আতাতুর্ক ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শে তরুণ সমাজকে আলোকিত ও উজ্জীবিত করতে হবে

আজ ১০ নবেম্বর (২০২১) দুপুর ২.৩০টায় আধুনিক তুরস্কের জনক মুস্তফা কামাল আতাতুর্কের ৮৩তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র উদ্যোগে এক আন্তর্জাতিক ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। ‘আতাতুর্ক ও বঙ্গবন্ধু: মানবতার বাতিঘর’ শীর্ষক এই ওয়েবিনারে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় সভাপতি লেখক সাংবাদিক চলচ্চিত্রনির্মাতা শাহরিয়ার কবির একথা বলেন।

ওয়েবিনারের সম্মানিত অতিথি ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত তুরস্কের মাননীয় রাষ্ট্রদূত মুস্তফা ওসমান তুরান এবং তুরস্কে বাংলাদেশের মাননীয় রাষ্ট্রদূত মসুদ মান্নান এনডিসি। সভায় বক্তব্য প্রদান করেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন, তুরস্কের খ্যাতিমান লেখক ও চলচ্চিত্রনির্মাতা ফেরহাত আতিক, নির্মূল কমিটির সাংস্কৃতিক স্কোয়াড-এর সাধারণ সম্পাদক সঙ্গীতশিল্পী জান্নাত-ই-ফেরদৌসী, তুরস্কের লেখক সাংবাদিক আহমেত জোশকুনায়দিন, তুরস্কের গবেষক এলিফ বালি কুরতারির, নির্মূল কমিটির সর্বইউরোপীয় শাখার সভাপতি মানবাধিকার নেতা তরুণকান্তি চৌধুরী, নির্মূল কমিটির যুক্তরাজ্য শাখার সাধারণ সম্পাদক মানবাধিকার নেত্রী রুবি হক, নির্মূল কমিটির বহুভাষিক সাময়িকী ‘জাগরণ’-এর হিন্দি বিভাগীয় সম্পাদক ভারতের সাংবাদিক তাপস দাস এবং নির্মূল কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন নির্মূল কমিটির তুরস্ক শাখা ‘টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি ফোরাম ফর হিউম্যানিজম’-এর সাধারণ সম্পাদক লেখক ও চলচ্চিত্রনির্মাতা শাকিল রেজা ইফতি।

অনুষ্ঠানের প্রারম্ভে তুর্কি ভাষায় আতাতুর্ককে নিবেদিত জনপ্রিয় তুর্কি সঙ্গীত পরিবেশন করেন নির্মূল কমিটির সাংস্কৃতিক স্কোয়াড-এর সাধারণ সম্পাদক সঙ্গীতশিল্পী জান্নাত-ই-ফেরদৌসী।

সভাপতির ভাষণে আধুনিক তুরস্কের জনক মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক ও বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে বিশ্ববরেণ্য রাষ্ট্রনায়ক ও মনীষীদের মন্তব্য উল্লেখ করে শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষ মানবিক ও আধুনিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠায় তুরস্ক ও বাংলাদেশের এই দুই মহান নেতার অবদান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। বৃটিশ-ভারতে ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ-পীড়নের বিরুদ্ধে আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রামে আতাতুর্কের সংগ্রাম তরুণ মুক্তিসংগ্রামীদের উদ্দীপ্ত করেছিল, যার প্রমাণ পাই বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কামাল পাশা কবিতা এবং সমকালীন অন্যান্য রচনায়। আতাতুর্ক ও বঙ্গবন্ধুর মানবতা ও মুক্তির দর্শন বিশ্বের নিপীড়িত জনগণকে স্বাধীনতা ও সার্বিক মুক্তিসংগ্রামে যুগ যুগ ধরে প্রেরণা জোগাবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিককালে যেভাবে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে, যেভাবে ধর্মের নামে গণহত্যা হচ্ছে, সন্ত্রাস ও নির্যাতন সহ মানবতার বিরুদ্ধে যাবতীয় অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে এর মোকাবেলা করতে হলে দেশে দেশে আতাতুর্ক ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শে তরুণ সমাজকে আলোকিত ও উজ্জীবিত করতে হবে। আতাতুর্ক ও বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতার বোধ ধর্মহীনতা ছিল না। ধর্মের পবিত্রতা রক্ষার জন্যই তারা ধর্মকে রাষ্ট্র ও রাজনীতি থেকে পৃথক রাখার কথা বলেছিলেন। তাঁদের ব্যবস্থাপত্র অনুসৃত হলে যুদ্ধ-সন্ত্রাস-সংঘাত কবলিত বর্তমান বিশ্বে শান্তি ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে।’

