কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের মৃত্যুতে নির্মূল কমিটির গভীর শোক প্রকাশ

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। আজ (১৬ই নভেম্বর) সংগঠনের এক শোক বিবৃতিতে বলা হয়-

‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের আকস্মিক মৃত্যুতে আমরা অত্যন্ত শোকাহত।

হাসান আজিজুল হক ১৯৫৪ সালে যবগ্রাম মহারানী কাশীশ্বরী উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৫৬ সালে খুলনার শহরের অদূরে দৌলতপুরের ব্রজলাল কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। প্রথম যৌবনেই ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি। রাজনীতি করার কারণেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছিল তাঁকে। ১৯৫৮ সালে রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে দর্শন-এ সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬০ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ৩১ বছর অধ্যাপনা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ারে ছিলেন ২০০৯ সালে। তাঁর অবসর জীবন কাটত লেখালেখি করে।

কৈশোর জীবনেই তার সাহিত্যচর্চার হাতেখড়ি। তবে ১৯৬০ সালে সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল পত্রিকায় ‘শকুন’ শীর্ষক গল্প প্রকাশের মধ্য দিয়ে তিনি সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি একাধারে গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ লিখেছেন। এই কথাসাহিত্যিক তাঁর সুঠাম গদ্য এবং মর্মস্পর্শী বর্ণনাভঙ্গির জন্য প্রসিদ্ধ।

ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পকার হিসেবে বাংলা সাহিত্যে এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন হাসান আজিজুল। ১৯৬০-এর দশকে লেখালিখি শুরু করলেও প্রথম উপন্যাস ‘আগুনপাখি’ লেখেন ২০০৬ সালে। সেই উপন্যাসের পটভূমি অবিভক্ত বঙ্গের রাঢ় অঞ্চল। এক বড় কালপর্বকে ধরে রেখেছে এই উপন্যাস। যেখানে মহামারি, অনাহার, সাম্প্রদায়িক বিভাজন এবং দেশভাগের বিন্দুগুলিকে স্পর্শ করে আখ্যান এগিয়েছে ভিন্নতর স্তরে। এই উপন্যাসের জন্যই পশ্চিমবঙ্গ থেকে ২০০৮ সালে আনন্দ পুরস্কার প্রদান করা হয় তাঁকে।

হাসান আজিজুল হকের অন্যান্য রচনার মধ্যে রয়েছে, সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য, আত্মজা ও একটি করবী গাছ, নামহীন গোত্রহীন প্রভৃতি গল্পগ্রন্থ। রয়েছে কথাসাহিত্যের কথকতা, অতলের পাখি-র মতো প্রবন্ধ গ্রন্থও। গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের জীবন ও চিন্তার উপরে আধারিত তার গ্রন্থ সক্রেটিস-ও এক উল্লেখযোগ্য রচনা। অসামান্য গদ্যশিল্পী তার অসাধারণ সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ১৯৯৯ সালে একুশে পদকে ও ২০১৯ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে। তিনি ২০১৮ সালে জাহানারা ইমাম স্মৃতিপদক লাভ করেন। এই অসামান্য গদ্যশিল্পী তাঁর সার্বজৈবনিক সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতি স্বরূপ ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে “সাহিত্যরত্ন” উপাধিতে ভূষিত হন। এছাড়াও তিনি আদমজী সাহিত্য পুরস্কারসহ ২৩টির অধিক পুরস্কার পেয়েছেন। ২০১২ সালে তিনি ভারতের আসাম বিশ্ববিদ্যালয় ও ২০১৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডিলিট ডিগ্রি পান।

১৯৯২ সালে শহীদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গঠিত গণআন্দোলনের সূচনা থেকেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধের আন্দোলনে তাঁর সাহচর্য ও সহযোগিতা পেয়েছে নির্মূল কমিটি। রাজশাহীতে তিনি আমাদের অসংখ্য অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন এবং দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যের মাধ্যমে আমাদেরকে কর্মী ও সংগঠকদের আলোকিত করেছেন। ২০১৮ সালে ২৬ জুন কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক শহীদজননী জাহানারা ইমামের ২৬তম মৃত্যুবার্ষিকীতে ‘’৪৭-এর দেশভাগ এবং বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি’ শীর্ষক স্মারক বক্তৃতা প্রদান করেন। তার লিখনী ও কর্ম নির্মূল কমিটির তরুণ নেতৃবৃন্দকে ধর্মনিরপেক্ষ মানবিক সমাজ গড়ার আন্দোলনে সর্বদা অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।

বাংলাদেশের মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী সামাজিক সাংস্কৃতিক আন্দোলনে কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক হাসান আজিজুল হকের অসামান্য অবদান বিশেষভাবে স্মরণ করবার পাশাপাশি আমরা তাঁর পরিবারের শোকসন্তপ্ত সকল সদস্য ও অনুরাগীদের প্রতি গভীর সমবেদনা ও সহমর্মিতা জ্ঞাপন করছি।’

