আন্তর্জাতিক ‘গণহত্যা দিবস’ উপলক্ষে নির্মূল কমিটির আন্তর্জাতিক ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত

আজ যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস পালন করেছে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। এ উপলক্ষে আজ বিকেলে এক অনলাইন আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয় যেখানে ১৪টি দেশের ১৯ জন গণহত্যার ভুক্তভোগী, গণহত্যা বিষয়ক গবেষক, আইনপ্রণেতা, মানবাধিকার ও শান্তিকর্মী আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।

নির্মূল কমিটির সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরের সভাপতিত্বে এবং মুক্তিযুদ্ধে শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর পুত্র নির্মূল কমিটি আইটি সেলের সভাপতি মানবাধিকার নেতা আসিফ মুনীর তন্ময়- এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশের তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ডঃ হাসান মাহমুদ এমপি।

আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রাক্তন সদস্য পর্তুগালের রাজনীতিবিদ ও মানবাধিকার নেতা পাওলো কাসাকা, যুক্তরাষ্ট্রের ‘জেনোসাইড ওয়াচ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ড. গ্রেগরি এইচ. স্ট্যান্টন, বার্মায় রোহিঙ্গা গণহত্যা তদন্তে নাগরিক কমিশন-এর সদস্য মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননাপ্রাপ্ত বৃটিশ মানবাধিকার নেতা জুলিয়ান ফ্রান্সিস, পাকিস্তানের নারী অধিকার ও শান্তি কর্মী, ‘তেহরিক-ই-নিশওয়ান’-এর সভাপতি ধ্রুপদী নৃত্যশিল্পী সীমা কেরমানি, সুইডেনের ইউনাইটেড নেশনস অ্যাসোসিয়েশন-এর মানবাধিকার নেত্রী এ্যাটর্নি মোনা স্ট্রিন্ডবার্গ, যুক্তরাজ্যের ওয়ার্ল্ড সিন্ধি কংগ্রেস-এর সাধারণ সম্পাদক মানবাধিকার নেতা ড. লাকুমাল লুহানা, পোল্যান্ডের মানবাধিকার কর্মী, ‘নেভার এগেইন’-এর নেতা নাটালিয়া সিনায়েভা পাঙ্কোভস্কা, তুরস্কের টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি ফোরাম ফর হিউম্যানিটি-এর সভাপতি লেখক চলচ্চিত্রনির্মাতা ফেরহাত আতিক, জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের প্রতিনিধি পশতুন নেতা ফ্রান্সের ফজল-উর রেহমান আফ্রিদি, উইঘুর গণহত্যার ভুক্তভোগী উজবেকিস্তানের সাংবাদিক সাবো কসিমোভা, পোল্যান্ডে নির্বাসিত আফগান মানবাধিকার নেতা সবুর শাহ দাউদজাই, অস্ট্রেলিয়ার আফগান মানবাধিকার কর্মী অ্যার্টনি কোবরা মোরাদি, যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত ইরানি নারী অধিকার কর্মী সাংবাদিক বানাফসে যানদ, ভারতীয় লেখক, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রিয়জিৎ দেব সরকার। সম্মেলনে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন নির্মূল কমিটির বেলজিয়াম শাখার সাধারণ সম্পাদক মানবাধিকার নেত্রী আনার চৌধুরী।

সম্মেলনের শুরুতে সভাপতি শাহরিয়ার কবির জানান, ‘এই সম্মেলন আজ ব্রাসেলস-এ ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সামনে হওয়ার কথা ছিল। যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পর করোনা মহামারীর আকস্মিক বিস্তারের কারণে প্রকাশ্য সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ায় অনলাইনে এই সম্মেলন আয়োজন করা হচ্ছে।’

এরপর সম্মেলনের পক্ষ থেকে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্টকে যে স্মারকপত্র দেয়া হবে সেটি তিনি উত্থাপন করেন, যেখানে বাংলাদেশের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, বিশ্বব্যাপী চলমান গণহত্যার নিন্দা এবং মায়ানমারে গণহত্যার ভিকটিম বাংলাদেশের আশ্রয়গ্রহণকারী রোহিঙ্গাদের দ্রুত স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের কার্যকর ভূমিকা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। সম্মেলনে ১৪টি দেশের নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দ এই স্মারকপত্র গ্রহণে সর্বসম্মত মত প্রকাশ করেন।

সভাপতির প্রারম্ভিক ভাষণে শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি বাংলাদেশের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলমান গণহত্যা বন্ধের দাবিতে বিভিন্ন দেশের সমমনা সংগঠনগুলোকে সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে আন্তর্জাতিক জনমত সংগঠনের জন্য আন্দোলন করছে। আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস উপলক্ষে আজকের এই সম্মেলন তারই ধারাবাহিকতায় আয়োজিত হয়েছে। আমরা আশা করব বিশ্বশান্তি নিরাপদ এবং ধর্ম-বর্ণ-জাতি-ভাষা-লিঙ্গ নির্বিশেষে সব মানুষের সমান অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আরও জোরালো ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’

