আফগানিস্তানে অবৈধ সন্ত্রাসী তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি প্রদান মানবতাবিরোধী অপরাধের সমতুল্য

গতকাল ২৫ সেপ্টেম্বর (২০২১) বিকাল ৩টায় একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি সিলেট জেলা শাখার উদ্যোগে ‘আফগানিস্তানে ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত’ শীর্ষক ওয়েবিনানে নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় সভাপতি লেখক সাংবাদিক চলচ্চিত্রনির্মাতা শাহরিয়ার কবির একথা বলেন।

নির্মূল কমিটির সিলেট জেলা শাখার সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা সুব্রত চক্রবর্ত্তীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বক্তব্য প্রদান করেন নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরী সভাপতি, সাবেক সংসদ সদস্য জননেতা শফিকুর রহমান চৌধুরী, নির্মূল কমিটির চিকিৎসা সহায়ক কমিটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব, নির্মূল কমিটির যুক্তরাজ্য শাখার সভাপতি সৈয়দ এনামুল ইসলাম, সিলেট প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি সাংবাদিক তাপস দাস, অধ্যাপক পরিমল কান্তি দে, সিলেট জেলার অতিরিক্ত পিপি এডভোকেট কিশোর কর ও সিলেট জেলা যুবলীগের সভাপতি শামীম আহমেদসহ সংগঠনের সিলেট জেলার নেতৃবৃন্দ।

নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় সভাপতি লেখক ও সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘ইসলামের নামে সন্ত্রাস কত ব্যাপক ও ভয়াবহ হতে পারে আমরা পঁচিশ বছর আগে আফগানিস্তানে মোল্লা উমরের তালেবানি শাসনকালে দেখেছি। সেই সময় বাংলাদেশের জঙ্গি মৌলবাদী সন্ত্রাসীরা তথাকথিত আফগান জিহাদে অংশগ্রহণের জন্য দলে দলে সে দেশে গিয়েছিল এবং দেশে ফিরে তারা শ্লোগান দিয়েছিল ‘আমরা সবাই তালেবান, বাংলা হবে আফগান।’ পঁচিশ বছর পর আফগানিস্তানে সন্ত্রাসীরা তালেবানদের অবৈধ ক্ষমতা দখলে বাংলাদেশে স্বাধীনতাবিরোধী, জঙ্গি মৌলবাদী সন্ত্রাসীরা আবারও উল্লসিত হয়েছে, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মারাত্মক ভাইরাসের মতো বিস্তার লাভ করছে। পাকিস্তান ও আমেরিকার প্রত্যক্ষ মদদ ও সার্বিক সহযোগিতা ছাড়া আফগানিস্তানে তালেবান কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে আল কায়দা, আইএসআইএস কখনও এত শক্তিশালী হতে পারত না। পশ্চিমারা বলছে অতীতের তালেবানরা খারাপ ছিল, এখনকার তালেবানরা ভাল। সন্ত্রাসীদের যেমন কোনও ধর্ম নেই তাদের ভেতর ‘ভাল’ খুঁজতে যাওয়ার চেষ্টা নিকৃষ্ট প্রতারণার নামান্তর। তালেবানদের দর্শন হচ্ছে মওদুদি, হাসান বান্না, বিন ওহাবের রাজনৈতিক ইসলাম, যার নমুনা আমরা ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় সহযোগী জামায়াতে ইসলামীদের নৃশংস গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে প্রত্যক্ষ করেছি।

‘ইসলামের নামে তালেবান, আলকায়দা, আইএস এবং তাদের এদেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে জনমত গড়ে তুলতে হবে। তালেবানরা আফগানিস্তানে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করছে। আফগানিস্তানে অবৈধ সন্ত্রাসী তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি প্রদান মানবতাবিরোধী অপরাধের সমতুল্য। নির্মূল কমিটি আফগানিস্তান ও অন্যান্য দেশের সমমনা ব্যক্তি ও সংগঠনসমূহকে সঙ্গে নিয়ে তালেবানদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত সংগঠনে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে।’

সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরী সভাপতি, সাবেক সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের সূতিকাগার, মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি ও দেশীয় তালেবানিদের কারবালাখ্যাত এই সিলেটে তালেবান গোষ্ঠী যখন প্রকাশ্যে ‘আমরা সবাই তালেবান, বাংলা হবে আফগান’ শ্লোগান দেয়, শহীদজননীর নামে হলের নামকরণ বন্ধ করতে সারা শহরকে জিম্মি করে রাখে মাসের পর মাস, তালেবানি আমির আব্দুর রহমান সিলেটকে বেছে নেয় সেইফ হেভেন হিসাবে, গ্রেনেড হামলা করে বৃটিশ হাইকমিশনারের উপর, বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অনন্ত বিজয়কে হত্যা করে, শিববাড়িতে সশস্ত্র আস্তানা গড়ে তোলেÑ তখন আমরা উদ্বিগ্ন হই।’

