তালেবানের ক্ষমতাদখলে জামায়াত হেফাজতীদের মত বিএনপিও উদ্দীপ্ত: শাহরিয়ার কবির

আজ ২৯ আগস্ট (২০২১) বিকেল ৩টায় একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি কর্তৃক আয়োজিত ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তালেবানের পুনরুত্থান: তরুণ সমাজের করণীয়’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক ওয়েবিনারে প্রধান বক্তার ভাষণে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি লেখক সাংবাদিক চলচ্চিত্রনির্মাতা শাহরিয়ার কবির একথা বলেন।

শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘আফগানিস্তানে জঙ্গী মৌলবাদী সন্ত্রাসী তালেবানদের দ্বিতীয়বার ক্ষমতাদখল বাংলাদেশে তালেবানপন্থী জামায়াত-হেফাজতীদের পাশাপাশি বিএনপির মতো জঙ্গী পৃষ্ঠপোষক অবৈধ ক্ষমতাদখলকারীদের যারপরনাই উদ্দীপ্ত করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হেফাজত-জামায়াত-বিএনপির মানসসন্তানরা আফগানিস্তানে তালেবানদের ক্ষমতাদখলের যথার্থতা তুলে ধরার পাশাপাশি বাংলাদেশ সহ গোটা উপমহাদেশে খিলাফত প্রতিষ্ঠার কথা বলছে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে অনেকে তালেবানদের প্রতারণামূলক নমনীয় আচরণ ও মিষ্টি কথায় বিভ্রান্ত হয়ে বলছেন এই তালেবানরা আগের তালেবানদের চেয়ে ভাল। আমেরিকা অনেক দিন গবেষণা করে তালেবানদের ভেতর ‘ভালো’ আর ‘খারাপ’ আবিষ্কার করে তথাকথিত ভালোদের সঙ্গে সমঝোতা করে তাদের হাতে বিশাল আধুনিক অস্ত্রভাণ্ডার তুলে দিয়ে আফগানিস্তান থেকে বিদায় নিয়েছে। তালেবানদের ভেতর ‘ভালো’ আর ‘মন্দ’ খোঁজার চেষ্টা সৈয়দ মুজতবা আলীর ভাষায় ‘বন্ধাগমণের মতো নিস্ফল চেষ্টা’। আফগানিস্তানের বর্তমান তালেবানরা নতুন বোতলে পুরনো মদ। ক্ষমতায় নিজেদের অবস্থান একটু মজবুত করতে পারলেই তারা অতীতের চেয়েও ভয়ঙ্কর অবয়বে আত্মপ্রকাশ করবে এটা আফগানিস্তানের প্রগতিকামী রাজনীতিবিদ থেকে আরম্ভ করে শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী সবাই বলছেন।’

শাহরিয়ার কবির আরও বলেন, ‘আমেরিকার মতো পাকিস্তানও সন্ত্রাসী তালেবানদের স্বীকৃতির প্রদানের জন্য উন্মুখ। পাকিস্তান ও আমেরিকা ইসলামের নামে নিজেদের রাজনৈতিক মতলবে তালেবান ও আল কায়দা সৃষ্টি করেছে এবং বিশ্বব্যাপী ইসলামের নামে সন্ত্রাসী জঙ্গীবাদ ছড়িয়ে দিয়েছে। আমাদের তরুণ সমাজকে এসব বিষয়গুলো জানতে হবে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সহ শিল্প, সংস্কৃতি ও রাজনীতির সকল মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষ মানবতা এবং সুফীসাধকদের শান্তি, সমন্বয় ও মানবতার ইসলামের কথা তুলে ধরতে হবে। ধর্ম-বর্ণ-জাতি-ভাষা-লিঙ্গ নির্বিশেষ সব মানুষের সমান অধিকার মর্যাদার সংগ্রামে তরুণ সমাজকে যুক্ত হতে হবে, যুক্ত করতে হবে। অন্যথায় আমাদের যাবতীয় অর্জন মধ্যযুগীয় তামসিকতায় হারিয়ে যেতে পারে।’

