বাংলাদেশকে ভারতের কূটনৈতিক স্বীকৃতির ৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে ওয়েবিনার

আজ ৬ ডিসেম্বর ২০২১ দুপুর ২টায় বাংলাদেশকে ভারতের কূটনৈতিক স্বীকৃতির ৫০তম বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষেএকাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির এক আন্তর্জাতিক ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। আলোচনার বিষয় ছিল: ‘বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রীর ৫০ বছর’।

সংগঠনের সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই ওয়েবিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন এম পি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের মাননীয় রাষ্ট্রদূত মি. বিক্রম কে দোরাইস্বামী।

আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী দক্ষিণ এশীয় গণসম্মিলন-এর সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননাপ্রাপ্ত ভারতের স্টেটসম্যান-এর সাবেক সম্পাদক, লেখক সাংবাদিক মানস ঘোষ, মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননাপ্রাপ্ত আকাশবাণী কলকাতার সাবেক প্রযোজক কবি পঙ্কজ সাহা, মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননাপ্রাপ্ত বৃটিশ মানবাধিকার নেতা জুলিয়ান ফ্রান্সিস, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ভাষাসংগ্রামী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পৌত্রী মানবাধিকার নেত্রী আরমা দত্ত এমপি, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ অধ্যাপক জ্যোর্তিময় গুহঠাকুরতার কন্যা ড. মেঘনা গুহঠাকুরতা, নির্মূল কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল, ‘সম্প্রীতি’ বাংলাদেশ-এর সদস্য সচিব ও নির্মূল কমিটির চিকিৎসা সহায়ক কমিটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব এবং নির্মূল কমিটির বহুভাষিক সাময়িকী ‘জাগরণ’-এর হিন্দি বিভাগীয় সম্পাদক ভারতের সাংবাদিক তাপস দাস।

সভাপতির প্রারম্ভিক ভাষণে লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী বাংলাদেশের ৩০ লক্ষ শহীদ এবং ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর কয়েক হাজার সদস্যের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে বলেন, ‘’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এদেশের ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারত বাংলাদেশের ১ কোটি সহায়সম্বলহীন শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে, মুক্তিযোদ্ধাদেজর সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করেছে এবং বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য আন্তর্জাতিক জনমত সংগঠিত করেছে। দলমত নির্বিশেষে ভারতের সকল মানুষ বাংলাদেশের পক্ষে একজোট ছিলেন। শরণার্থীদের বিশাল বোঝা বইতে গিয়ে তাদের অনেক কষ্ট সইতে হয়েছে। বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর প্রায় ১৭ হাজার সদস্য শহীদ হয়েছেন। অন্য কোন দেশকে স্বাধীন করার জন্য এ ধরনের আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত বিশ্বের ইতিহাসে বিরল।’

শাহরিয়ার কবির আরও বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দ ঘোষণা করেছিলেন নূতন রাষ্ট্রের মূলনীতি হবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা যা ভারতেরও আদর্শ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বন্ধুত্ব অর্জিত হয়েছে রক্তের মূল্যে। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক অপশক্তি এই বন্ধুত্ব উপেক্ষা করতে চেয়েছে, অস্বীকার করতে চেয়েছে মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অনন্যসাধারণ অবদান। ভারতের সহযোগিতার ভেতর এরা আবিষ্কার করেছে জন্মশত্রু পাকিস্তানকে দ্বিখন্ডিত করবার ষড়যন্ত্র। এরা বিশ্বাস করে পাকিস্তানের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বে। এরা মনে করে পাকিস্তান ইসলামের দুর্গ, ভারত হিন্দু কাফেরদের দেশ। এদেরই প্রভুরা একাত্তরে ইসলামের দোহাই দিয়ে বাংলাদেশে গণহত্যা ও নারী নির্যাতন সহ যাবতীয় মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ সাধারণ মানুষ বার বার এই অপশক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন এবং আগামীতেও স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির যাবতীয় ষড়যন্ত্র পরাজিত করে বাংলাদেশ বিজয়ের মহাসড়কে দীপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে যাবে।’

