মৌলবাদী অপশক্তির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করতে হবে: শাহরিয়ার কবির

গতকাল ৩০ অক্টোবর (২০২১) বিকেল ৩টায় মুক্তিযুদ্ধের শহীদ স্মৃতি পাঠাগার মিরপুর-এর ২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীর মিরপুরে লালকুঠি মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য হাসপাতালে ‘চলমান সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস: সরকার ও নাগরিক সমাজের করণীয়’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় প্রধান বক্তার বক্তব্যে নির্মূল কমিটি কেন্দ্রীয় সভাপতি লেখক সাংবাদিক চলচ্চিত্রনির্মাতা শাহরিয়ার কবির একথা বলেন।

মুক্তিযুদ্ধের শহীদ স্মৃতি পাঠাগার মিরপুর শাখার সভাপতি শেখ মোঃ সেলিম রেজার সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক এবিএম মাকসুদুল আনামের সঞ্চলনায় আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য প্রদান করেন ঢাকা-১৪ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা আগা খান মিন্টু।

আলোচনা সভার বিশেষ অতিথি ছিলেন নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সমাজকর্মী কাজী মুকুল এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ঢাকা মহানগর উত্তরের সাংগঠনিক সম্পাদক ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দারুস সালাম থানার সভাপতি এবিএম মাজহারুল আনাম।

সভায় আরও বক্তব্য প্রদান করেন নির্মূল কমিটির চিকিৎসা সহায়ক কমিটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডাঃ মামুন আল মাহতাব, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দারুস সালাম থানার সাধারণ সম্পাদক কাজী ফরিদুল হক হ্যাপী, নির্মূল কমিটির সহ প্রচার সম্পাদক সাইফ উদ্দিন রুবেল, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ১০নং ওয়ার্ডের সভাপতি মিয়া মোহম্মদ লুৎফর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম আনসারী, নির্মূল কমিটি মিরপুর ১০নং ওয়ার্ড শাখার সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মির্জা মজিবুর রহমান, পাঠাগারের ২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক মো: জাহাঙ্গীর পাঠান, নির্মূল কমিটি দারুস সালাম থানার আহ্বায়ক জহিরুল হক ও নির্মূল কমিটি মিরপুর ১০নং ওয়ার্ড শাখার সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর শাহ্ মোহাম্মদ বারীসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, আওয়ামী মহিলা লীগ, যুব মহিলা লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ।

ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে সভার প্রধান বক্তা একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘এ বছর বাঙালি হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে স্বাধীনতাবিরোধী পাকিস্তানপ্রেমী মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তি দেশের বিভিন্ন স্থানে সুপরিকল্পিতভাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর যে জঘন্য হামলা সংঘটিত করেছে তার নিন্দা জানাবার ভাষা আমাদের জানা নেই। সারা দেশে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি সহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠন এবং রাজনৈতিক দল এই হামলার প্রতিবাদে সমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন, আলোচনা সভা, এমন কি গণঅনশনের মতো কর্মসূচিও পালন করেছে।’

‘১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সকল ধর্মীয় ও দলীয় মতপার্থক্যের উর্ধ্বে উঠে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলাম। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলমান, আদিবাসী নির্বিশেষে এদেশের ৩০ লক্ষ মানুষ একটি অসাম্প্রদায়িক কল্যাণরাষ্ট্র ও সমাজ গড়ার জন্য আত্মাহুতি দিয়েছেন। ধর্মের নামে বৈষম্য, পীড়ন, হত্যা ও সন্ত্রাস চিরতরে নির্মূল করার জন্য বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে গ্রহণের পাশাপাশি ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিলেন। ১৯৭১-এর পরাজিত শক্তি ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা এবং তাঁর অন্যতম প্রধান সহযোগী ৪ জাতীয় নেতাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে পাকিস্তানপন্থী মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তি  ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে তাদের শোচনীয় পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল। বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে হত্যা করে তারা বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানের মতো মৌলবাদী সন্ত্রাসী রাষ্ট্র বানাবার জন্য ’৭৫-এর পর থেকেই বহুমাত্রিক চক্রান্ত করছে। বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর বার বার হামলা সেই চক্রান্তেরই অংশ। মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে নির্মূল করতে হলে অবশ্যই বিদ্যমান আইন পরিবর্তন করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। তাদের সকল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করতে হবে, যেমনটি বঙ্গবন্ধু করেছিলেন ’৭২-এর সংবিধানে। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আলোকিত করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনা সর্বস্তরের পাঠ্যপুস্তকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে শপথ নিতে হবে- ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের মূল্যে অর্জিত আমাদের সোনার বাংলা থেকে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ থেকে আমরা অবশ্যই সকল প্রকার মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার মূল উৎপাটন করব।’