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আইটি সেলের সভাপতি শহীদসন্তান আসিফ মুনীর তন্ময়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই ওয়েবিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফা জব্বার। সভায় বক্তব্য প্রদান করেন নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় নেতা ও সংগঠনের বহুভাষিক সাময়িকী ‘জাগরণ’-এর যুগ্ম সম্পাদক লেখক সাংবাদিক সাব্বির খান, গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট অমি রহমান পিয়াল, ব্লগার এন্ড অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কের সভাপতি ও গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট ড. কানিজ আকলিমা সুলতানা, নির্মূল কমিটির আইটি সেলের সাধারণ সম্পাদক সহকারী অধ্যাপক তপন পালিত, নির্মূল কমিটির বহুভাষিক সাময়িকী ‘জাগরণ’-এর যুগ্ম সম্পাদক অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট লেখক মারুফ রসুল, কলামিস্ট অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট লীনা পারভীন, জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ আন্দোলন বাংলাদেশ-এর মহাসচিব মাওলানা হাসান রফিক, নির্মূল কমিটির বগুড়া জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক সমাজকর্মী রাশেদুল ইসলাম, টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি ফোরাম ফর সেক্যুলার হিউম্যানিজম তুরস্ক শাখার সাধারণ সম্পাদক, লেখক ও চলচ্চিত্রনির্মাতা শাকিল রেজা ইফতি, জাতিসংঘের শিশু অধিকার সম্পর্কিত কমিটির সদস্য সমাজকর্মী ফয়সাল হাসান তানভীর, নির্মূল কমিটির নওগাঁ জেলার সাধারণ সম্পাদক সমাজকর্মী ইস্রাফিল খান বাপ্পি, নির্মূল কমিটির যুক্তরাজ্য শাখার সাধারণ সম্পাদক মানবাধিকার নেতা রুবি হক এবং নির্মূল কমিটির বহুভাষিক সাময়িকী ‘জাগরণ’-এর হিন্দি বিভাগীয় সম্পাদক ভারতের সমাজকর্মী তাপস দাস।

প্রধান অতিথি ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর নীতি ও আদর্শ অনুসরণ করে আমরা বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছি। বিভিন্ন স্তরে আমাদেরকে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে। প্রয়োজনের তাগিদেই নির্মূল কমিটি, গণজাগরণ মঞ্চের উদ্ভব হয়েছে। কিন্তু পূর্বে আমাদের প্রগতিশীল বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক আন্দোলনের কারণ মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তি মাথাচাড়া দিতে পারে নি। বর্তমানে শুধু মাঠপর্যায়ে নয় বরং বিভিন্ন সামাজিক উন্মুক্ত যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে এই অপশক্তি দিন দিন রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে। পূর্বে এসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর আমাদের কোনও রকম নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব ছিল না। বর্তমানে বাংলাদেশের ভেতর থেকেই মৌলবাদীদের সমর্থক একটি শক্তি প্রতিনিয়ত ফেসবুকে তথ্য প্রদান করে আমাদের অনলাইন এ্যাক্টিভিস্টদের জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাধার সৃষ্টি করছে। শুধু দেশেই নয় বরং দেশের বাইরে থেকে এসব স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে এই জঙ্গীবাদ মোকাবেলায় আমার কাছে সবচেয়ে বেশি যে দুর্বলতা চোখে পড়ছে তা হল আমাদের সমন্বিত অনলাইনভিত্তিক রাজনৈতিক আদর্শভিত্তিক প্ল্যাটফরম নেই। আমি বিভিন্নভাবে এই প্ল্যাটফরম তৈরির জন্য বিভিন্ন জনের সাথে কথা বলেছি, চেষ্টা করেছি। কিন্তু আশানুরূপ ফল পাইনি।’