ঢাকায় নিযুক্ত তুরস্কের মাননীয় রাষ্ট্রদূত মুস্তফা ওসমান তুরান তুরস্ক ও বাংলাদেশ সহ সারাবিশ্বে মানবতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আতাতুর্ক ও বঙ্গবন্ধুর নীতি ও আদর্শের তাৎপর্য তুলে ধরে বলেন, ‘মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক তুরস্কের স্বাধীনতাকে কেন্দ্র করে তুর্কি জাতিকে একত্রিত করেন। তিনি আধুনিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে একটি গণতান্ত্রিক, উন্নত এবং মহান তুর্কি রাষ্ট্র গড়ে তোলেন। তাঁর অসীম নেতৃত্ব এবং মতাদর্শ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দ্বারা স্বীকৃত। তিনি বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক বিপ্লবী আন্দোলনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তারকারী একজন মূর্তমান নেতা।

তুরস্কের রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, ‘১৯২১ সালে বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘কামাল পাশা’ কবিতায় তুরস্ক, তুর্কি জাতি এবং সর্বোপরি মুস্তাফা কামাল আতাতুর্কের প্রতি অনন্যসাধারণ সম্মান ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন। কাজী নজরুল ইসলাম একমাত্র বিদেশী কবি যিনি একটি অনন্য কবিতার মাধ্যমে আতাতুর্ক এবং তুর্কি স্বাধীনতা যুদ্ধের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

‘বাংলাদেশে আতাতুর্কের প্রতি গভীর শ্রদ্ধার আরেকটি দিক হলো ১৯৩৮ সালের ১০ নবেম্বর আতাতুর্ক-এর প্রয়াণের খবর ঢাকায় পৌঁছানোর মাত্র ৫৪ দিনের মাথায় ১৯৩৯ সালের ৬ জানুয়ারি ফেনীতে ‘আতাতুর্ক মডেল হাই স্কুল’ এর উদ্বোধন করা হয়। বাংলাদেশে আতাতুর্কের নামে এটি প্রথম এবং একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

‘তুরস্কের জনগণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেতা হিসেবে স্মরণ ও শ্রদ্ধা করে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, আধুনিকতাবাদী ধারণা এবং সাফল্য দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতিকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র উপহার দিয়েছিলেন।

‘মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের পররাষ্ট্রনীতি ‘ঘরে শান্তি তো বিশ্বে শান্তি’ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পররাষ্ট্র নীতি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’ বৈশ্বিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অভিন্ন নীতি নির্দেশ করে যা শুধু আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কই নয় বরং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও অবদান রেখেছে। আন্তর্জাতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ অনেক বিষয়ে আমাদের যুগপৎ পথ চলা দুই মহান জাতির পিতা মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মূল নীতিগুলির মাঝে খুঁজে পাওয়া যায়।’

ওয়েবিনারে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশ ও তুরস্কের সম্মানিত বক্তাদের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে তুরস্কে নিযুক্ত বাংলাদেশের মাননীয় রাষ্ট্রদূত মসুদ মান্নান বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অনুসরণ করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতাবিরোধীদের বিচারের ব্যবস্থা করছেন। বঙ্গবন্ধু সারাজীবন মানবতা প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। ১৯৪০-এর দশকে কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধ সহ জীবনের বহু ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতি সবার প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ হলেও তিনি সর্বদা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এবং নিষ্পেষিত দেশগুলোর পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত দেশগুলোতে আমরা সমস্যা উত্তরণে বঙ্গবন্ধুর অসাধারণ নেতৃত্বের কথা বলি। বঙ্গবন্ধু ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পড়ে ও জননেত্রী শেখ হাসিনার আদর্শ অনুসরণ করে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিজেদের গড়ে তুলতে পারে বলে আমি মনে করি।

