মুম্বাই হামলার ১৩তম বার্ষিকী উপলক্ষে নির্মূল কমিটির আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

আজ ২৬ নবেম্বর মুম্বাই হামলার ১৩তম বার্ষিকীতে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি বাং বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সমিতির সহযোগিতায় শিল্পকলা একাডেমির ৬নং মিলনায়তনে ৩ দিনব্যাপী আলোকচিত্র ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে।

বিকেল ৪টায় আলোকচিত্র ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপি। এরপর আলোচনা সভা ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনার বিষয় ছিল: ‘উপমহাদেশে জঙ্গি মৌলবাদী সন্ত্রাস দমন: সরকার ও নাগরিক সমাজের করণীয়’। নির্মূল কমিটির সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপি এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভারতের মাননীয় রাষ্ট্রদূত মি. বিক্রম দোরাইস্বামী।

আলোচনায় সভায় বক্তব্য প্রদান করেন মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী দক্ষিণ এশীয় গণসম্মিলন-এর সভাপতি বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, নির্মূল কমিটির সহসভাপতি শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ভাষাসৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পৌত্রী সমাজকর্মী আরমা দত্ত এমপি, বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সমিতির সভাপতি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মোঃ রশিদুল আলম এবং ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট, ল এন্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ-এর নির্বাহী পরিচালক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল মোঃ আবদুর রশীদ (অব.)।

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, ‘২০০৮ সালের ২৬ নবেম্বর পাকিস্তানের মদদপুষ্ট জঙ্গিদের এক নজিরবিহীন সন্ত্রাসী হামলায় ভারতের মুম্বাইয়ের তাজ হোটেল এবং সংশ্লিষ্ট এলাকা এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল, যেখানে ভারতীয় সহ ২২টি দেশের কয়েক শ নাগরিক হতাহত হয়েছিলেন। পাকিস্তান কীভাবে বাংলাদেশ ও ভারত সহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে জঙ্গিবাদ রফতানি সহ ধর্মের নামে হত্যা, সন্ত্রাস ও ধ্বংসযজ্ঞ সাধন করে তা আমরা ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকাল থেকে প্রত্যক্ষ করছি।’

বক্তারা আরো বলেন, ‘১৯৭৫ সালে সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পৃক্ততা সম্পর্কে বহু গবেষণামূলক রচনা রয়েছে। এরপর থেকে বাংলাদেশ অধিকাংশ সময় শাসিত হয়েছে স্বাধীনতাবিরোধী পাকিস্তানপন্থী জঙ্গি মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তির দ্বারা। পাকিস্তানের পৃষ্ঠপোষকতায় বিএনপি-জামায়াতের জোট সরকারের আমলে বাংলাদেশে অসংখ্য হত্যা ও সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে, যার ভেতর সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা আওয়ামী লীগের সভাপতি বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার জনসভায় গ্রেণেড বোমা হামলা। হামলাকারীরা বলেছে কীভাবে তারা পাকিস্তানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়েছে এবং হামলায় ব্যবহৃত আর্জেস গ্রেণেডও পাকিস্তান থেকে এসেছে। ’৭১-এর পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের মদদপুষ্ট সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো প্রকাশ্যে ও গোপনে যে সব তৎপরতা চালাচ্ছে তা গোটা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে আমরা মনে করি। পাকিস্তান এবং তাদের সহযোগী জঙ্গিদের মোকাবেলার জন্য সরকার ও নাগরিক সমাজকে একজোট হতে হবে।’