আফগানিস্তান প্রসঙ্গে মাননীয় মন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘বাংলাদেশ তালেবানের টার্গেটের বাইরে বলে আমি মনে করি না। এর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অনলাইন ও মাঠপর্যায়ের সমন্বয়ে আন্দোলন গড়ে তোলা না হলে পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হবে। জাতীয়ভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা না করলে বাংলাদেশ হুমকির মুখে পড়বে। পাকিস্তান তো জঙ্গী উৎপাদন করেই যাচ্ছে আর চীনও বর্তমানে তালেবানদের তোষণ করে যাচ্ছে। আমেরিকা অত্যন্ত পরিকল্পনা করেই আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করেছে। ফলে বর্তমান তালেবান পূর্বের তালেবানের চেয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছে। তারা স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন রাষ্ট্রে জঙ্গীবাদের প্রসার ঘটাবে। এই অপশক্তি প্রতিরোধে জাতীয়ভাবে সকল ফ্রন্টের মাধ্যমে যুদ্ধের বিকল্প নেই। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বাংলাদেশ কখনও জঙ্গীবাদ, তালেবান, জামায়াত-শিবিরের কাছে আত্মসমর্পণ করে নি, ভবিষ্যতেও করবে না। নির্মূল কমিটিই বর্তমানে এ বিষয় নিয়ে কাজ করছে। নির্মূল কমিটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার যে মশাল জ্বেলেছে একদিন তা দাবানলে পরিণত হবে। আমি যখন মন্ত্রী ছিলাম না তখনও এর সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, আগামীতেও থাকব।’

সুনামগঞ্জের শাল্লার সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের শিকার ঝুমন দাসের জামিন প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘ঝুমন দাসের স্ত্রী আমাকে জানিয়েছেন, তাঁর জামিনের জন্য সে পাঁচবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। যা আমার কাছে খুব নির্মম মনে হয়েছে। আপনাদের আহ্বান জানাচ্ছি, ঝুমন দাসের মুক্তির জন্য আপনারা সহযোগিতা করুন এবং আমিও বিভিন্নভাবে তার মুক্তির জন্য চেষ্টা করছি।’

নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় নেতা ও সংগঠনের বহুভাষিক সাময়িকী ‘জাগরণ’-এর যুগ্ম সম্পাদক লেখক সাংবাদিক সাব্বির খান, ‘আফগানিস্তানে তালেবান ফিরে আসায় বাক স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার, বিশেষ করে নারীর অধিকার বিপন্ন হওয়ার মতো উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এমনকি আবারও বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদেরও ‘স্বর্গ’ হয়ে উঠতে পারে আফগানিস্তান। বাংলাদেশের সামনে একটা বড় চ্যালেঞ্জ হলো, আফগানিস্তানে তালেবান উত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ ঠেকানো। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে কেউ যাতে সাম্প্রদায়িক হামলার সুযোগ তৈরি করতে না পারে সেজন্য সকলকে সতর্ক থাকতে হবে।’

নির্মূল কমিটির আইটি সেলের সভাপতি শহীদসন্তান আসিফ মুনীর তন্ময় বলেন, ‘আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী ও চলমান পরিস্থিত নির্মূল কমিটির দেশে ও বিদেশের সকল শাখাসহ সচেতন তরুণ সম্প্রদায়কে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করতে হবে। তালেবানদের অবৈধ রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের সময় একদিকে যেমন ইয়েমেন,  সোমালিয়া, সিরিয়াতে জঙ্গীরা উল্লাস করেছে, অন্যদিকে খোদ আফগানিস্তানেই তালেবানদের তোয়াক্কা না করেই সেখানকার আল কায়েদা কাবুল বিমান বন্দরের কাছে মর্মান্তিক বোমা হামলা চালিয়েছে। অনলাইনে দেশে ও প্রবাসে আমাদের তরুণরা চলমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি ওয়াহাবী, সালাফি, দেওবন্দি ও মওদুদি মতবাদের  বিরুদ্ধে সমগ্র এশিয়াতে ধর্মনিরপেক্ষ মানবতার পাশাপাশি সুফিবাদী ইসলামের ঐতিহ্যকে প্রচার ও প্রসারে লেখালেখি, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক চর্চার প্রকাশ ঘটাতে পারে। প্রবাসী উদারমনা আফগানীদের সাথেও আমাদের নেটওয়ার্কিং করা দরকার।’