‘কামাল আতাতুর্ক তাঁর দেশকে বহিঃশত্রুর হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। তুরস্কের নারী অধিকার এবং মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তিনি অসামান্য আবদান রেখেছেন। তিনি গোত্র বৈষম্য ও ধর্মীয় বৈষম্য দূর করে তুরস্কের জনগণকে একত্রিত করেছেন। তুরস্কে বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কামাল আতাতুর্ক অসামান্য ভূমিকা পালন করেন।’

বাংলাদেশের কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে আমি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব মানবিকতায়, চেতনাগত দিক থেকে, এবং মনুষ্যবোধের সবটুকু দিক থেকে তিনি ছিলেন একজন প্রতিভাবান মানুষ। তাঁর প্রতিভার আলোকে প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের বাঙালিরা। খেটে খাওয়া মানুষ, নিপীড়িত-নির্যাতিত সকলের পাশে বঙ্গবন্ধু দাঁড়িয়েছিলেন। এমনকি জেলখানায় বসে তাঁর রচিত গ্রন্থেও তিনি গভীর মমতায় উল্লেখ করেছেন দুঃখী মানুষের কথা। এই মহান নেতার জীবন ও দর্শন যুগ যুগ ধরে আলোর পথ দেখাবে বাংলাদেশকে। বিশ্বমানবতার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র শেখ মুজিব।’

আধুনিক তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা মুস্তফা কামাল আতাতুর্ককে বঙ্গবন্ধুর মতো মানবিক নেতা উল্লেখ করে কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন বলেন, ‘নিজ দেশে ধর্মনিরপেক্ষতার মাধ্যমে সকলের সমান অধিকার নিশ্চিতকরণে এই মহান দুই নেতা নিরলস অবদান রেখেছেন।’

তুরস্কের খ্যাতিমান লেখক ও চলচ্চিত্রনির্মাতা ফেরহাত আতিক বলেন, ‘তুরস্ক ও বাংলাদেশ অত্যন্ত ভাগ্যবান জাতিরাষ্ট্র কেননা আতাতুর্ক ও বঙ্গবন্ধুর মতো বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এই দেশদুটোকে বিশ্ব মানচিত্রে মর্যাদার আসন দিয়েছে। এই মহান নেতাদের আদর্শ অনুসরণ করে দুটো রাষ্ট্রই প্রতিনিয়ত আরও বড় কিছু করার জন্য এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে। আশার কথা এই যে, বাংলাদেশ ও তুরস্কের সম্পর্ক দিনে দিনে আরও শক্তিশালী হচ্ছে। দুই দেশের জনগণের মধ্যে এই জাতীয় ওয়েবিনার ও অনুষ্ঠান আরও বেশি করে হওয়া জরুরি।’

নির্মূল কমিটির সাংস্কৃতিক স্কোয়াড-এর সাধারণ সম্পাদক সঙ্গীতশিল্পী জান্নাত-ই-ফেরদৌসী বলেন, ‘আতাতুর্ক এবং বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গে যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করে, তা হল এই দুই মহান নেতার বৈষম্য-বিরোধী দর্শন ও কার্যক্রম। নারী-পুরুষ সমান অধিকার নিশ্চিতকরণে নিজ নিজ রাষ্ট্রে খুব উল্লেখযোগ্য ভূমিকায় অবতীর্ণ ছিলেন তাঁরা। তুরস্ক এবং বাংলাদেশ উভয় রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়। আতাতুর্ক আধুনিক তুরস্কে নারীদের ভোটাধিকার নিশ্চিতকরণসহ তাদের উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে বিশেষ অবদান রেখেছেন। একইভাবে বঙ্গবন্ধু নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় গভীর গুরুত্বারোপ করেছিলেন। উল্লেখ্য, এই কারণেই বাংলাদেশে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় রয়েছে।’

