সাম্প্রদায়িক হামলাকারীদের পাশাপাশি ওয়াজী সন্ত্রাসীদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে

আজ ২৩ অক্টোবর (২০২১) বিকেল ৩টায় একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি কর্তৃক আয়োজিত চলমান সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস: সরকার ও নাগরিক সমাজের করণীয়’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক ওয়েবিনারে সভাপতির বক্তব্যে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি লেখক সাংবাদিক চলচ্চিত্রনির্মাতা  শাহরিয়ার কবির একথা বলেন।

নির্মূল কমিটির সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী এডভোকেট আনিসুল হক এমপি।

সভায় বক্তব্য প্রদান করেন মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী দক্ষিণ এশীয় গণসম্মিলনের সভাপতি বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ভাষাসংগ্রামী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পৌত্রী মানবাধিকার নেত্রী আরমা দত্ত এমপি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক রাজনীতিবিদ ফজলে হোসেন বাদশা এমপি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সাধারণ সম্পাদক রাজনীতিবিদ শিরীন আখতার এমপি, নিরাপত্তা বিশ্লেষক প্রাক্তন আইজিপি মোহাম্মদ নুরুল আনোয়ার, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ-এর সভাপতিমন্ডলীর সদস্য সমাজকর্মী নির্মল রোজারিও, নির্মূল কমিটির সর্বইউরোপীয় শাখার সভাপতি মানবাধিকার নেতা তরুণকান্তি চৌধুরী, নির্মূল কমিটির যুক্তরাজ্য শাখার সাধারণ সম্পাদক মানবাধিকার নেত্রী রুবি হক, নির্মূল কমিটির নিউইয়র্ক শাখার সাধারণ সম্পাদক মানবাধিকার কর্মী স্বীকৃতি বড়ুয়া, নির্মূল কমিটির কুমিল্লা জেলা শাখার আহ্বায়ক সাংবাদিক দিলীপ মজুমদার, নির্মূল কমিটির রংপুর জেলা শাখার সভাপতি ডা. মফিজুল ইসলাম মান্টু, নির্মূল কমিটির নোয়াখালী জেলা শাখার সদস্য সচিব সাহাবউদ্দিন পোখরাজ এবং নির্মূল কমিটির আইন সহায়ক কমিটির সদস্য ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আইনজীবী এডভোকেট নাসির মিয়া।

নির্মূল কমিটির সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘এবারের দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তি ‘হিন্দুরা কোরাণ অবমাননা করেছে’ এ ধরনের ভয়ঙ্কর গুজব ছড়িয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর যে জঘন্য হামলা চালিয়েছে তার নিন্দা জানাবার ভাষা আমাদের জানা নেই। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অজুহাতে স্বাধীনতাবিরোধী মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক এ ধরনের হামলা সংঘটিত করছে বাংলাদেশকে মোল্লা উমরের আফগানিস্তান বা জিয়াউল হকের পাকিস্তানের মতো ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র বানাবার জন্য। এবারের সাম্প্রদায়িক হামলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিছু জায়গায় দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিলেও সাধারণভাবে হামলাকারীদের প্রতিহত করেছে এবং ইতোমধ্যে কয়েকশ’ গ্রেফতারও হয়েছে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে এ কথা অনায়াসে বলা যায় এসব অপরাধীর বিরুদ্ধে কোন সাক্ষী পাওয়া যাবে না এবং তারা জামিনে বেরিয়ে এসে নতুন উদ্যমে হামলার ছক আঁকবে।’

শাহরিয়ার কবির আরও বলেন, ‘সংঘবদ্ধ সামাজিক সন্ত্রাসের ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের জন্য আমরা গত দশ বছর ধরে ‘সাক্ষী সুরক্ষা আইন’ ও ‘সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন’ প্রণয়নের কথা বলছি। একই সঙ্গে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সার্বিক নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিতকরণের জন্য ‘জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন’ গঠনের দাবি জানিয়েছি। আমাদের দাবির কারণে আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন’ এবং ‘জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন’ গঠনের ঘোষণা প্রদান করলেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। সনাতন ফৌজদারি দণ্ডবিধি অনুযায়ী সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের বিচার ও শাস্তিপ্রদান যে সম্ভব নয় তা আমরা ২০০১ সালের নৃশংসতম ঘটনাবলীর সময় থেকে লক্ষ্য করছি। হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের পাশাপাশি যে সব ওয়াজী সন্ত্রাসী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায় এবং ভিন্নমতের বিরুদ্ধে জঘন্য হিংসাত্মক বক্তব্য প্রদান করছে তাদের গ্রেফতার করে শাস্তি দেয়া না হলে বাংলাদেশে কখনও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস ও হামলা বন্ধ করা যাবে না। কারণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব ওয়াজ সন্ত্রাসীদের বক্তব্য মরণঘাতী ভাইরাসের মতো সাধারণ মানুষের মনোজগতে সংক্রমিত হচ্ছে, যা বাংলাদেশ ও জাতির সম্প্রীতির ঐতিহ্য নিশ্চিতভাবে ধ্বংস করবে। আমাদের দাবি হামলাকারীদের গ্রেফতারের পাশাপাশি যারা বক্তৃতা বক্তব্যে হিন্দুদের উপর হামলার জন্য ভয়ঙ্কর উস্কানিমূলক প্ররোচনা দিয়েছে এবং সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও সন্ত্রাসের ক্ষেত্র তৈরি করছে তাদেরও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।’

