মানবতার শত্রুদের পরাস্ত করতে ধর্মনিরপেক্ষ মানবিক সংস্কৃতি ও চেতনার প্রসার ঘটাতে হবে

আজ ৩০ সেপ্টেম্বর (২০২১) দুপুর ২টায় সুফি কবি জালালউদ্দিন রুমির ৮১৪তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে লেখক সাংবাদিক চলচ্চিত্রনির্মাতা শাহরিয়ার কবির একথা বলেন।

ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা ও আমেরিকার ১০টি দেশের বরেণ্য শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীরা বলেছেন ‘সুফিসাধক হযরত জালালউদ্দিন রুমির ভালোবাসা, মানবতা ও শান্তির বার্তা আল কায়েদা ও তালেবানদের ইসলামের নামে সন্ত্রাসের বিপরীত সাংস্কৃতিক ও ধর্মতাত্ত্বিক বয়ান হতে পারে।’

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে বক্তব্য প্রদান করেন তুরস্কের আর্থ সিভিলাইজেশন প্রজেক্ট-এর প্রতিষ্ঠাতা, বরেণ্য কবি, নাট্যকার, অভিনেতা তারিক গুনেরসেল, পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘তেহরিক-ই-নিসওয়ান’-এর সভাপতি, কিংবদন্তী ধ্রুপদী নৃত্যশিল্পী, পরিচালক, প্রযোজক, নারী অধিকার নেত্রী সীমা কেরমানি, যুক্তরাজ্যের ইরানি সুফি গবেষক, মানবাধিকার নেতা আব্বাস ফয়েজ, যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত ইরানের নারী অধিকার নেত্রী ও চলচ্চিত্রনির্মাতা বানাফশে যানদ, ফোরাম ফর সেকুলার ইজিপ্ট এ্যান্ড মিডল ইস্ট-এর সভাপতি লেখক সাংবাদিক মহসিন আরিশি, ভারতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তির জন্য কর্মরত সেচ্ছাসেবী সংগঠনের জাতীয় নেটওয়ার্ক ‘কোভা’র নির্বাহী পরিচালক শান্তিকর্মী ড. মাজহার হুসাইন, ২০১৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীতি সিঙ্গাপুর প্রবাসী আফগান মানবাধিকার নেত্রী ও সঙ্গীতশিল্পী ঝালা সরমস্ত, টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি ফোরাম ফর হিউম্যানিজম, তুরস্ক-এর সাধারণ সম্পাদক লেখক ও চলচ্চিত্রনির্মাতা শাকিল রেজা ইফতি, নির্মূল কমিটির সাংস্কৃতিক স্কোয়াডের সাধারণ সম্পাদক, সঙ্গীতশিল্পী মানবাধিকার নেত্রী জান্নাত-ই-ফেরদৌসী, পোল্যান্ডে নির্বাসিত আফগান মানবাধিকার নেতা সবুর শাহ দাউদজাই, উজবেকিস্তানের উইঘুর মানবাধিকার কর্মী সাংবাদিক সাবো কোসিমোভা, যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত আফগান চিত্রশিল্পী সারা রাহমানী, নির্মূল কমিটির বহুভাষিক সাময়িকী জাগরণের তুর্কি বিভাগীয় সম্পাদক সাংবাদিক মুরাত কাসাপ, তুর্কি কবি মেরিছ ওজ এবং ইস্তাম্বুলের সুফি একাডেমির সভাপতি, শিক্ষাবিদ, লেখক, সঙ্গীতশিল্পী হাকান মেনগুছ।

সভার প্রারম্ভে হযরত জালালউদ্দিন রুমি এবং দক্ষিণ এশিয়ায় তার প্রভাবের উপর শাহরিয়ার কবিরের প্রামাণ্যচিত্র ‘মিথাতের স্বপ্ন’ এবং ‘হাকানের শান্তিযাত্রা’র অংশবিশেষ প্রদর্শিত হয়।