প্রধান অতিথি মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন এম পি বলেন, ‘৬ ডিসেম্বর আমাদের জাতির জন্য গর্বের দিন। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের জনগণ আমাদের সর্বাত্মক সমর্থন দিয়েছিলেন। ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সদস্যরা মুক্তিযুদ্ধে জীবনদান করেন। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের জন্য জনসমর্থন তৈরি করেন। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর বঙ্গবন্ধু ভারতের সাথে মৈত্রী চুক্তি করেন। বিজয়ের দুই মাসের মধ্যে ভারত তাদের সৈন্যদের ফিরিয়ে নেয়। এভাবে ভারতের সাথে আমাদের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপিত হয়। গত ৫০ বছরে ভারতের সাথে আমাদের যে সম্পর্ক তার পরিধি আরও বাড়াতে হবে। এই সম্পর্ক নাড়ির সম্পর্ক। বেশকিছু অমিমাংসিত বিষয় ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করেছেন। বাকি বিষয়গুলোও অচিরেই সমাধান করা হবে। এ অঞ্চলের মানুষের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য ভারত এবং বাংলাদেশ পৃথিবীর সকল মঞ্চে একসাথে কাজ করে যাচ্ছে। আশা করি আগামী দিনগুলোতে এই সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে। আমাদের জনগণকে বোঝাতে হবে ভারত আমাদের দুর্দিনের বন্ধু। এটি বোঝানোর দায়িত্ব আমাদের সকলের। বাংলাদেশ-ভারতের সুসম্পর্ক সম্পর্কে সারাবিশ্বব্যাপী প্রচার করতে হবে। এ সকল বিষয়গুলো সামনে তুলে ধরার জন্য নির্মূল কমিটিকে ধন্যবাদ জানাই।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমাদের দুই দেশের ভেতর চলাফেরায় বাধা থাকা উচিৎ নয়। আমাদের দুই দেশের ভেতর চলাচলের ক্ষেত্রে ভিসা প্রথা তুলে দেয়া উচিৎ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশ ভারত এক জোট হয়ে কাজ করছে। আমাদের পারস্পরিক যোগাযোগ আরও বাড়াতে হবে।’

নির্মূল কমিটির বহুভাষিক সাময়িকী ‘জাগরণ’-এর হিন্দি বিভাগীয় সম্পাদক ভারতের সাংবাদিক তাপস দাস বলেন, ‘আজকের দিনটি শুধুমাত্র ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী সম্পর্কের জন্য গুরত্বপূর্ণ নয়, বরং এটি একটি ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারকদের কাছে গুরুত্ব পূর্ণ উদাহরণ। আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে এরকম বন্ধুত্বের কোনো উদাহরণ এখনও রচিত হয়নি। দীর্ঘ ৫০ বছরের ইতিহাসে এই সম্পর্ক নানা ভাবে প্রশ্নের মুখে পড়লেও, বিগত ৫০ বছরে প্রতিটি ক্ষেত্রের এই দুদেশের সম্পর্ক বুঝিয়ে দিয়েছে, আগামী দিনে আমাদের একসঙ্গে পথচলা কতটা জরুরী। তবে আমাদেরকে ‘৭১-এর পরবর্তী প্রজন্মকে কিভাবে মুক্তি যুদ্ধের আদর্শে বলীয়ান করা যায় সে নিয়ে আরও কাজ করতে হবে।’

অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক বক্তা ও শ্রোতাদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে নির্মূল কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল বলেন, ‘গত পঞ্চাশ বছরে ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী বন্ধন যেমন অটুট ছিল তেমনি ভবিষ্যতেও সকল বাধা বিঘ্ন ও ষড়যন্ত্রকে উপেক্ষা করে আমাদের এই বন্ধন অটুট থাকবে বলে আমি বিশ্বাস করি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান চিরস্মরণীয়। এই ঋণ কখনও শোধ করার নয়। ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক রক্তের সম্পর্ক। কারণ মুক্তিযুদ্ধে উভয় দেশের নাগরিক রক্ত দিয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছেন। আমাদের এই বন্ধুত্ব, এই সম্পর্ক চিরকাল অটুট থাকবে। রক্তের বন্ধনে রচিত বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী কখনও ছিন্ন করা যাবে না’।

বাংলা প্রবাহ/এম এম

, , ,
শর্টলিংকঃ