সভার প্রধান অতিথি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপি বলেন, ‘২০০৮ সালের ২৬শে নভেম্বর ভারতের মুম্বাইয়ে ২২টি দেশের ১৭৫ জন সাধারণ নাগরিককে সন্ত্রাসীরা নির্মমভাবে হত্যা করে। সন্ত্রাসীরা কোন দেশ থেকে কাদের সহায়তায় এই সন্ত্রাসী কার্যক্রম সংঘটিত করে তা আমাদের সকলেরই জানা। ভারতের মতো বাংলাদেশেও বারবার জঙ্গি হামলার সম্মুখীন হয়েছে। ২০০১-এর পর বিএনপি আমলে জঙ্গিদের আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়ে লালন পালন করা হয়। এরপর তারা পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে মুছে ফেলার কার্যক্রম আরম্ভ করে। তারা বাংলাদেশের শান্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে বিনষ্ট করার জন্য বৈশাখী উৎসব থেকে শুরু করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মসজিদ, মন্দির, মঠ ও গির্জাসহ নানা ধর্মীয় স্থানে হামলা চালিয়ে নিরীহ মানুষ হত্যা করে। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর এদেরকে শক্ত হতে নির্মল করেন। তিনি সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ও মাদকের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি ঘোষণা করেন। বাংলাদেশের বন্ধুরাষ্ট্র ভারত এর গোয়েন্দা তথ্য আমাদের সবসময় সহযোগিতা করেছে জঙ্গিদের হামলা প্রতিহত করে তাদের পাকড়াও করতে। এমনিভাবে আমরাও ভারতকে তথ্য দিয়ে জঙ্গিদের আটকে সহায়তা করেছি। ভবিষ্যতেও আমরা এই কার্যক্রম অব্যাহত রাখব এবং একইসঙ্গে জঙ্গিবাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় ও প্রশিক্ষণ দাতা পাকিস্তানের সকল চক্রান্তকে প্রতিহত করে ভারতীয় উপমহাদেশে আমরা শান্তি-শৃঙ্খলা ও সম্প্রীতি বজায় রাখব।’

সভার বিশেষ অতিথি ভারতের মাননীয় রাষ্ট্রদূত মি. বিক্রম দোরাইস্বামী বলেন, ‘২০০৮ সালের ২৬শে নভেম্বর ভারতের মুম্বাই যা ঘটেছিল তা বর্ণনা করা খুবই কষ্টকর। কিছু অস্ত্রধারী পাকিস্তানি সন্ত্রাসী দেশি ও বিদেশি সাধারণ নাগরিকদের নির্মমভাবে হত্যা করে। এ হত্যাকাÐটি পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত করে ভারতের আইএসআইয়ের মদদপুষ্ট লস্কর-ই-তৈয়বা। এ হামলার মাধ্যমে তারা শান্তি ও সম্প্রীতি বিনষ্ট করে ভারতসহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় সন্ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। সন্ত্রাসীরা শুধু ভারতেই নয় বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সংস্কৃতিকে বিনষ্ট করার জন্য পহেলা বৈশাখসহ সন্ত্রাসবাদ বিরোধী সমাবেশে হামলা চালিয়ে বাংলাদেশকে একটি জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা সফল হতে পারেনি এবং কখনো পারবেও না। মিথ্যার উপর সত্যের বিজয় সব সময় হয়ে এসেছে এবং হবে।’

নির্মূল কমিটির সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘২০০১-এর ৯/১১-এর ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী কর্মকাÐের পর থেকে পশ্চিমের বহু রাজনৈতিক বিশ্লেষক পাকিস্তানকে দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র বলেছেন। আমেরিকার সিনেটর ল্যারি প্রেসলিও বলেছেন, সন্ত্রাস সম্পর্কে পাকিস্তান যদি নীতি পরিবর্তন না করে এটিকে অবশ্যই সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। পাকিস্তানকে দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পাকিস্তান কীভাবে তালেবান ও আল কায়দার মতো সন্ত্রাসী জিহাদী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত এ নিয়ে পাকিস্তানি গবেষকরাও প্রচুর লিখেছেন। পাকিস্তান হচ্ছে বিশ্বের প্রধান সন্ত্রাস উৎপাদনকারী, বিপণনকারী ও রফতানিকারী দেশ। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের জঙ্গীদের অর্থায়নের সময় ঢাকায় পাকিস্তানি দূতাবাসের কর্মকর্তারা বমাল ধরা পড়েছেন। পাকিস্তানের জঙ্গী মৌলবাদী সন্ত্রাস রফতানির নীতি সারা বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী দক্ষিণ এশীয় গণসম্মিলন-এর সভাপতি বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, ‘পাকিস্তান এখনো ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স-এর ‘গ্রে লিস্ট’ থেকে তাদের নাম মুছে ফেলতে পারেনি। কারণ, জঙ্গীবাদে অর্থায়ন ও তা বহির্বিশ্বে প্রসারিত করার সুবাদে জড়িত রাষ্ট্রগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য প্রতিষ্ঠিত এই আন্তর্জাতিক সংস্থাটির মতে, পাকিস্তান এখনো জঙ্গী অর্থায়ন এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে জঙ্গীবাদের প্রসারণ অব্যাহত রেখেছে। পূর্বে ভারত ও বাংলাদেশ পাকিস্তানের প্রধান লক্ষ্য ছিল, এখন আফগানিস্তান এ তালিকায় নতুন যুক্ত হয়েছে।’