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক হামলা ও সহিংসতার তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী এডভোকেট আনিসুল হক এমপি বলেন, ‘আজকের সভায় বক্তাগণ যে দাবি জানিয়েছেন সেই ‘সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন’ খুব শীঘ্রই তৈরি করার অঙ্গীকার করছি। যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা চায়নি সেই ওয়াজিগ্রুপ কুমিল্লায় মূর্তির উপর কোরান রেখে দেশে একটি বিশৃঙ্খলা তৈরি করে এর ফায়দা লুটতে চেয়েছিল। আমরা এমনও কিছু খবর পেয়েছি যারা সাম্প্রদায়িক হামলার নেপথ্যে ছিল তাদের রক্ষার জন্য কোনও কোনও ডিসি ও এসপি কলকাঠি নেড়েছিল এবং সহিংসতা যথাসময়ে বন্ধ করার কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি।’

আইনমন্ত্রী আরো বলেন, ‘ওয়াজিরা শুধুমাত্র সরকার উৎখাতের লক্ষেই এহেন বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে। আর এদের মদদ দিচ্ছে পাকিস্তান।’

ডিজিটাল সিকিউরিটি এ্যাক্ট নিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দেশের শান্তি ও নিরাপত্তার কথা ভেবেই ‘আইসিটি আইন’টি প্রণয়ন করেছি কিন্তু সাক্ষীর অভাবে সেই আইনের যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না। এতদ পরিস্থিতিতে সাক্ষী সুরক্ষা আইন খুব শীঘ্রই তৈরি করতে যাচ্ছি। আশা করি এই আইনের ফলে সাক্ষীরা নির্ভয়ে সাক্ষ্য প্রদান করতে পারবেন। আমাদের মনে রাখতে হবে, মৌলবাদীরা শেখ হাসিনার হাতকে দুর্বল করার জন্যই দেশে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করছে। সুতরাং আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’

মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী দক্ষিণ এশীয় গণসম্মিলনের সভাপতি বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, ‘সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উপর বারবার সাম্প্রদায়িক হামলা হচ্ছে। হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে অথচ প্রচলিত আইনের সীমাবদ্ধতায় অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না এবং ভিকটিমদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এ কারণেই ‘সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন’ এবং বিচারিক ক্ষমতাসহ ‘জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন’ গঠন করা অত্যন্ত জরুরি। এই কমিশনের রূপরেখা এবং কার্যবিধি কী হবে এর একটি খসড়া অর্গানোগ্রাম আমরা তৈরি করে আইন কমিশনকে দিয়েছি। ‘সাক্ষী নিরাপত্তা আইন’ যুদ্ধাপরাধীদের চলমান বিচারের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত জরুরি। জামায়াতে ইসলামীর হুমকির কারণে ট্রাইব্যুনালের অনেক মামলার অনেক সাক্ষী সাক্ষ্য দিতে আসেন নাই। সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস ও হামলার ক্ষেত্রে মৌলবাদী সন্ত্রাসীদের হুমকীর কারণে মানুষ সাক্ষ্য প্রদানে ভয় পায়। এসব কারণে ‘সাক্ষী সুরক্ষা আইন’ও দ্রুত প্রণয়ন করা প্রয়োজন।’