সভাপতির ভাষণে বাংলাদেশের লেখক ও চলচ্চিত্রনির্মাতা শাহরিয়ার কবির সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী বিশ্বের বিশিষ্টজনদের স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘তুরস্কের কোনিয়ার হযরত জালালউদিন রুমি এবং অন্যান্য সুফি সাধকরা সমগ্র বিশ্বে শান্তি, সাম্য ও মানবতার ইসলাম প্রচার করেছেন। যে কারণে এই ধর্মের প্রতি বিপুল সংখ্যক মানুষ আকৃষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে ওহাবি, সালাফি, মওদুদিবাদী তালেবান ও আল কায়দা যেভাবে ইসলামের নামে সন্ত্রাস, গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকে বৈধতা দিচ্ছে তাতে পশ্চিমে অনেকের কাছে ইসলাম সন্ত্রাসের সমার্থক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং নিরীহ মুসলমানরা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের শিকার হচ্ছে। আফগানিস্তানে তালেবানরা পঁচিশ বছর আগে প্রথম বার ক্ষমতা দখল করে সঙ্গীত, নৃত্য, চারুকলা ও চলচ্চিত্র সহ সুকুমার শিল্পের যাবতীয় চর্চা নিষিদ্ধ করে একটি আলোকিত সমাজ ও রাষ্ট্রকে মধ্যযুগীয় তামসিকতার গহ্বরে নিক্ষেপ করেছিল। দ্বিতীয়বার ক্ষমতা দখল করেও তারা তাই করছে। শুধু শক্তি প্রয়োগ করে ধর্মের নামে ভিন্নমত, ভিন্নধর্ম এবং ভিন্ন জীবনধারায় বিশ্বাসীদের হত্যা ও সন্ত্রাস মোকাবেলা করা যাবে না। অন্ধকারের অপশক্তি মানবতার এই শত্রুদের পরাস্ত করতে হলে ধর্মনিরপেক্ষ মানবিক সংস্কৃতি ও চেতনার প্রসার ঘটাতে হবে, যা রুমি, হাফিজ, শেখ সাদী থেকে আরম্ভ করে দক্ষিণ এশিয়ার বুল্লে শাহ ও লালনের মতো সাধকরা তাঁদের সৃজনশীল রচনার মাধ্যমে প্রচার করেছেন। রুমি একজন ধর্ম প্রচারক ছিলেন কিন্তু কোনও সংকীর্ণতা ছিল না তার ইসলাম প্রচারে। রুমি লিখেছেন ‘সব ধর্মেই ভালবাসার কথা আছে, কিন্তু ভালবাসার কোনও ধর্ম নেই। আমার ধর্ম হচ্ছে ভালবাসা। প্রতিটি মানুষের হৃদয় হচ্ছে আমার উপাসনাস্থল। একই কথা বাংলাদেশের লালনও বলেছেন। যে কারণে উপমহাদেশের তালেবানপন্থীরা বার বার সুফিদের মাজারে হামলা করেছে এবং নিরীহ মানুষদের হত্যা করেছে। ধর্মের নামে সন্ত্রাস মোকাবেলা করতে হলে প্রগতিশীল সংস্কৃতি চর্চার কোনও বিকল্প নেই।’

পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘তেহরিক-ই-নিসওয়ান’-এর সভাপতি, কিংবদন্তী ধ্রুপদী নৃত্যশিল্পী, পরিচালক, প্রযোজক, নারী অধিকার নেত্রী সীমা কেরমানি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি সুফিবাদের মূল বিষয় হলো বিভাজন ও দূরত্বকে ঘুচিয়ে মানুষকে ভালোবাসার মাধ্যমে মানবতাবাদকে আঁকড়ে থাকা যা আজকের পৃথিবীতে খুবই প্রাসঙ্গিক। মওলানা রুমি ভালোবাসার বার্তা প্রচারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন ‘মাওলাভিয়া’ ধারার সঙ্গীতের যা আমাদের মাঝে শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে আসে। মহান আধ্যাত্মিক খাজা মইনুদ্দিন চিশতী উপমহাদেশে ‘চিশতীয়া’ ধারার সঙ্গীতের সূচনা করেন এবং তাঁর ভক্ত আমির খসরু তাঁর মাজারে এই ধারার গান ও নৃত্য পরিবেশন করেন। তাই পাঞ্জাব ও সিন্ধির অনেক সুফি ধর্মের মাধ্যমে বিভাজনের ধারণা ভঙ্গ করে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানবিক দিক ও অন্তর্নিহিত ভালোবাসার অনুসন্ধানের মাধ্যমে সম্প্রীতি ও শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। সেই সাথে আমি সে সব সুফি নারীদের স্মরণ করতে চাই, যাদের সম্পর্কে খুব কমই আলোচনা করা হয় রাবিয়া আল বাসরি, ফখর আন নিসা এবং মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের কন্যা জেবুনিসা। এই মহান নারীরাও সুফিবাদের অন্যতম রক্ষক ও প্রচারক ছিলেন।’

