবায় প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রী যেহেতু নিজেই স্বাস্থ্য বিভাগে তীক্ষ নজর দিয়েছেন এবং এই বিভাগের প্রতারক চক্রের গডফাদারদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন, তাই এবার স্বাস্থ্যব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে এবং স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন হবে।

মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকারের মধ্যে অন্যতম একটি হলো চিকিৎসা। কিন্তু সেই চিকিৎসা ব্যবস্থাকে নিয়ে কিছু প্রভাবশালী চক্র যখন মানবসেবার পরিবর্তে প্রতারণার ফাঁদ পেতে দুর্নীতির আশ্রয় ও ব্যবসা হিসেবে নেয়, তখন চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন কিভাবে সম্ভব? খোদ রাজধানীতেই নামী-দামী বেসরকারী হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা খাত নিয়ে যে অরাজকতা ও দুর্নীতি চলছে, তাহলে সমগ্র দেশের বেসরকারী চিকিৎসা খাতের অবস্থা কী-একবার ভেবে দেখুন। সম্প্রতি পত্রিকায় খবর এসেছে, লাইসেন্সবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ অধিকাংশ বেসরকারী হাসপাতাল-ক্লিনিকে চলছে দেশের চিকিৎসা সেবা। দেশে বর্তমানে বেসরকারী হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে সতেরো হাজার দুই শ চুয়াল্লিশটি। এর মধ্যে মাত্র পাঁচ হাজার প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের কোন নজরদারি না থাকায় সেবার নামে বেসরকারী স্বাস্থ্য খাতে চলছে প্রতারণা ও ব্যবসা। চিকিৎসা ব্যবস্থায় দুর্নীতি ও প্রতারণা বন্ধ করে মানসম্মত সেবা দিতে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় সরকারকে শক্ত অবস্থান নিতে হবে এবং কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের কাছে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হলো- বিদেশে চিকিৎসা নেয়ার প্রবণতা বন্ধে ও মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি করতে দেশকে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনা, রংপুর ও ময়মনসিংহ এই ৬টি জোনে বিভাগ করে ৬টি সরকারী ব্যবস্থাপনায় উন্নতমানের আধুনিক হাসপাতাল খোলা হোক। এ হাসপাতালগুলোর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে দেশের সেরা, দক্ষ, সৎ ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের। প্রয়োজনে দেশের বাইরে থেকে দক্ষ চিকিৎসক এনে উন্নত চিকিৎসা সেবা দিতে হবে। এই চিকিৎসকরা ব্যক্তিগত প্র্যাকটিস করবেন না-এই অঙ্গীকার ব্যক্ত করে কাজে যোগ দেবেন এবং তাদের বেতন ও আর্থিক সুবিধাদি বিশেষ স্কেলে বেশি দেয়া হবে। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হলো- ডাক্তারদের প্রাইভেট প্র্যাকটিসের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আনতে মনিটরিং বাড়াতে হবে। একজন ডাক্তার প্রতিদিন কতজন রোগী দেখতে পারবেন তা নির্ধারণ করতে হবে, অফিস টাইমে হাসপাতাল ছেড়ে যে ডাক্তাররা ক্লিনিক বা প্রাইভেট প্র্যাকটিসে জড়িত। তাদের নামের তালিকা তৈরি করতে হবে, প্রচলিত আইনের সংস্কার করতে হবে। বেসরকারী চিকিৎসা খাতকে কঠোর সরকারী নজরদারি ও আইনী নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনতে হবে। বিশেষ করে দেশে ক্লিনিকের নামে যে স্বাস্থ্যসেবা প্রতারণা হচ্ছে, সেসব সরকারকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। সারাদেশে ক্লিনিকগুলোর তালিকা তৈরি করে যেগুলো সরকারী অনুমোদনপ্রাপ্ত সেগুলো জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করতে হবে। সরকার অনুমোদিত নয় এমন ক্লিনিকগুলো সরকারকে অবিলম্বে বন্ধ করে দিতে হবে। ক্লিনিক ও বেসরকারী প্যাথলজিগুলো বিশেষায়িত ডাক্তার দ্বারা বিভিন্ন পরীক্ষার রিপোর্ট তৈরি করছে কিনা তা মনিটরিং করতে হবে। অনুমোদিত ক্লিনিকগুলোর চিকিৎসকদের তালিকা সরকার সংগ্রহ করে এর প্রত্যেক চিকিৎসকের সনদ সংগ্রহ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সকল সনদের বৈধতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। বেসরকারী ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো পরিচালনার জন্য ১৯৮২ সালের দ্য মেডিক্যাল প্র্যাকটিস এ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিক এ্যান্ড ল্যাবরেটরিস (রেগুলেশন) অধ্যাদেশ নামক একটি অনেক পুরনো আইন থাকলেও এর যেমন সুষ্ঠু প্রয়োগ নেই। আইনটি সময়োপযোগী করতে পরিবর্তন দরকার। এ লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন ‘চিকিৎসা ও দন্ত চিকিৎসা পেশা এবং বেসরকারী ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ল্যাবরেটরি (নিয়ন্ত্রণ) আইন-১৯৯৭’-এর খসড়া মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থাপিত করা হলেও প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় অনুমোদন করা হয়নি। তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সালাহউদ্দিন ইউসুফসহ মন্ত্রিসভার অধিকাংশ সদস্য আইনটির পক্ষে থাকলেও সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা করে একজন আমলা মন্ত্রীর বিরোধিতার কারণে খসড়াটি অনুমোদিত হয়নি। এ রকম আইন পাস করা এখন সময়ের দাবি। সর্বোপরি দেশের অভিজ্ঞ ও মেধাবী চিকিৎসক, আইনজীবী, সাংবাদিক ও মানবাধিকার সংগঠনের কর্মীদের নিয়ে একটি শক্তিশালী জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন গঠন করা হোক, যারা দেশের মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষার একটি আধুনিক জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন করবে।

 

লেখক : ড. মো. হাসিবুল আলম প্রধান

অধ্যাপক, আইন বিভাগ এবং পরিচালক, শহীদ সুখরঞ্জন সমাদ্দার ছাত্র-শিক্ষক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

, , ,
শর্টলিংকঃ