তুরস্কের লেখক সাংবাদিক আহমেত জোশকুনায়দিন বলেন, ‘একবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশ এবং তুরস্ক দুটো রাষ্ট্রই কিন্তু চায় গণতন্ত্র, আধুনিকতা ও বিজ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে নিজ নিজ রাষ্ট্রকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নিতে। এই স্বপ্ন ও লক্ষ্য নির্ধারণ করাটাই হল সেগুলো অর্জনের পূর্বশর্ত। বিপুল সংখ্যক শরণার্থীদের আশ্রয় প্রদানের মাধ্যমে আজ এই দুই বন্ধুরাষ্ট্র বিশ্ব মানচিত্রে সম্মানের সঙ্গে মাথা উঁচু করে মানবতার দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছে। আতাতুর্ক ও বঙ্গবন্ধুর মতো নেতৃত্বের মানবিক গুণসমূহ এই দুই মিত্র রাষ্ট্রকে আলোকিত করে যাবে অনন্তকাল।’

তুরস্কের গবেষক এলিফ বালি কুরতারির বলেন, ‘আতাতুর্কের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের এবং ধর্মনিরপেক্ষতা নিশ্চিতকরণের মধ্য দিয়ে একটি আধুনিক জাতিরাষ্ট্র গঠনের প্রচেষ্টার যোগ্য প্রতিফলন যেন বঙ্গবন্ধুর দর্শনে দৃশ্যমান হয়। বাংলাদেশে বসবাসরত বিভিন্ন ধর্ম পরিচয়ের মানুষদের এক করে বিপুল বৈচিত্র্যকে ‘বাঙালি’ পরিচয়ের ছায়াতলে এনে তিনি চেয়েছিলেন জাতিকে আরও বড় লক্ষ্যে এগিয়ে নিতে। আতাতুর্কের মতো তিনিও সক্ষম হয়েছিলেন একটি পুরো জাতিকে আশার বাণী শোনাতে এবং নতুনভাবে গড়ে তুলতে।’

নির্মূল কমিটির সর্বইউরোপীয় শাখার সভাপতি মানবাধিকার নেতা তরুণকান্তি চৌধুরী বলেন, ‘বহুসংস্কৃতিবাদ অন্তর্ভুক্তকরণের জন্য পশ্চিমাজগত আজ উন্নত। সামাজিক ব্যবস্থায় জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সমান অধিকার দেয়া হয়েছে। কামাল আতাতুর্ক ও বঙ্গবন্ধুর দর্শন এবং কর্মজীবনে তার প্রতিফলন দেখা যায়। ধর্মকে রাজনীতি থেকে বাদ দিয়ে মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থান দেয়া হয়েছে। উভয়েই ধর্মনিরেপেক্ষতাকে দেশের সংবিধানে বিশেষ স্থান দিয়েছেন যাতে ধর্ম ও সামাজিক ব্যবস্থায় সাম্যতা বজায় থাকে। মোট কথা তাঁরা মানবতার জয়গান গেয়েছেন।’

নির্মূল কমিটির যুক্তরাজ্য শাখার সাধারণ সম্পাদক মানবাধিকার নেত্রী রুবি হক বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণরূপে প্রমাণিত যে বঙ্গবন্ধু ও আতাতুর্ক এই দুই রাজনৈতিক মহাতারকা আধুনিক বিশ্বের জন্য মানবতার আলোকবর্তিকা। আধুনিক তুরস্কের জনক কামাল আতাতুর্ক তার দেশকে আধুনিক বিশ্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন এবং ঐতিহ্যগত বিশ্বাস-ভিত্তিক রাজতন্ত্র থেকে আধুনিকায়ন করেছিলেন। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রাম ছিল কেবল পাকিস্তানি শাসন থেকে তাঁর ভূমিকে মুক্ত করার জন্য নয় বরং ধর্মীয় বিদ্বেষ থেকে মানুষকে মুক্ত করে একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য। আজকের বিশ্ব প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ধর্মীয় মৌলবাদ ও ধর্মান্ধতায় বিষাক্ত হয়ে উঠছে। অধিকাংশ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদী এবং মৌলবাদীদের দ্বারা ঘটে। তাই আতাতুর্ক এবং বঙ্গবন্ধুর মানবতা ও অসাম্প্রদায়িক আদর্শ প্রতিষ্ঠা আজকের বিশ্বের জন্য খুবই জরুরি।’