ব্লগার এন্ড অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কের সভাপতি ও গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট ড. কানিজ আকলিমা সুলতানা বলেন, ‘প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের হাতে এখন অসাধারণ এক ক্ষমতা। তালেবানদের জীবনযাপন ও রাজনৈতিক চিন্তার জগত হাজার বছরের পিছনের হলেও তারা আধুনিক সুযোগকে লুফে নিয়েছে। আফগানিস্তানে সৃষ্ট হওয়া সংকট ও তালেবানের উত্থানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তাদের নতুন হাতিয়ার হয়ে উঠছে। চতুর তালেবানরা সাধারণ অনগ্রসর আফগানদের কাছে এই মাধ্যম ব্যবহার করে নিজেদের বার্তা পৌঁছাতে পেরেছে বলেই সহজেই তারা একের পর এক প্রদেশ দখলে নিতে পেরেছে। তাদের ত্রাসের রাজত্ব টিকিয়ে রাখতে তারা গত আফগান সরকারের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ব্যবহার করছে। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে এখানকার তালেবানপন্থীরা রাজপথে সংগঠিত হতে পারছেনা কিন্তু তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে বিভ্রান্তি ছড়ানোয় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তাদের পিছনে কলকাঠি নাড়ছে বাংলাদেশের ক্রমাগত এগিয়ে চলা রুখতে দেশীয় ও বহিঃশত্রুরা।’

নির্মূল কমিটির বহুভাষিক সাময়িকী ‘জাগরণ’-এর যুগ্ম সম্পাদক অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট লেখক মারুফ রসুল বলেন, ‘আফগানিস্তানে তালেবানদের পুনরুত্থানের মধ্য দিয়ে বিশ্ব আজ যে সংকটের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে, তা অনেক দিক থেকেই অতীতের চেয়ে আলাদা। নব্বইয়ের দশকে তালেবানের উত্থান আর আজকে তাদের আফগানিস্তান দখল- এ দুটো ঘটনাকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমান শতকের শুরু থেকেই জঙ্গীবাদ উত্থান ও বিস্তারে ইন্টারনেট ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কেবল সীমান্ত রক্ষার কৌশল দিয়ে তাই জঙ্গীবাদ বা তালেবানি মতাদর্শ দমন করা আজকের দিনে প্রায় অসম্ভব। সুতরাং, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট থেকে যদি বলি, তবে অতি অবশ্যই আমাদের সাইবার নিরাপত্তা এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে জঙ্গী মতাদর্শ বিস্তারের প্রক্রিয়া রোধ করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে তালেবানি অপ-আদর্শ, তার স্বরূপ এবং বর্তমান আফগানিস্তানের জনগণ বিশেষ করে নারীদের যে ভয়াবহতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে, সেই সংবাদ ও সংবাদ-বিশ্লেষণগুলো নিয়ে আলোচনা করতে হবে। আমরা যেন ভুলে না যাই, বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট হচ্ছে ন্যারেটিভ আর কাউন্টার-ন্যারেটিভের মাধ্যম।’

গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট অমি রহমান পিয়াল বলেন, ‘অনলাইনে ইসলামী জঙ্গীবাদী মনোভাবের চাষবাস নতুন কিছু নয়। সাম্প্রতিক আফগানিস্তানে তালেবানদের উত্থান তার হালনাগাদ রূপ মাত্র। এবং বাংলাদেশের অনলাইনে এর প্রভাব আগের চেয়ে বেশি শঙ্কার বৈকি। বিশেষ করে হেফাজতে ইসলামীর যুদ্ধংদেহি অবস্থানকে সরকার সফলভাবে দমনের পর সেই ভাবধারার মানুষদের নতুন করে উজ্জীবিত করেছে তালেবানরা। এক্ষেত্রে তরুণরা অনলাইনে সক্রিয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের হাত পা বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। ফেসবুকে তালেবানদের বিপক্ষে কিছু লিখলেই ব্যান খেতে হচ্ছে। গত দুই সপ্তাহে শত শত এ্যাক্টিভিস্ট ফেসবুকে নিষেধাজ্ঞার শিকার। তাই আগে দরকার লেভেল প্লেইং ফিল্ড। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানাতে হবে এই ঘটনা। বাংলাদেশে ফেসবুকে যারা কর্মরত তারা সরাসরি পক্ষপাত করছে তালেবানদের পক্ষে, ধর্মীয় জঙ্গীবাদের পক্ষে। যারাই এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক অবস্থান নেওয়া হচ্ছে।’