শোক বিবৃতিতে সাক্ষর করেন-বিচারপতি মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী, বিচারপতি সৈয়দ আমিরুল ইসলাম, বিচারপতি শামসুল হুদা, বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, লেখক সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী, অধ্যাপক অনুপম সেন, নাট্যজন মুক্তিযোদ্ধা রামেন্দু মজুমদার, সমাজকর্মী মালেকা খান, শিল্পী হাশেম খান, শিল্পী রফিকুননবী, অধ্যাপিকা পান্না কায়সার, অধ্যাপিকা মাহফুজা খানম, জননেতা ঊষাতন তালুকদার, কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন, চলচ্চিত্রনির্মাতা মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন ইউসুফ, অধ্যাপক ডাঃ কাজী কামরুজ্জামান, ক্যাপ্টেন (অবঃ) আলমগীর সাত্তার বীরপ্রতীক, ক্যাপ্টেন (অবঃ) সাহাবউদ্দিন আহমেদ বীরউত্তম, মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আবদুর রশীদ (অবঃ), মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ডাঃ আমজাদ হোসেন, ড. নূরন নবী, লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, শহীদজায়া সালমা হক, সমাজকর্মী আরমা দত্ত এমপি, কলামিস্ট সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ, শিক্ষাবিদ মমতাজ লতিফ, অধ্যাপক শিল্পী আবুল বারক আলভী, সমাজকর্মী কাজী মুকুল, কথাশিল্পী অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল, অধ্যাপক আয়েশ উদ্দিন, অধ্যাপক মেজবাহ কামাল, ডাঃ শেখ বাহারুল আলম, ড. মেঘনা গুহঠাকুরতা, ডাঃ ইকবাল কবীর, মুক্তিযোদ্ধা সুব্রত চক্রবর্ত্তী, মুক্তিযোদ্ধা মকবুল-ই এলাহী চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা শফিকুর রহমান শহীদ, এডভোকেট আবদুস সালাম, অধ্যাপক মোহাম্মদ সেলিম, অধ্যাপক আবদুল গাফ্ফার, কবি জয়দুল হোসেন, ব্যারিস্টার ড. তুরিন আফরোজ, মুক্তিযোদ্ধা কাজী লুৎফর রহমান, সাবেক জাতীয় ফুটবলার শামসুল আলম মঞ্জু, সমাজকর্মী কামরুননেসা মান্নান, এডভোকেট আজাহার উল্লাহ্ ভূইয়া, অধ্যাপক ডাঃ উত্তম কুমার বড়ুয়া, সঙ্গীতশিল্পী জান্নাত-ই ফেরদৌসী লাকী, অধ্যাপক ডাঃ মামুন আল মাহতাব, সাংবাদিক শওকত বাঙালি, উপাধ্যক্ষ কামরুজ্জামান, অধ্যাপক ডাঃ নুজহাত চৌধুরী শম্পা, লেখক আলী আকবর টাবী, সমাজকর্মী চন্দন শীল, এডভোকেট কাজী মানছুরুল হক খসরু, এডভোকেট দীপক ঘোষ, অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট ড. কানিজ আকলিমা সুলতানা, ব্যারিস্টার নাদিয়া চৌধুরী, সাংবাদিক মহেন্দ্র নাথ সেন, শহীদসন্তান তৌহিদ রেজা নূর, শহীদসন্তান শমী কায়সার, শহীদসন্তান আসিফ মুনীর তন্ময়, শহীদসন্তান তানভীর হায়দার চৌধুরী শোভন, মানবাধিকারকর্মী তরুণ কান্তি চৌধুরী, লেখক সাংবাদিক সাব্বির খান, মানবাধিকারকর্মী আনসার আহমদ উল্লাহ, মানবাধিকারকর্মী স্বীকৃতি বড়ুয়া, এডভোকেট আবদুল মালেক, লেখক কলামিস্ট মিথুশিলাক মুর্মু, কলামিস্ট অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট লীনা পারভীন, মানবাধিকারকর্মী রহমান খলিলুর, অধ্যাপক সুজিত সরকার, সমাজকর্মী হারুণ অর রশীদ, এডভোকেট মালেক শেখ, সহকারী অধ্যাপক তপন পালিত, সাংবাদিক দিলীপ মজুমদার, সমাজকর্ম রাশেদুল ইসলাম, সমাজকর্মী ইস্রাফিল খান বাপ্পি, সমাজকর্মী শিমন বাস্কে, সমাজকর্মী শেখ আলী শাহনেওয়াজ পরাগ, সমাজকর্মী সাইফ উদ্দিন রুবেল, সমাজকর্মী ফয়সাল হাসান তানভীর, লেখক ও চলচ্চিত্রনির্মাতা শাকিল রেজা ইফতি প্রমুখ।

বাংলা প্রবাহ/এম এম

, ,
শর্টলিংকঃ