‘৭১-এর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি আর কি করবে

  • 85
    Shares

নির্মূল কমিটি গঠিত হয়েছিল শহীদ রুমীর মা বেগম জাহানারা ইমামের উদ্যোগে ‘৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে প্রধান লক্ষ্য গণ্য করে ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানী দালালদের গুরু গোলাম আযমের প্রতীকি বিচারের জন্য ‘গণআদালত’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে।

এই পদক্ষেপটি বাংলাদেশের ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। নির্মূল কমিটির সে দিনের সেই ‘গণআদালত’ অনুষ্ঠানের তথ্যটি জনগণের মনে যে বিপুল সাড়া জাগিয়েছিল তা সেদিনের সমাবেশে লক্ষ জনতার উপস্থিতি প্রমাণ করে। এদিনটি আজও আমাদেরকে ‘৭৫-এর পর মুক্তিযুদ্ধে প্রাপ্ত বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের সদম্ভে প্রত্যাবর্তন এবং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল, পরবর্তীতে প্রমাণিত মিত্র সরকারগুলোর দ্বারা যুদ্ধাপরাধীর বিচার নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হলে জাতি হতাশায় নিমজ্জিত হয়। স্বাভাবিকভাবেই জাতি যখন দেখতে পেল মুক্তিযুদ্ধের প্রধান নায়ক বঙ্গবন্ধু হত্যা, জাতীয় চার নেতা হত্যা, গ্রেফতারকৃত কত যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি ও তাদের বিচারের জন্য প্রণীত ‘দালাল আইন’ বাতিল, যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রীত্ব দান, সর্বোপরি, বঙ্গবন্ধু ও চার নেতার খুনীদের পুরস্কৃত করে বিদেশে প্রত্যাবাসন ও তাদের বিচার বন্ধের লক্ষ্যে কুখ্যাত ‘ইনডেমনিটি বিল’ অনুমোদন জাতিকে বুঝিয়ে দেয় যে বাংলাদেশ এখন যুদ্ধাপরাধীদের কাক্ষিত পাকিস্তানের ভাবাদর্শে পরিচালিত হচ্ছে!

বাস্তবিক ‘৭১-এ পাকিস্তান ও যুদ্ধাপরাধীরা পরাজিত হয়েছিল, কিন্তু ‘৭৫-এর ১৫ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ জিয়াউর রহমান ও খোন্দকার মোশতাকের হাত ধরে পরাজিত হয়, বিজয়ী হয় যুদ্ধপরাধী ও তাদের মিত্ররা। এমন পটভূমিতে ‘৯১ সালে এরশাদের পতন হলে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাতে বিএনপি বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে এবং ‘৭৫এর পর প্রথম গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান প্রধানমন্ত্রী হয় খালেদা জিয়া। এ সময়, জাতির অগ্রগামী কিছু ব্যক্তি, শহীদজননী, শহীদের পরিবারবর্গ ও মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক, রাজনীতিক, কবি, সাহিত্যিক, আইনজীবী যুদ্ধাপরাধীদের অসম্পন্ন বিচার সম্পন্ন করার লক্ষ্যে ‘৯২ সালের ২৬ মার্চ ‘গণআদালত’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকারকে এ বিচারকাজটি শুরু করার জন্য চাপ তৈরি করে। এর পরের ঘটনাবলী  ইতিহাস তৈরি করেছে। যুদ্ধাপরাধীদের প্রধান নেতাদের দেশ বিরোধী কর্মকান্ডের তদন্তের ফল প্রকাশ উপলক্ষে ঢাকায় শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে বিশাল বিশাল জনসমাবেশ অনুষ্ঠান করে নির্মূল কমিটি। ২০০৮-এর নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সব রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট গঠন করে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে দীর্ঘকাল পর জাতি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের স্বপ্নটি আবার নতুন করে দেখে এবং আশায় বুক বাঁধে যে সে স্বপ্ন এবার বাস্তব রূপ গ্রহণ করবে। ২০১০- এ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন, ‘৭৩’ এর সাহায্যে দুটি ট্রাইবুনাল গঠিত হয়। পাশাপাশি, তরুণ প্রজন্ম যারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে সর্বোচ্চ দন্ডের দাবীতে ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ গঠন করে লাখো তরুণ তরুণীর জমায়েত ঘটায় ঢাকার শাহবাগে। দ্রুতই এই ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ সব জেলায় সংগঠিত হয়। যুদ্ধাপরাধী নেতা ও জামায়াত নেতাদের বিচারে ফাঁসী হওয়া এ দশকের একটি বড় অর্জন হিসাবে চিহ্নিত হয়। বর্তমানে একটি ট্রাইবুনালে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ অব্যাহত ভাবে চলছে। এখন নির্মূল কমিটি গঠনের প্রধান লক্ষ্য অর্জিত হবার পর সংস্থাটির ভবিষ্যত কার্যক্রমের কথা ভাবার সময় এসেছে।