তুরস্কের আর্থ সিভিলাইজেশন প্রজেক্ট-এর প্রতিষ্ঠাতা, বরেণ্য কবি, নাট্যকার, অভিনেতা তারিক গুনেরসেল জানান, মাওলানা জালালউদ্দিন রুমির মাসনবী থেকে ধারণা নিয়ে তিনি ‘টু বিকাম’ নামে একটি জ্ঞানগর্ভ রচনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘একদিকে রুমির ইসলাম সম্পর্কে মানবিক ধারণা যেমন সারা বিশ্বের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে, অন্যদিকে ইসলামের নামে সন্ত্রাস ও গোঁড়ামি আরও বেশি সংখ্যক মানুষকে ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। যদি সুফিবাদ বা মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি সর্বস্তরে বিস্তার লাভ করতে পারে, তাহলে ইসলাম মানুষকে আরো অনুপ্রাণিত করবে। অন্যথায় ইসলামের মাহাত্ম্য লুপ্ত হতে থাকবে।’

যুক্তরাজ্যের ইরানি সুফি গবেষক, মানবাধিকার নেতা আব্বাস ফয়েজ বলেন, ‘ইরান এবং ইরানের বাইরের মানুষ বছরের পর বছর ধরে সুফি দার্শনিক কবি রুমিকে নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং এখনো করছেন। কেউ কেউ তাঁকে স্পষ্টভাবে একজন কাব্যিক আধ্যাত্মিক ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আরেক দল বিশেষ করে ধর্মীয় উদারপন্থীরা সীমাবদ্ধ ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে ভিন্ন ভাবধারায় রুমিকে দেখার চেষ্টা করেছেন। রুমির জীবনযাত্রা এবং কবিতা রক্ষণশীল মুসলমানদের জন্য চক্ষুশূল। রুমির লেখা স্বাধীনতা সম্পর্কিত কবিতাগুলো তাদের রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধাচরণ করে। কেননা ধর্মীয় রক্ষণশীলদের বিশ্বাস তাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হলো সৃষ্টিকর্তার বাধ্য ভৃত্য হওয়া যেখানে ভালোবাসার স্থান নেই। যা রুমি তাঁর কবিতার মাধ্যমে প্রত্যাখ্যান করেছেন। রুমি বিশ্বাস করেন, ভালোবাসাকে ঈশ্বরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না।’

যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত ইরানের নারী অধিকার নেত্রী ও চলচ্চিত্রনির্মাতা বানাফশে যানদ বলেন, ‘ধর্মীয় উগ্রবাদীরা আমার পিতাকে নৃশংসভাবে খুন করেছে। আমার পিতার মতো অনেক ইরানীয় তাদের প্রগতিশীল কর্ম ও চিন্তার জন্য ধর্মীয় উগ্রবাদীদের হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন এবং আজও হচ্ছেন। কিন্তু আজ আমি ইরানের মহান মানুষ আহমদ কাসরাভীর কথা বলব। যিনি একই সঙ্গে ছিলেন আধুনিক ইরানীয় ইতিহাসবিদ, রাজনৈতিক চিন্তাবিদ, দার্শনিক ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী। সর্বোপরি তিনি ছিলেন ইরানের ‘মুক্তচিন্তা’ বা ‘ফ্রি থিংকিং’ ধারণার প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ইরানে মুক্তচিন্তার প্রসার ঘটাতে চেয়েছিলেন বলে তাকে ১৯৪৬ সালের ১১ মার্চ বিচারালয়ে নৃশংসভাবে খুন হতে হয়। তার চাওয়া ছিল ইরানে চলমান শিয়া-সুন্নি বিভেদ ঘটিয়ে মানবিক ধর্মের মাধ্যমে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। আহমদ কাসরাভীর মতো প্রগতিশীল মানুষরা আজও পৃথিবীতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। কিন্তু উগ্রবাদীদের মনে রাখা দরকার চিরকাল মানবতাবাদই বিজয়ী হয়েছে।’