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি-এর সাধারণ সম্পাদক রাজনীতিবিদ ফজলে হোসেন বাদশা এমপি বলেন, ‘সম্প্রতি সারাদেশে যে হামলাগুলো হয়েছে সে সম্পর্কে আমরা সকলেই নিশ্চয় ওয়াকিবহাল আছি। এখন আমরা কিভাবে এই হামলাগুলো প্রতিরোধ করব তা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে এবং কাজ করতে হবে। বিশেষ করে আমরা যারা প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতা রয়েছি তাদেরকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে কেননা আমরা দেখেছি সাধারণ মানুষ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাম্প্রদায়িক হামলাগুলো প্রতিহত করতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। সুতরাং আসুন আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে সাম্প্রদায়িক হামলাগুলো প্রতিহত করে বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হই।’

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-এর সাধারণ সম্পাদক রাজনীতিবিদ শিরীন আখতার এমপি বলেন, ‘বাংলাদেশে বর্তমানে যা ঘটছে তাতে আমরা কেউই ভাল নেই। বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার জন্য যারা এমন ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে তাদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে যাতে এমন সহিংসতা করার কেউ সাহস না পায়। বঙ্গবন্ধু ভারতের এক পত্রিকায় সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন আমি বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ নামক একটি বৃক্ষরোপণ করেছি। যতদিন এই চারা সজীব থাকবে ততদিন আমার বাংলাদেশে সতেজ ও সজীব থাকবে। বঙ্গবন্ধুর রোপিত সেই চারার আজ আমাদেরকে ছায়া প্রদান করার কথা ছিল কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধীদের চক্রান্তের কারণে সেই সুশীতল ছায়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। অবিলম্বে সাম্প্রদায়িক দুষ্কৃতিকারীদের গ্রেফতার করে বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে হবে এবং আমাদের সকলকে এ ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’

নিরাপত্তা বিশ্লেষক প্রাক্তন আইজিপি মোহাম্মদ নুরুল আনোয়ার বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ। যেখানে প্রতিটি মানুষ তার সমান অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করবে। তার কারণ আমরা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ চেয়েছি। পাকিস্তান যে কাঠামোর মধ্যে তৈরি হয়েছিল, সে কাঠামোর মধ্যে বাঙালি বার বার নির্যাতিত ও নিপীড়িত হয়েছে ধর্মের দোহাই দিয়ে। সে জন্যই আমরা চেয়েছি বাংলার আবহমানকালের যে ইতিহাস, সকল ধর্মের মানুষ একসঙ্গে পাশাপাশি বাস করবার যে ইতিহাস। সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তুলব। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে এদেশে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির উত্থান ঘটে। এ সময় স্বাধীনতা বিরোধীরা সমাজে ও রাষ্ট্রে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সে অপশক্তি আজও অত্যন্ত সক্রিয়। এদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ক্ষমতাসীন দল এদের নিয়ন্ত্রণের কোন দৃশ্যমান কর্মসূচীও গ্রহণ করে নাই। এদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।’

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ-এর সভাপতিমন্ডলীর সদস্য সমাজকর্মী নির্মল রোজারিও বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে যে ঘটনাটি ঘটেছে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে সেটা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও ঘৃণার একটি বিষয়। যেটা আমরা কোনদিন আশা করিনি এবং আমাদের দেশে যে সম্প্রীতির বন্ধন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উপর বড় ধরনের আঘাত। যারা এই ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত অবশ্যই তাদেরকে চিহ্নিত করে যথাযথভাবে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। যাতে ভবিষ্যতে এধরনের ঘটনা আর না ঘটে এজন্য সরকারকে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত করে সেখান থেকে যে সুপারিশ আসবে, সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা লক্ষ্য করেছি কিছু প্রশাসনিক দুর্বলতা ছিল তা আমরা প্রত্যাশা করিনি। যেহেতু এটা ধর্মীয় উৎসব। ১৩ তারিখের পরও আরো কয়েক জায়গায় ঘটনাটি ঘটেছে, কিন্তু প্রশাসনের যে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা থাকা উচিত ছিল তা দেখা যায়নি। আমরা আশা করব ভবিষ্যতে সরকার এ বিষয়ে সক্রিয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’

নির্মূল কমিটির সর্বইউরোপীয় শাখার সভাপতি মানবাধিকার নেতা তরুণকান্তি চৌধুরী বলেন, ‘যে মানসিকতা ৭৫ এর পটপরিবর্তনের চারা গজিয়েছিল তা আজ বৃক্ষে রূপান্তরিত হয়েছে। যেমন মৌলবাদ, ধর্মীয় স্পর্শকতারতা, অসহিষ্ণুতা এবং ধর্মকে রাজনীতিকরণ। শিক্ষা ও সামাজিক ব্যবস্থায় ধর্মের প্রভাব প্রতিফলিত। আজ পর্যন্ত মানবাধিকারকে অগ্রাধিকার দিতে না পারায় দেশের বর্তমান এই অবস্থা। অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধরে রাখতে হলে আইনের ভূমিকা, গণতন্ত্রের চর্চা, বহুসংস্কৃতির সমাজ ব্যবস্থাকে আরও জোরদার করতে হবে। দেশ জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও গোত্র নির্বিশেষে সকলের।’