নির্মূল কমিটির চিকিৎসা সহায়ক কমিটির সাধারণ সম্পাদক ডা. মামুন আল মাহতাব বলেন, ‘আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থানে বাংলাদেশে আপাতত ব্যাকফুটে থাকা সাম্প্রদায়িক শক্তি যেমন উৎসাহিত হচ্ছে, তেমনি মৌলবাদের ঘাড়ে সাওয়ার হয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার দিবাস্বপ্নে যারা বিভোর, উৎসাহিত হচ্ছেন তারাও। বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের অন্য জায়গাটি হলো আফগানিস্তানের সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে আঞ্চলিক জঙ্গিশক্তিগুলোও বাংলাদেশে আবার নতুন করে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে এবং এ নিয়ে জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। এই জটিল সমীকরণ মেলাতে হলে সরকারের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের সক্রিয়তা এবং সরকারের সাথে তাদের সহযোগিতার কোনও বিকল্প নেই।’

নির্মূল কমিটির যুক্তরাজ্য শাখার সহসভাপতি সৈয়দ এনামুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশে তালেবানী শক্তি ক্ষমতায় আসলে দেশের কি পরিণতি হবে তা আফগান তালেবানদের দেখে অনুমান করার প্রয়োজন নেই। একাত্তরের আলবদর রাজাকার বাহিনী, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে বাংলাভাই, ২১শে আগস্ট ও হলি আর্টিজানসহ দেশের নানা স্থানে নানা নামের সন্ত্রাসী জিহাদি গোষ্ঠীর নৃশংস হত্যাকান্ডের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করলেই বোঝা যায় তালেবান বা তালেবান সিম্পেথাইজাররা আবারো ক্ষমতায় আসলে কি ভয়াবহ দুর্যোগ নেমে আসতে পারে রক্তের দামে কেনা আমাদের প্রিয় বাংলাদেশে।’

নির্মূল কমিটি সিলেট জেলা শাখার সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা সুব্রত চক্রবর্ত্তী বলেন, ‘আমি গভীর বিষ্ময় ও ক্রোধের সাথে লক্ষ্য করি নব্বইয়ের দশকে এসে হাজার বছরের প্রগতিশীলতার ঐতিহ্যকে ধুলায় ভূলুণ্ঠিত করে আমার জন্মভূমি সিলেট তালেবানি শক্তির লীলাভূমিতে পরিণত হয়। আফগান তালেবানদের ক্ষমতা পুনর্দখলের পর সিলেট এবং বাংলাদেশের সর্বত্র তালেবান ও তালেবান সিম্পেথাইজারদের আনন্দ উচ্ছাস দেখে এবং রাষ্ট্র ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তির নিস্ক্রিয়তা এবং ক্ষেত্র বিশেষে তালেবানদের বেনিফিট অব দি ডাউট দেয়া দেখে শঙ্কা জাগে আমাদের প্রিয় দেশে সমাজের মৌলবাদীকরণ অনেকটাই সম্পন্ন হয়ে গেছে, তালেবানদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল হয়ত সময়ের ব্যাপার মাত্র।’

সিলেট প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি সাংবাদিক তাপস দাস বলেন, ‘পশ্চিমাদের সৃষ্ট সন্ত্রাসবাদের বিস্তার বা জঙ্গী উত্থানের পেছনে একটা সাধারণ কৌশল হলো মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতি। শুরুতে এরা এসব সন্ত্রাসীদের অস্ত্র, গোলাবারুদ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করে। তারপর এদের সঙ্গে চলে অস্ত্র ও তেল ব্যবসা। আর এসব জঙ্গী বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো যখন নিজেদের একটু শক্তিশালী মনে করতে শুরু করে, তখনই এরা ধর্মকে ব্যবহার করে যাদের হাতে তাদের উত্থান, তাদেরকেই নিশানা করে। তারপর এরা মার্কিন ও পশ্চিমা লোক ও স্থাপনার উপর হামলার চেষ্টা করে।’

বাংলা প্রবাহ/এম এম

, , ,
শর্টলিংকঃ