ভারতের ‘কোভা’র নির্বাহী পরিচালক শান্তিকর্মী ড. মাজহার হুসাইন বলেন, ‘কুরআন অনুসারে, একজন নিরীহ মানুষকে হত্যা করা সমগ্র মানবজাতিকে হত্যার সামিল (আল কুরআন: আল মায়েদা-৩২২) এবং ইসলামে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সুনির্দিষ্ট কাঠামো রয়েছে। তাহলে আত্মঘাতী বোমা হামলা, সংক্ষিপ্ত মৃত্যুদণ্ড, বিচারবিহীন মানুষ হত্যা এবং ল্যাম্পপোস্টে মৃতদেহ ঝুলিয়ে রাখার কোন ব্যাখ্যা আছে কী? ইসলাম কি তা বলে?’

নির্মূল কমিটির সাংস্কৃতিক স্কোয়াডের সাধারণ সম্পাদক, সঙ্গীতশিল্পী মানবাধিকার নেত্রী জান্নাত-ই-ফেরদৌসী বলেন, ‘সুফি কবি জালালউদ্দিন রুমির জীবন প্রমাণ করে দেয় যে সকল ধর্মের মানুষ একত্রে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারেন। তাঁর ছন্দে, তাঁর রচনায়, তাঁর কবিতায় রয়েছে সকল ধর্মের মানুষের জয়গান। তাকে চর্চার মধ্যে দিয়ে শত্রুতা ও ঘৃণা দূর করে সত্যিকার অর্থে বিশ্বশান্তি ও বিশ্বঐক্য অর্জন সম্ভব। রুমির প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। কবি লিখেছেন ‘কারো মনে তুমি দিওনা আঘাত, সে আঘাত লাগে কাবার ঘরে, মানুষেরে তুমি যতো করো ঘৃণা, খোদা যান ততো দূরে সরে’। সুফি রুমির উক্তি ‘তুমি জান্নাত পেতে চাও, তাহলে অন্যর পথে কাঁটা বিছানো ছেড়ে দাও’। তিনি স্রষ্টার কাছে পৌঁছানোর জন্য মানবপ্রেমকে বেছে নিয়েছেন।’

টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি ফোরাম ফর হিউম্যানিজম, তুরস্ক-এর সাধারণ সম্পাদক লেখক ও চলচ্চিত্রনির্মাতা শাকিল রেজা ইফতি, ‘যখন আমরা এই ওয়েবিনারে যুক্ত হচ্ছি, তখন সারা বিশ্বের বাঙালিরা দুর্গাপূজা উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবকে বাঙালিরা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমগ্র জাতিসত্তার উৎসবে পরিণত করেছে। একজন মুসলিম বাঙালি হওয়া সত্ত্বেও, আমি সর্বদা আমার দেশের অন্যান্য ধর্মের সমস্ত উৎসবে অংশ নিয়েছি। আমরা আমাদের সংস্কৃতি, জাতীয়তা, ধর্ম, বর্ণ ইত্যাদি দ্বারা ভিন্ন হতে পারি কিন্তু দিনশেষে মানুষ হিসেবে আমরা সবাই এক। সুফি দার্শনিক কবি রুমি বলেন, ‘প্রদীপগুলো আলাদা হলেও আলো কিন্তু একই’। আর সুফিবাদের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বললেন, ‘কেবলমাত্র বৈচিত্র্যকে মেনে নেয়ার মাধ্যমেই ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়’। বর্তমান বিশ্বে আরো বেশি করে ঐক্যের এই বার্তা ছড়িয়ে দেয়া প্রয়োজন।’

