হিন্দুপল্লীতে হামলায় শোয়াইব-মামুনুল গংকে হুকুমের আসামী হিসেবে গ্রেফতারের দাবি

  • 94
    Shares

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আন্তর্জাতিক ওয়েবিনার থেকে সুনামগঞ্জের হিন্দুপল্লীতে সাম্প্রদায়িক হামলার জন্য হেফাজত নেতাদের হুকুমের আসামী হিসেবে গ্রেফতারের দাবি করা হয়েছে।

আজ (২২ মার্চ) একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির এক আন্তর্জাতিক ওয়েবিনারে সুনামগঞ্জের হিন্দুপল্লীতে সাম্প্রদায়িক হামলার তদন্তে নির্মূল কমিটি এবং আদিবাসী ও সংখ্যালঘু বিষয়ক সংসদীয় ককাসের যৌথ উদ্যোগে জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। ৭ সদস্য বিশিষ্ট এই তদন্ত কমিশনের সদস্যবৃন্দ হচ্ছেন বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক (চেয়ারপার্সন), জনাব রাশেদ খান মেনন এমপি, জনাব হাসানুল হক ইনু এমপি, জনাব ফজলে হোসেন বাদশা এমপি, মানবাধিকার নেত্রী আরমা দত্ত এমপি, নির্মূল কমিটির সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির ও ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ (সদস্য সচিব)। এই কমিটি আগামী ১ মাসের ভেতর সরেজমিনে তদন্ত করে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রতিবেদন প্রদান করবে।

নির্মূল কমিটির সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই ওয়েবিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফা জব্বার। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা রাশেদ খান মেনন এমপি, জাসদ-এর সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা হাসানুল হক ইনু এমপি, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী দক্ষিণ এশীয় গণসম্মিলন-এর সভাপতি বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ভাষাসংগ্রামী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পৌত্রী সমাজকর্মী আরমা দত্ত এমপি, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খৃস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মানবাধিকার নেতা উষাতন তালুকদার, নির্মূল কমিটির যুক্তরাজ্য শাখার নেতা সাংবাদিক মতিয়ার চৌধুরী, নির্মূল কমিটির সিলেট জেলা শাখার আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা সুব্রত চক্রবর্ত্তী জুয়েল, নির্মূল কমিটির সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সদস্য সচিব এডভোকেট রুহুল তুহিন ও নির্মূল কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল।

প্রধান অতিথির ভাষণে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘সুনামগঞ্জের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর হামলার বিষয়ে নির্মূল কমিটির বক্তব্য জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে ’৭১-এর পরাজিত শক্তি আবার শক্তিশালী হচ্ছে। ১৭ তারিখ এ হামলার খবর পাওয়ার পর আমি স্তম্ভিত হয়ে যাই। ফেসবুকের স্ট্যাটাসের বিষয়টি বুঝেছি যে তা পূর্বপরিকল্পিত। মসজিদে মাইকে ঘোষণা দিয়ে নোয়াগাঁওতে হিন্দুপল্লীতে আক্রমণ করা হয়। আমার কাছে অবাক লেগেছে ঝুমন দাসকে যখন গ্রেফতার করা হয়, তখনও তার নামে মামলাও ছিল না। এই ঘটনা বর্তমান বাংলাদেশের প্রতিকৃতি। শাল্লার সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি আবার চেষ্টা করছে বাংলাদেশকে পাকিস্তানে রূপান্তর করার। নির্মূল কমিটি শাল্লার ঘটনার জন্য অপরাধীদের  শাস্তির যে দাবি তুলেছে তা জাতীয়ভাবে বিবেচনা করে ব্যবস্থা নিতে হবে। এই প্রেক্ষিতকে বিবেচনা করে সমন্বিতভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের রাজনৈতিক লড়াইটা চালিয়ে যেতে হবে। হামলাকারীরা ’৭১-এর পরাজিত শক্তিরই উত্তরসূরী। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের দল, সংগঠন ও জনসাধারণ সম্মিলিত এবং রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করলে তারা পরাজিত হতে বাধ্য। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে কথা বলে বুঝেছি, যুবলীগের ঘাড়ে দায় চাপানোর প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন এবং আমিও এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেব।’