প্রধান অতিথি ঢাকা-১৪ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা আগা খান মিন্টু বলেন, ‘সাম্প্রদায়িক অপশক্তি দেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা চালিয়েছে। পরিকল্পিতভাবে দেশে সাম্প্রদায়িক হানাহানি সৃষ্টির পাঁয়তারা চালাচ্ছে স্বাধীনতাবিরোধীরা। বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সকল ধর্মের মানুষ একসাথে বসবাস করে। যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে, তারা কখনো অন্য ধর্মের অনুষ্ঠানে হামলা করতে পারে না। এ সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে।’

নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সমাজকর্মী কাজী মুকুল বলেন, ‘ধর্মের নামে দেশে এ রকম পরিকল্পিত হামলা এই প্রথম নয়। ১৯৭৫-এর পর থেকে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-বিএনপি জোট যখনই সুযোগে পেয়েছে হিন্দুদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে কক্সবাজারের রামুতে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে, সুনামগঞ্জের শাল্লা সহ বিভিন্ন সময়ে সংখ্যালঘুদের হামলা করেছে। কিন্তু কোথাও এদের বিচার হয়নি। উল্টো সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দুদের ঘরবাড়ি ও মন্দিরে হামলা-ভাঙচুর মামলার চার্জশিটভুক্ত ৩ আসামি ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন পেয়েছিল। এই যে অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়া, এটাই তাদের পরবর্তী অপরাধে সাহস যোগায়। শাল্লার ঘটনায় আমরা দেখলাম উল্টো ক্ষতিগ্রস্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিবাদকারী যুবক ঝুমন দাস হেফাজত নেতা মামুনুল হকের বিরুদ্ধে ফেসবুকে লেখায় আটক হয়ে দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও সহজে জামিন পাননি। নাসিরনগরের রসরাজ সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের ভিকটিম হয়েও আসামী হিসেবে পাঁচ বছর ধরে মামলার ভোগান্তি পোহাচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীরা প্রচলিত সাক্ষ্য আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে অনায়াসে ছাড় পেয়ে যাচ্ছে।’ সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জন্য অবিলম্বে ‘সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন’ প্রণয়ন এবং ‘জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন’ গঠনের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে কাজী মুকুল বলেন, ‘২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে-  ক্ষমতায় গেলে আমাদের এই দুটি দাবি পূরণ করা হবে। এ নিয়ে এখন নানারকম টালবাহানা চলছে, যা কোনওভাবেই মেনে নেয়া যাবে না।’

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ঢাকা মহানগর উত্তরের সাংগঠনিক সম্পাদক ও দারুস সালাম থানার সভাপতি এবিএম মাজহারুল আনাম বলেন, ‘এসব সাম্প্রদায়িক হামলা সবই পরিকল্পিতভাবে হচ্ছে। একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্য পাকিস্তানি দোসররা এই ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে। হামলাকারী ও প্ররোচনাকারীদের সনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে যেন ভবিষ্যতে এধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।’

নির্মূল কমিটির চিকিৎসা সহায়ক কমিটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডাঃ মামুন আল মাহতাব বলেন, ‘ বর্তমান সংকট মোকাবেলায় স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তিকে সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে সরকারের হাতকে যেমন শক্তিশালী করতে হবে তেমনি মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের এই সরকারের অবশ্য করণীয় হচ্ছে সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের জন্য দায়ীদেরই শুধু খুজে বের করা নয় বরং নেপথ্যের কুশীলবদেরও শনাক্ত করে বিচারের মুখোমুখি করা।’

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ঢাকা মহানগর উত্তর দারুস সালাম থানা সাধারণ সম্পাদক কাজী ফরিদুল হক হ্যাপী বলেন, ‘’৭১ ও ’৭৫-এর ঘাতকরা পুনরায় দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। হিন্দু সম্প্রদায়ের দুর্গাপূজাকে নিয়ে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। শুধু তাই নয়, আগামী ২০২৩ সালের জাতীয় নির্বাচন নস্যাৎ করতে এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট করতে তারা এমন অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে।’

নির্মূল কমিটির সহ প্রচার সম্পাদক সাইফ উদ্দিন রুবেল বলেন, ‘অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জন্য বীর শহীদরা আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। শহীদদের রক্ত যেন বৃথা না যায় সেজন্য সকলকে একাত্তরের মতো ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’

বাংলা প্রবাহ/ এম এম

, ,
শর্টলিংকঃ