নির্মূল কমিটির সহসভাপতি শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেন, ‘জঙ্গিদের আঘাতে আমরা আমাদের সূর্যসন্তান অভিজিতদের হারিয়েছি। যে সন্ত্রাসীরা অভিজিতের হত্যা করেছে তাদেরকে ২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামাত পৃষ্ঠপোষকতা করে বাংলাদেশকে একটি জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিল। এরা স্বাধীনতার পরপরই বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী কার্যক্রম আরম্ভ করে। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর এদেরকে কঠোর হস্তে দমন করেন। এরা এখনও সঙ্গবদ্ধ হয়ে সক্রিয় হবার চেষ্টা করছে। সম্মিলিতভাবে আমাদের এদেরকে প্রতিহত করতে হবে। আজ বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে মাঠে-ঘাটে ওয়াজ মাহফিল হয় কিন্তু আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ যাত্রা পালা, পালা গান, আলকাপ ইত্যাদি হয় না। আমাদের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জাগ্রত রাখতে হলে ওয়াজ মাহফিল বন্ধ করে এ উপর্যুক্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো চালু করতে হবে।’

মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ভাষাসৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পৌত্রী সমাজকর্মী আরমা দত্ত এমপি বলেন, ‘১৯৭১ সালের মার্চ মাসে অপারেশন সার্চ লাইট ক্র্যাক-ডাউন-এর প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি সেনারা আমার  পিতামহ পাকিস্তান আইন পরিষদের প্রাক্তন সদস্য ভাষাসংগ্রামী ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত (৮৫) ও তাঁর ছেলে দিলীপ দত্তকে (৪৫) গ্রেফতার করে নিয়ে গিয়ে কুমিল্লা ময়নামতি  সেনানিবাসে পিতা-পুত্রকে পনেরো দিনেরও বেশি সময় নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যা করে।’

ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট, ল এন্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ-এর নির্বাহী পরিচালক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল মোঃ আবদুর রশীদ (অব.) বলেন, ‘জঙ্গিবাদের দ্বারা সব সময় সাধারণ মানুষ নিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জঙ্গি হামলার মাধ্যমে সন্ত্রাসীরা বিশ্বের দেশে দেশে শান্তি ও সম্প্রীতি বিনষ্ট করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে চেয়েছে। যেমনটি তারা ২০০৮ সালের ২৬শে নভেম্বর ভারতের মুম্বাইয়ে পরিকল্পিতভাবে ১৭৫ জন নিরীহ মানুষকে হত্যার মাধ্যমে পুরো ভারতীয় উপমহাদেশে একটি সন্ত্রাসী রাজত্ব কায়েম করতে চেয়েছিল। এ হামলার পেছনে মূল কলকাঠি নেড়েছিল পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এবং তাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল লস্কর-ই-তাইয়েবাকে। আমাদের এদেরকে সম্মিলিতভাবে প্রতিহত করতে হবে।’

বাংলা প্রবাহ/এম এম

, , , ,
শর্টলিংকঃ