ওয়ার্কাস পার্টির সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা রাশেদ খান মেনন এমপি বলেন, ‘শাল্লার সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনায় প্রশাসন সহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতৃবৃন্দের বক্তব্যে হেফাজতকে উহ্য করে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। আজকের ওয়েবিনারে বিষয়গুলো পরিষ্কার হয়েছে। প্রশাসন আমাদেরকে ঢাকায় সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠান করতে কঠোরভাবে নিষেধ করছে। কিন্তু শানে রিসালতের নামে যেখানে মামুনুল হক গিয়েছিলেন সেখানে প্রশাসনের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এটা স্পষ্ট এ ঘটনা হেফাজত ঘটিয়েছে। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে আওয়ামী লীগের অনেক নেতার আলোচনায় হেফাজতের নাম খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। হেফাজতের দায় নিজের কাঁধে তুলে নিতে আওয়ামী লীগ দ্বিধা করছে না। সরকার যদি বিচার বিভাগীয় তদন্ত না করে তাহলে নির্মূল কমিটি ও আদিবাসী ও সংখ্যালঘু বিষয়ক সংসদীয় ককাস যৌথভাবে এ বিষয়ে তদন্ত কমিশন গঠন করতে পারে। যেহেতু বিষয়টি বাংলাদেশের সংবিধান এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে ভয়াবহ ষড়যন্ত্র, সেহেতু এ বিষয়ে উচ্চতর আদালতে রিট মামলা করা যায় কি না তা বিবেচনা করা প্রয়োজন।’

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা হাসানুল হক ইনু এমপি বলেন, ‘যারা আক্রমণের শিকার তাদের প্রতি সমবেদনা জানাই। স্থানীয় প্রশাসন এবং পুলিসের ভূমিকার নিন্দা করি। শাল্লায় হিন্দুদের উপর হামলা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। করোনাকালে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা এবং উপড়ে ফেলার উস্কানি ও হুংকার দিচ্ছে হেফাজতে ইসলাম। তারা ধারাবাহিকভাবে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছে বঙ্গবন্ধু, সংবিধান, বাঙালি সংস্কৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে। এগুলো পরিকল্পিত ও সুচিন্তিত। তারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে নির্দিষ্ট ছকে বাংলাদেশকে পাকিস্তানি ধারার রাষ্ট্রে পরিণত করার চক্রান্তে লিপ্ত। যখন সুনামগঞ্জের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রশ্নের জবাবে হেফাজতের নাম বলতে পারে না তখন কষ্ট হয়। হেফাজতিরা প্রধানমন্ত্রীকে সুযোগ পেলেই ছোবল মারবে। মামুনুল হক পেশাদার উস্কানীদাতা, ধর্মব্যবসায়ী। ঝুমন দাসকে এখনই ছেড়ে দেয়ার দাবি জানাই। মামুনুল হক সহ উস্কানিদাতাদের অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবি জানাচ্ছি। ৭২ ঘন্টা সময় পেয়েও স্থানীয় সরকার আক্রমণ ঠেকাতে পারে নি। এই ব্যর্থতা উদ্দেশ্যমূলক। এ বিষয়ে তদন্ত হওয়া উচিত।’

মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী দক্ষিণ এশীয় গণসম্মিলন-এর সভাপতি বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, ‘আমি ঝুমন দাসের মন্তব্য দেখেছি, আইসিটি আইনে কোনো অবস্থায় ঝুমন দাসকে গ্রেফতার করা যায় না। স্থানীয় প্রশাসন পূর্বাহ্নে সতর্ক হলে এই হামলা এড়ানো যেত। প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে স্বাধীনতা বিরোধী সাম্প্রদায়িক অপশক্তির দোসররা বসে আছে।’