নির্মূল কমিটির যুক্তরাজ্য শাখার সাধারণ সম্পাদক মানবাধিকার নেত্রী রুবি হক বলেন, ‘বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা নতুন কিছু নয়। ১৯৭৫ সাল থেকে আজ পর্যন্ত জাতি একের পর এক সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সম্মুখীন হয়েই চলেছে। ১৯৭৭ সাল থেকে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং ধর্মীয় মৌলবাদের উত্থান পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। যুগের পর যুগ সকল সরকার তাদের শাসনামলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৌলবাদীদের পৃষ্ঠপোষকতা করে এসেছে। একই সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশেষত হিন্দু ও বৌদ্ধরা সাম্প্রদায়িক সহিংসতার শিকার হয়েছে। খালেদা জিয়ার শাসনামলে ইসলামী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে সরকার সরাসরি সমর্থন দিয়ে বাংলাদেশের ভূমিকে সন্ত্রাসবাদের জন্য ব্যবহার করার সুযোগ করে দেয়। বাংলাদেশের জনগণ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম উগ্রপন্থার শিকার হতে শুরু করে। জামাতপন্থী রাজনৈতিক দল বিএনপি’র পতনের পর একদল ধর্মীয় প্রচারক ‘ওয়াজ মাহ্ফিল শুরু করে।’

নির্মূল কমিটির নিউইয়র্ক শাখার সাধারণ সম্পাদক মানবাধিকার কর্মী স্বীকৃতি বড়ুয়া বলেন, ‘সম্প্রতি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গোৎসবে কুমিল্লায় ধর্ম অবমাননার ষড়যন্ত্র করে ও উস্কানি দিয়ে সারা বাংলাদেশে যে সাম্প্রদায়িক তাণ্ডব চালানো হয়েছে তাতে বোঝা যায় বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ধর্ম নিরপেক্ষতা থেকে কতটুকু পিছিয়ে এসেছে। স্বাধীনতার অর্ধশত বৎসরে এসে বাংলাদেশে যে ধর্মান্ধতার মুখোশ আমরা দেখতে পাচ্ছি, এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টের এবং লজ্জার। সুদূর প্রবাসের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে যখন বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের উপর পরিকল্পিত হামলার, ১০ বছরের শিশু ধর্ষিত হবার সংবাদ দেখি, লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে যায়। এই সভ্য যুগে এহেন অসভ্য মধ্যযুগীয় আচরণ মেনে নেওয়া যায় না। এর দায়বার সরকার, প্রশাসন, স্থানীয় নেতৃবৃন্দ বা সচেতন নাগরিক কেউ এড়াতে পারে না।’

নির্মূল কমিটির কুমিল্লা জেলা শাখার আহ্বায়ক সাংবাদিক দিলীপ মজুমদার বলেন, ‘বাংলাদেশে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসবে আয়োজিত পূজামন্ডপের সংখ্যা ছিল বিগত বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি। পূজানুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ১৩ অক্টোবর পূজার মহাষ্টমীর দিনে কুমিল্লা নগরীর নানুয়ার দিঘির পাড়ে অনুষ্ঠিত দর্পন সংঘ আয়োজিত পূজামন্ডপে ঘটেছে ভয়ংকর এক সাম্প্রদায়িক সহিংসতা। পূজামন্ডপ, প্রতিমা, উৎসব শোভাবর্ধক তোরণ ভাংচুরসহ আগুনে পুড়িয়ে দেয়ার মত চরম নিন্দনীয় সহিংসতার নেতৃত্বদানকারীরা ছিল দেশের উগ্রবাদী ইসলাম পন্থী ধর্মান্ধ জনতা। এ সময়ে কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা উপজেলায় সংঘটিত সহিংসতায় অর্ধশতাধিক আহত এবং প্রাণহানী ঘটে ৪ পূজাদর্শনার্থীর। ঘটনার দিকে সঠিক দৃষ্টিপাত করলে মনে করাটা অনুচিত হবে না যে এটি কোন একক বা সাধারণ কোন মানুষের কাজ নয়। এটি নিশ্চিৎ কোন বড় সাম্প্রদায়িক চক্রের গভীর কোন পরিকল্পনার বাস্তব প্রতিফলন।’