সিঙ্গাপুর প্রবাসী আফগান সঙ্গীতশিল্পী ও তরুণ নারী অধিকার নেত্রী ঝালা সরমস্ত বলেছেন, ‘সঙ্গীত বা গান-বাজনার ব্যাপারে তালেবানদের অবস্থান কী হবে তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। সঙ্গীত নিয়ে আমরা কেবলই বিতর্ক করি অথচ ইসলামের সঙ্গে তা একেবারেই সাংঘর্ষিক নয়। সঙ্গীত প্রকৃতিতে আছে। সঙ্গীত আমাদের হৃদয়ে আছে। সঙ্গীত আমাদের চারপাশে রয়েছে এবং কেউ মানুষের মন, হৃদয় এবং আত্মা থেকে সঙ্গীতকে মুছে ফেলতে বাধ্য করার ক্ষমতা রাখে না। মানুষের মাঝে থেকে সঙ্গীতকে মুছে ফেলার জন্য তারা যতো কঠোর ও হিংস্র হবে, তত তাড়াতাড়ি তাদের পতন হবে।’

উজবেকিস্তানের উইঘুর মানবাধিকার কর্মী সাংবাদিক সাবো কোসিমোভা বলেন, ‘যে কোনও ধর্ম শান্তি ও সম্প্রীতির কথা বলে। ইসলাম ধর্মের ক্ষেত্রেও তাই। ইসলাম শান্তির ধর্ম হলেও আমরা ইসলামের নামে একের পর এক যুদ্ধ দেখেছি। যার ফলে পশ্চিমে ‘ইসলামোফোবিয়া’র উত্থান হয়েছে। আমার বিশ্বাস একটি শক্তিশালী আন্দোলনই পারে ধর্মের নাগপাশ ভেঙে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বন্ধ করতে। কথিত আছে যে সমস্ত ধর্মের লোকেরা ১২৭৩ সালে রুমির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় এসেছিলেন। কারণ হিসেবে তারা বলেছিলেন, ‘আমরা যে ধর্মেরই বিশ্বাসী হই না কেন, রুমি আমাদের সে বিশ্বাসকে আরো পোক্ত করেছিলেন।’ এটিই ছিল রুমির শক্তিশালী আবেদন যা তিনি সকল ধর্মের মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাই রুমির শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা কেবল আফগানিস্তান নয় বরং সারাবিশ্বের জন্য বর্তমানে খুবই প্রাসঙ্গিক। আফগানিস্তান আজ সন্ত্রাসী তালেবানের অবৈধ দখলে এবং সেখানে মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে। ঠিক একইভাবে চীনের নিপীড়িত উইঘুর সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও রুমির ভালবাসা এবং মানবতার বার্তা খুবই প্রাসঙ্গিক।’

যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত আফগান চিত্রশিল্পী সারা রাহমানী বলেন, ‘এখন পর্যন্ত তালেবানরা আফগানিস্তানে নারীদের সমস্ত অধিকার এবং স্বাধীনতা হরণ করে রেখেছে। তারা নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ও কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এমনকি তালেবানদের আরোপকৃত পোশাক বিধি না মানলে মহিলাদের বাইরে বের হওয়াও নিষেধ। আমি সেই আফগান শিল্পী সারা রহমানি যার আঁকা ছবি গত আগস্টে সিএনএন ওয়েবসাইট এবং ইনস্টাগ্রামে তালেবান কর্তৃক কাবুল দখলের পর প্রদর্শিত হয়েছিল। আমার লক্ষ্য ছিল আমার আঁকা চিত্রের মাধ্যমে আমার দেশের বিশেষ করে আফগান মহিলাদের সুন্দর ও সুদৃঢ় প্রতিকৃতি ফুটিয়ে তোলা। এমনকি তালেবানরা যখন কাবুলদখল করেছিল তখন আমার শেষ চিত্রগুলিতে আমি আফগান নারীদের সাহসী চোখ এবং তাদের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করার যে আত্মবিশ্বাস সেই ছবিও এঁকেছি। সর্বোপরি আমি বিশ্বাস করি, আফগান নারীরা অনেক বেশি শক্তিশালী এবং সাহসী এবং তারা নীরবে তালেবানের হুকুম তালিম করার পাত্রী নন।’