নির্মূল কমিটির বহুভাষিক সাময়িকী ‘জাগরণ’-এর হিন্দি বিভাগীয় সম্পাদক ভারতের সাংবাদিক তাপস দাস বলেন, ‘আজকের বিশ্বে মৌলবাদ ও ডানপন্থী রাজনীতির উত্থান সমগ্র মানবজাতিকে এক সংকটের মধ্যে নিয়ে এসেছে। ধর্মের নামে এই সন্ত্রাসের রাজনীতিকে প্রতিহত করার উপায় মানবতাকে প্রসারিত করা। আর এই কারণেই কামাল আতাতুর্ক এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই যুদ্ধবিধ্বস্ত বিশ্বে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন। তাঁরা কেবল তাদের নিজের জীবনে মানবতার আদর্শকে মেনে চলেননি বরং সকল শ্রেণী-পেশা ও ধর্মের মানুষকে নিয়ে একটি ধর্মনিরপেক্ষ, মানবিক দেশ গড়ে তুলেছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন সাধারণ ছাত্র হিসেবে আমি মনে করি, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার পাঠ্যপুস্তকে এই দুই মহাপুরুষের নীতি অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।’

আলোচনা সভার সঞ্চালক নির্মূল কমিটির তুরস্ক শাখা ‘টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি ফোরাম ফর হিউম্যানিজম’-এর সাধারণ সম্পাদক লেখক ও চলচ্চিত্রনির্মাতা শাকিল রেজা ইফতি আধুনিক তুর্কি জাতির পিতা মোস্তফা কামাল ও বঙ্গবন্ধুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে বলেন, ‘অতি সম্প্রতি আমার তুর্কি ভাষায় নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘তুর্কিয়ে বঙ্গবন্ধ’য়ু আনিওর’ (বাংলায় ‘তুরস্কে বঙ্গবন্ধু’)-এ আমি দেখিয়েছি তুরস্কের বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে নিয়ে কি ভাবছেন। আমি আবেগাপ্লুত হয়েছি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তুর্কিদের ভাবনা সম্পর্কে জেনে। আমার তুর্কি বন্ধুরা একে অন্যকে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানাতে গিয়ে বলে থাকেন ‘বাংলাদেশের আতাতুর্ক হলেন বঙ্গবন্ধু’। কথাটিকে আমার খুব তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম, ধর্মনিরপেক্ষতা, একটি রাষ্ট্রকে আধুনিকতার আদলে পুনর্গঠন ইত্যাদি ক্ষেত্রে এই দুই মহান নেতার গভীর সাদৃশ্য দৃশ্যমান। মানবিকতার আলোয় বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় এই দুই মহান নেতার আদর্শ সমগ্র বিশ্বের জন্য উদাহরণ। তুর্কিদের বঙ্গবন্ধু ভাবনার মতো বাঙালিদেরও আতাতুর্ক ভাবনা রয়েছে। পরিকল্পনা আছে, সামনে ‘বাংলায় আতাতুর্ক’ শিরোনামে আরও একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করবো। তুরস্ক-বাংলাদেশ সম্পর্কের মতো তুর্কি-বাঙালি সম্পর্কও দিনে দিনে আরও বেশি জোরদার হবে, এমনটাই প্রত্যাশা।’

অনুষ্ঠানের সমাপনী ভাষণে নির্মূল কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল সম্মানিত অতিথি ও আলোচকদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের এই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমাদের সংগঠনের কয়েক হাজার সদস্য যুক্ত রয়েছেন, যারা ধর্মনিরপেক্ষ মানবতার চেতনা প্রসারের জন্য কাজ করছেন। আতাতুর্ক ও বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শ প্রচারে সরকার ও নাগরিক সমাজকে বহুমাত্রিক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। তাদের সংগ্রামী জীবন ও আদর্শ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আজকের অনুষ্ঠানের সঞ্চালক আমাদের তুরস্ক শাখার সাধারণ সম্পাদক শাকিল রেজা ইফতিকে আমি বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাচ্ছি, আজকের এই সভা আয়োজনে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ এবং তুরস্কে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবন ও বাংলাদেশকে পরিচিত করার ক্ষেত্রে লেখালেখি ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের জন্য।’

বাংলা প্রবাহ/এম এম

, , , ,
শর্টলিংকঃ