নির্মূল কমিটির রংপুর জেলা শাখার সভাপতি ডা. মফিজুল ইসলাম মান্টু বলেন, ‘রংপুর পীরগঞ্জ উপজেলা রামনাথপুর ইউনিয়নের মাঝিপাড়া গ্রামে হিন্দুদের উপর হামলার ঘটনা সরজমিনে পরিদর্শন করেছেন নির্মূল কমিটি প্রতিনিধিদল। এ যৌথদলে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন রংপুর জেলার কমুনিষ্ট পার্টি, বাসদ, জাসদ, সহ কয়েকটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। বাংলাদেশ বিরোধী উগ্রবাদী জঙ্গীগোষ্ঠীর এই মধ্যযুগীয় কায়দায় ধারাবাহিক বর্বরোচিত ঘটনা রংপুরে এটি ২য় দফায়, যা আরও ভয়াবহ। অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এই হামলায় স্থানীয় ও বহিরাগত উগ্র সাম্প্রদায়িক একদল মানুষ দলবেঁধে তাদের নৃশংস কায়দায় প্রায় ২৮টি বাড়ির অন্তত ৬০-৬৬টি সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারের নারী শিশু আবালবৃদ্ধ বনিতাদের বাড়িঘরে অতর্কিত সংঘবদ্ধ তান্ডব চালায়।’

নির্মূল কমিটির নোয়াখালী জেলা শাখার আহ্বায়ক এডভোকেট কাজী মানছুরুল হক খসরু বলেন, ‘আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ঔদাসিন্যই বর্তমান সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের অন্যতম কারণ। তদুপরি সাংবিধানিক সংস্কারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল সমূহের মৌলবাদী ভোট ব্যাঙ্কের প্রতি দুর্বলতা, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল রাখা, ক্রমাগত সাম্প্রদায়িক শক্তিকে মদদ যোগাচ্ছে। মাদ্রাসা শিক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান বাস্তবায়ন সরকারের আশু করণীয়। একইভাবে নাগরিকদের উচিত সরকার ও রাজনৈতিক দল সমূহের প্রতি চাপ অব্যাহত রাখা এবং ভিন্ন সম্প্রদায়ের বন্ধুদের সাথে থেকে তাদের প্রয়োজনীয় শক্তি যোগানো।’

নির্মূল কমিটির আইন সহায়ক কমিটির সদস্য ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আইনজীবী এডভোকেট নাসির মিয়া বলেন, ‘২০১৬ সালের অক্টোবরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে বিতর্কিত ফেসবুক পোস্টের জের ধরে জামাত-বিএনপি-হেফাজত রসরাজ দাসকে অন্যায়ভাবে আটক করে তার উপর শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে পুলিশের হাতে সোপর্দ করে। পুলিশ বাদী হয়ে রসরাজ দাসের বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন-২০১৬ এর ৫৭ ধারায় একটি মামলা করে। তদন্তকারী কর্মকর্তার আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত রসরাজ দাসের ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। দীর্ঘ ২ মাস ১৭ দিন কারাভোগের পর সে আদালতের পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল পর্যন্ত জামিনে মুক্ত হন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ৪০ দিনের মধ্যে পুলিশ প্রতিবেদন আদালতে দাখিলের নির্দেশ থাকলেও দীর্ঘ পাঁচ বছর অতিবাহিত হবার পরও এখন পর্যন্ত তা আদালতে দাখিল করা হয়নি। এই পাঁচ বছর প্রতি মাসের ধার্য্য তারিখে রসরাজ দাসকে আদালতে এসে হাজিরা দিতে হচ্ছে। এই ঘটনায় রসরাজ দাস ভিক্টিম হবার পরও তাকে আসামী করা হয়েছে। তার উপর চরম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে এবং সে আর্থিকভাবেও চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দ্রুত পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল করে রসরাজ দাসকে এই মামলা থেকে পুরোপুরি মুক্ত করার জন্য আমি আইনমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানাচ্ছি। একই সাথে আমি বলতে চাই রামু-নাসিরনগর সহ সারাদেশের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিচার হয়নি। তার জন্য ‘সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন’ ও ‘সাক্ষী সুরক্ষা আইন’ প্রণয়ন করা উচিত বলে আমি মনে করি।’

, , ,
শর্টলিংকঃ