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খৃস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মানবাধিকার নেতা উষাতন তালুকদার বলেন, ‘জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তীতে শাল্লা উপজেলায় হামলা পূর্ব পরিকল্পিত। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে বারবার এ ঘটনাগুলো ঘটছে। স্বাধীন সার্বভৌম দেশে এ হামলা মেনে নেওয়া যায় না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শক্তির দৃশ্যমান উদ্যোগ কামনা করছি। সরকার, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিভিন্ন সংগঠন এবং আপামর জনগণের কাছে এ আহ্বান করব সাম্প্রদায়িক হামলার জন্য দায়ী অপরাধীদের দ্রুত শাস্তি দেওয়া হোক এবং হামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের ঘরবাড়ি ও মন্দির পুনর্নির্মাণ করে দেওয়া হোক।’

সভাপতির ভাষণে শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘হিন্দুদের উপর মৌলবাদী সন্ত্রাসীদের হামলার অজুহাত হিসেবে সব সময় ফেসবুক-এ কোনও অমুসলিম যুবকের বিরুদ্ধে ইসলাম অবমাননার অভিযোগ আনা হলেও রামু থেকে নাসিরনগর পর্যন্ত সকল হামলার পর গোয়েন্দা তদন্তে জানা গিয়েছে অভিযুক্ত অমুসলিম যুবক এর জন্য দায়ী ছিল না। সুনামগঞ্জের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ও গ্রেফতারকৃত ঝুলন দাস ইসলামের বিরুদ্ধে কোনও কটূক্তি করে নি। সে হেফাজতের নেতা মৌলবাদী সন্ত্রাসী মামুনুল হকের বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙার হুমকি এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টিকারী বক্তব্যের সমালোচনা করেছিল। আইন শৃঙ্খলা কর্তৃপক্ষ এটাকে ‘আপত্তিকর’ এবং মামুনুল হকের মতো সন্ত্রাসী দুর্বৃত্তকে ইসলামের সমার্থক বিবেচনা করে নিরাপরাধ ঝুলনকে গ্রেফতার করে হেফাজতিদের তুষ্ট করতে চেয়েছে যা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে কখনও কাম্য হতে পারে না।

‘সুনামগঞ্জে হিন্দুদের উপর পরিকল্পিত হামলার জন্য দায়ী হেফাজত নেতা শোয়াইব-মামুনুল গংকে যেখানে হুকুমের আসামী হিসেবে গ্রেফতার করা উচিৎ ছিল পুলিস সেখানে গ্রেফতারের জন্য কাউকে খুঁজে পায়নি! ২০১৩ সাল থেকে হেফাজতের নেতারা আমাদের বিরুদ্ধে অশ্লীল কদর্য মিথ্যাচার করে ওয়াজের মাঠ গরম করছে কিন্তু পুলিস এর জন্য একজন হেফাজতিকে আজ পর্যন্ত গ্রেফতার করে নি। এমনকি যে ভাষায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙার হুমকি দিয়েছে তাতে দেশের জাতির পিতা এবং সংবিধানের গুরুতর অবমাননা হলেও এর জন্য একজনও মৌলবাদী দুর্বৃত্তকে গ্রেফতার করা হয় নি।

‘বিজয়ের মাসে প্রশ্রয় পেয়ে হেফাজতিরা স্বাধীনতার মাসে মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তীর উৎসব প্রতিহত করার হুমকি দিয়েছে। যে ভারত মুক্তিযুদ্ধের প্রধান বন্ধু, যে ভারতের সরকার ও জনগণের নজিরবিহীন সমর্থন ও সহযোগিতা ছাড়া নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অসম্ভব ছিল মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে সেই ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আগমনের বিরোধিতা করে হেফাজতিরা বুঝিয়ে দিয়েছে তারা ’৭১-এ যেভাবে পাকিস্তান রক্ষার জন্য ভারতের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে হিন্দু নিধন করেছে এখনও তারা সেই অবস্থানে রয়েছে।’

ওয়েবিনারের শুরুতে ১৭ মার্চ সুনামগঞ্জের হিন্দুপল্লীতে হেফাজতীদের নৃশংস হামলার ভিডিও প্রতিবেদন প্রদর্শিত হয়।

বাংলা প্রবাহ/এম এম

, , , , ,
শর্টলিংকঃ