নির্মূল কমিটির বহুভাষিক সাময়িকী জাগরণের তুর্কি বিভাগীয় সম্পাদক সাংবাদিক মুরাত কাসাপ বলেন, ‘তুরস্কের জনগণ শান্তিপ্রিয় এবং তুরস্ক পৃথিবীতে সর্বাধিক সংখ্যক শরণার্থীকে স্থান দিয়েছে। তুরস্কের মহান নেতা মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক কর্তৃক গৃহীত আধুনিক তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতি হলো ঘরের মাঝে শান্তি তো সারাবিশ্বেও শান্তি। আমরা বিশ্বের বিভিন্ন অংশে ধর্মের নামে চরমপন্থা এবং সন্ত্রাসবাদের উত্থান দেখতে পাচ্ছি। সম্প্রতি আফগানিস্তানে তালেবানদের অবৈধ দখল মানবসভ্যতার ইতিহাসে একটি ভয়াবহ অধ্যায়। রুমির প্রেম ও মানবতার দর্শন এখন বিশ্বের জন্য সত্যিই আবশ্যক। ইসলাম শান্তির ধর্ম; সুফিবাদ তার প্রকাশ। বাংলাদেশের শাহরিয়ার কবিরের প্রামাণ্যচিত্র ‘হাকানের শান্তিযাত্রা’ দেখার পর আমি রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম একথা ভেবে যে সুফিরা দক্ষিণ এশিয়ার চারপাশে ইসলাম প্রচার করেছিলেন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তা কট্টরপন্থী হয়ে ওঠে। আমাদেরকে পুনরায় সুফিবাদের প্রচার করতে হবে। আমাদের বহুভাষিক সাময়িকী ‘জাগরণ’-এ আমরা বিভিন্ন ভাষায় সুফিবাদ এবং শান্তির ধর্মকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছি। আমি আজকের সম্মানিত অতিথিদের ‘জাগরণ’-এ আপনাদের মূল্যবান লেখা পাঠানোর আহ্বান জানাচ্ছি।’

তুর্কি কবি মেরিক ওজ বলেন, ‘আমি কোনিয়ার বাসিন্দা যেখানে রুমি তার জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছিলেন। কোনিয়ায় রুমি জাদুঘরে তাঁর সমস্ত কর্ম নিদর্শন রয়েছে। সেই কর্ম নিদর্শনগুলোর আবেদন আজও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রুমি তাবরিজের শামস নামে খ্যাত এক ভবঘুরে সুফি সাধকের সাথে দেখা করার পরে তার শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলো রচনা করেছিলেন। তারা মাত্র তিন বছরে একটি মহাকাব্যিক বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছিলেন। তাঁদের সেই বন্ধুত্ব থেকে একটি মানবতাবাদি প্রেমের জন্ম হয়েছিল যা বিগত আট দশক ধরে সারা বিশ্বকে মানবতাবাদী প্রেম-ভালোবাসার স্লোগানে মুখরিত করে রেখেছে।’

ইস্তাম্বুলের সুফি একাডেমির সভাপতি, শিক্ষাবিদ, লেখক, সঙ্গীতশিল্পী হাকান মেনজুস বলেন, ‘সুফিবাদ কি? সুফিবাদ হলো ভালো মানুষ হওয়ার দর্শন। রুমি বলেন, ‘জীবনে আপনি অনেক কিছু হতে পারেন, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আপনাকে একজন ভালো মানুষ হতে হবে।’ তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন- নিজের অবস্থান এবং পদবীর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একজন ভালো মানুষ হওয়া। একজন মানুষ হিসেবে ধর্ম, ভাষা, জাতি বা বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে সমানভাবে দেখতে হবে এবং ভালোবাসতে হবে।’

বাংলা প্রবাহ/এম এম 

, , ,
শর্টলিংকঃ