উল্লেখ্য নির্মূল কমিটির অন্যতম আরেকটি কাজ হচ্ছে- সমাজের সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং তাদেরকে সংখ্যাগুরু ভূমিগ্রাসী, দখলদার, মৌলবাদীদের হামলা-নির্যাতন থেকে রক্ষা করা। প্রতি নির্বাচনে, এমনকি বিএনপি-জামায়াত সরকার গঠন করলে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা-নির্যাতন, লুট, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদির ঘটনা বেশি ঘটে থাকে। আওয়ামী লীগ সরকার আমলেও মৌলবাদী দল, সন্ত্রাসীরা আওয়ামী লীগ সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার জন্যও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা-নির্যাতন সংঘটিত করেছে। সুতরাং হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আহমদীয়া, পার্বত্য ও সমভূমির উপজাতিদের সুরক্ষা দিতে নির্মূল কমিটি নানা পন্থা ও পদক্ষেপ গ্রহণ অতীতে যেমন করেছে, তেমনি ভবিষ্যতেও করবে। এ কাজটি নির্মূল কমিটির অন্যতম প্রধান কার্যক্রম হিসেবে থাকবে।

তাছাড়াও, বাংলাদেশের জন্মের প্রায় পঞ্চাশ বছর অতিক্রান্ত হলেও এখনো মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম তুলতে এবং সরকার প্রদত্ত সুবিধাদি গ্রহণ করতে সক্ষম হয়নি, যা দুঃখজনক শুধু নয়, চরম লজ্জাজনকও বৈকী। এক্ষেত্রে নির্মূল কমিটি জেলা, উপজেলায় প্রমাণিত স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার তালিকা তৈরি করতে পারে এবং সরকারকে সে তালিকার অন্তর্গত সরকারী তালিকায় বাদ পড়াদের বিষয়ে যথাযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করতে এবং তাদেরকে সরকারী সহায়তা পেতে সাহায্য করতে পারে। এমনকি একই সাথে তাদের স্ত্রী, সন্তানদের পরিচয়ও তালিকায় সংযুক্ত করতে পারে যা সরকারের কাজকে বিশ্বাসযোগ্য ও সহজসাধ্য করে তুলতে পারে।

এসাথে নির্মূল কমিটি বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধা গণ্য করে রাষ্ট্রীয় সুবিধাদি দেবার কাজটি শুরু করেছিল যেটি এখনো অব্যাহত রাখা দরকার। এক্ষেত্রে নির্মূল কমিটি সরকারকে সহায়তা দিতে পারে।

নির্মূল কমিটি বর্তমানে একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হতে পারে, যেটি জঙ্গীবাদ-মৌলবাদবিরোধী পাড়া-মহল্লার সন্ত্রাসী বিরোধী, নারী-শিশু নির্যাতন বিরোধী, প্রচার প্রচারণাসহ নানারকম কর্মসূচী গ্রহণ করতে পারে। নির্মূল কমিটি সমাজের প্রাচীন মাইন্ড সেট পরিবর্তনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে।

লেখক: মমতাজ লতিফ

শিক্ষাবিদ ও সহ-সভাপতি, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।

বাংলা প্রবাহ/এম এম

, ,
শর্টলিংকঃ