কলামিস্ট অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট লীনা পারভীন বলেন, ‘আমাদের দেশে মৌলবাদী চিন্তার লোকেরা ভার্চুয়াল জগতে অত্যন্ত সক্রিয়। প্রকৃত ইসলাম ধর্মের ধারে কাছে না থাকলেও তারা মুক্তচিন্তার মানুষের জন্য হুমকিস্বরূপ। আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতায় মৌলবাদকে ঠেকাতে হলে আমাদেরকে ভার্চুয়াল জগতকে যেমন আয়ত্ত্বে আনতে হবে ঠিক তেমনি একটি আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থার কোন বিকল্প নেই। নারী শিক্ষা ও নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানোর লড়াইটাও জরুরি। এই জায়গাগুলো নিয়ে অত্যন্ত সচেতনভাবেই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কাজটি করতে হবে। তরুণ সমাজের মধ্যে জঙ্গীবাদবিরোধী প্রচারণা চালাতে হবে।’

জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ আন্দোলন বাংলাদেশ-এর মহাসচিব মাওলানা হাসান রফিক, ‘তালেবানের উত্থানে জঙ্গি সংগঠনের পাশাপাশি জামায়াত-শিবির ও হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরাও অনলাইন অফলাইনে সমানভাবে সক্রিয়। বিশেষ করে অনলাইনের বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমে জঙ্গীদের ন্যায় ইসলামী দলগুলোও তালেবানের পক্ষে লিখে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। ফেসবুক, টুইটারের পাশাপাশি বিভিন্ন গোপন অ্যাপস ব্যবহার করে সংগঠনের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করছে জঙ্গিরা। বাংলাদেশী জঙ্গীরা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছে টেলিগ্রাম নামের অ্যাপসটি। বাংলাদেশের কয়েকটি ইসলামী দল তালেবানের বিজয়কে অভিনন্দন জানানোর কারণে দেশীয় জঙ্গীরা অনুপ্রাণিত হচ্ছে। জামায়াত-শিবির পরিচালিত বাঁশেরকেল্লা সহ বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপ তালেবানের উত্থান ও বিজয়ের প্রতিটি মুহুর্তের খবরাখবর আপডেট দিচ্ছে। হেফাজতে ইসলাম ও কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক পরিচালিত বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপ তালেবানকে সমর্থন করে পোস্ট দিচ্ছে এবং জঙ্গিরা টেলিগ্রাম নামের অ্যাপসের মাধ্যমে গোপনে আফগানিস্তান যাওয়ার দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছে সর্বক্ষণ।’

নির্মূল কমিটির বগুড়া জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক সমাজকর্মী রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থানের পর বাংলাদেশের অনেক মসজিদে জুম্মার নামাজের খুদবায় ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে যে, সেই জোয়ার বাংলাদেশেও একদিন পৌঁছে যাবে এবং জামাত শিবিরের অনলাইন প্রচারে তা মৌলবাদের যুদ্ধ জয় হিসেবে প্রচারিত হচ্ছে। উদ্দেশ্য, সাধারণ মানুষের ধর্মীয় দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তাদের মনস্তাত্ত্বিক জগতে প্রভাব বিস্তার করে নিজেদের সমর্থন বাড়ানো। এমতাবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সকল শক্তিকে সকল অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সক্রিয় থাকতে হবে।’

জাতিসংঘের শিশু অধিকার সম্পর্কিত কমিটির সদস্য সমাজকর্মী ফয়সাল হাসান তানভীর বলেন, ‘ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ক্ষতিকর এবং জঙ্গী প্রভাব থেকে মুক্ত থাকার জন্য আমার মনে হয় নারীদের হেয় প্রতিপন্ন করে, ‘সায়েন্স প্রোজেক্ট’-এর নাম করে জঙ্গী বা তালেবানদের সমর্থক হিসেবে কাজ করেÑ এমন গ্রুপগুলো চিহ্নিত করে অ্যাকাউন্টগুলো বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। অনলাইন এ্যাক্টিভিস্টদের এজন্য  সরব হতে হবে। বিনোদনের নামে কেউ যেন অনৈতিক বা জঙ্গীবাদের মতো ঘৃণ্য কাজে জড়িয়ে না পড়ে সে ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। এক্ষেত্রে অভিভাবকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।’

নির্মূল কমিটির নওগাঁ জেলার সাধারণ সম্পাদক সমাজকর্মী ইস্রাফিল খান বাপ্পি বলেন, ‘টুইটারে কমপক্ষে ছয়জন তালেবান কর্মকর্তা সক্রিয়। তাদের অনুসারী ১০ লক্ষাধিক। তালেবান এ নেতাদের সাম্প্রতিক সব টুইটে তালেবানকে শান্তিপূর্ণ স্থিতিশীল ও পশ্চিমা নেতাদের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বড় অংশ অনিয়ন্ত্রিত বলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জঙ্গীবাদীদের আকৃষ্ট করা ও নিজেদের উগ্রবাদী আদর্শ আরও ছড়িয়ে দেয়া সহজ হবে তালেবানদের জন্য। এসব প্রতিরোধের জন্য আমাদের তরুণ সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিস্তার রোধ করতে হবে।’

নির্মূল কমিটির যুক্তরাজ্য শাখার সাধারণ সম্পাদক মানবাধিকার নেতা রুবি হক বলেন, ‘২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আল-কায়েদা আমেরিকার টুইন টাওয়ারে হামলার মাধ্যমে নিজেদের বিধ্বংসী চেহারার আত্মপ্রকাশ করে। তালেবানরা ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল। এ সময় তারা সাধারণ মানুষের অধিকার হরণ করে ইসলামী শরিয়া শাসন চালু করে যেখানে সাধারণ মানুষসহ নারীদের কোন স্বাধীনতাই ছিল না। এমনকি তাদের বর্বরতার হাত থেকে শিশুরাও রেহাই পায়নি। তালেবানরা পুনরায় ক্ষমতা দখল করার পর বাংলাদেশ থেকে ইতোমধ্যে কিছু তরুণ আফগানিস্তানে চলে গিয়েছে। এ ব্যাপারে আমরা শঙ্কিত এবং উদ্বিগ্ন। যেকোন মূল্যেই তালেবানের উত্থান আমাদের সম্মিলিতভাবে প্রতিহত করতে হবে।’

টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি ফোরাম ফর সেক্যুলার হিউম্যানিজম তুরস্ক শাখার সাধারণ সম্পাদক, লেখক ও চলচ্চিত্রনির্মাতা শাকিল রেজা ইফতি বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেভাবে জঙ্গী মৌলবাদ প্রচার করা হচ্ছে, তাতে করে ক্যান্সারের মতো কুশক্তি বিস্তার পেয়েই চলেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওয়াজের নামে ঘৃণা ছড়ানো, নারী-বিদ্বেষী মন্তব্য ও সংখ্যালঘুদের উৎখাত ইত্যাদি প্রকাশ পায় এমন কমেন্ট-পোস্টের ছড়াছড়ি। এমনকি নামজাদা পত্র-পত্রিকা, সাম্প্রতিক তালেবান ঘটনায় যখন প্রগতিশীল ও সমমনা তরুণরা বিশ্ব সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে অসহায় আফগানদের পাশে দাঁড়াতে সচেষ্ট হচ্ছে, তখনও জাঙ্গিরা তাদের অপপ্রচারের পথকে আরও প্রশস্ত করতে তৎপর। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এক্ষেত্রে অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট তরুণ লেখকদের একত্রে ভূমিকা পালন করতে হবে।’

নির্মূল কমিটির বহুভাষিক সাময়িকী ‘জাগরণ’-এর হিন্দি বিভাগীয় সম্পাদক ভারতের সমাজকর্মী তাপস দাস বলেন, ‘তালেবান একটি জঙ্গীগোষ্ঠী- এটি নিয়ে আমাদের দ্বিমত থাকা উচিত নয়। আফগানিস্তানের প্রগতিসম্পন্ন যুবকদের সাথে সংযোগ স্থাপন করে তালেবানবিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’

বাংলা প্রবাহ/এম এম

, , , ,
শর্টলিংকঃ