সম্মেলনের প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাননীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপি বলেন, ‘১৯৭১ সালে ৯ মাসের গণহত্যাযজ্ঞে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী তাদের দোসর জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য সাম্প্রদায়িক দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশে এক বীভৎস গণহত্যা সংঘটিত করেছে। আমি বিশ্বাস করি এই গণহত্যা অবশ্যই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগেও বিশ্বের কোথাও না কোথাও গণহত্যা সংঘটিত হচ্ছে এবং অবিশ্বাস্যভাবে বর্তমানে বিশ্বে শরণার্থী সংখ্যা সবচেয়ে উঁচুতে গিয়ে ঠেকেছে। মায়ানমারে গণহত্যার ফলে ১১ লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে এবং নবজাতক জন্মের ফলে এই সংখ্যা প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে যা ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মায়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রতি দায়িত্বশীল নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত দায়িত্বশীল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের মায়ানমারে প্রত্যাবার্সনের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা। বিভিন্ন রাষ্ট্র বাংলাদেশকে অনবরত মায়ানমারের রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে বলছে, কিন্তু তারা নিজেরা এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। অস্ত্র ব্যবসার মতো বিষয়গুলো নিয়ে বিভিন্ন দেশে সংঘাতের সৃষ্টি হচ্ছে ফলে গণহত্যা ও শরণার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বাংলাদেশের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন প্রত্যাশা করছি।’

পাকিস্তানকে একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করে বেলজিয়ামের সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরাম-এর নির্বাহী পরিচালক ও প্রাক্তন এমইপি পর্তুগিজ রাজনীতিবিদ পাওলো কাসাকা বলেন, ‘২০১৫ সালে আজকের এই দিনটিকে জাতিসংঘ ‘আন্তর্জাতিক গণহত্যা ও গণহত্যা প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। বাংলাদেশের গত ৫০ বছর পূর্বে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ৩০ লক্ষ বাঙালিকে নির্মমভাবে হত্যা করে। নিকট অতীতে এমন ভয়াবহ গণহত্যা বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেনি। অথচ পাকিস্তান কোন প্রকার বিচারের সম্মুখীন হয়নি আজও। যার কারণে দেশটি এখনো গণহত্যা সংঘটিত করছে সিন্ধি ও বালুচ প্রদেশে। তারা এখন বিশ্বের একমাত্র সন্ত্রাসী উৎপাদনকারী এবং রপ্তানীকার রাষ্ট্র। সারা বিশ্বের শান্তি বিঘ্নিতকারী হিসেবেও পাকিস্তানের শাস্তি হওয়া উচিত।’

জাতিসংঘ তার মূল লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে মন্তব্য করে জেনোসাইড ওয়াচ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও সভাপতি অধ্যাপক ড. গ্রেগরি এইচ. স্ট্যান্টন বলেন, ‘১৯৪৫ সাল থেকে গৃহযুদ্ধে পাঁচ কোটি মানুষ মারা গেছে। গণহত্যায় এক কোটি মানুষ মারা গেছে। এই গণহত্যাগুলো মূলত দেশের সরকার দ্বারাই সংঘটিত হয়। যা রোধ করতে জাতিসংঘ কার্যত ব্যর্থ হয়েছে।’

দশটি বিষয়কে জাতিসংঘের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে অধ্যাপক গ্রেগরি উল্লেখ করেন ‘১. পাঁচটি দেশের ভেটো ক্ষমতা নিরাপত্তা পরিষদকে অচল করে দিয়েছে, ২. সাধারণ পরিষদের ক্ষমতায়নের জন্য শান্তির জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়া ভুলে গেছে, ৩. জাতিসংঘ জাতি-রাষ্ট্রের একটি সংগঠন, “জনগণের” নয়, ৪. জাতি-রাষ্ট্রগুলি সংখ্যালঘুদের তাদের অভ্যন্তরীণ এখতিয়ারের মধ্যে বলে গণ্য করে, ৫. জাতীয় নীতি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ দ্বারা নির্ধারিত হয়, ৬. ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অফ জাস্টিস গণহত্যার কনভেনশনকে বিকৃত করেছে ৭. জাতিসংঘের কোন স্থায়ী সেনাবাহিনী নেই কারণ আর্টিকেলের ৪৩-৪৭ বাস্তবায়ন করা হয়নি, ৮. পার্ম-৫ এর নেতারা গণহত্যাকারি রাষ্ট্রগুলিকে রক্ষা করেন এবং গণহত্যা প্রতিরোধ বা বন্ধ করার রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব রয়েছে, ৯. এমনকি গণহত্যা প্রতিরোধের জন্য জাতিসংঘের বিশেষ উপদেষ্টাও মনে করেন যে গণহত্যা শব্দটি কেবল মাত্র একটি আদালতের রায়ের পরে প্রয়োগ করা যেতে পারে এবং ১০. আদালত গণহত্যার রায়গুলো অনেক দেরীতে দেয়।’

বার্মায় রোহিঙ্গা গণহত্যা তদন্তে নাগরিক কমিশন-এর সদস্য মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননাপ্রাপ্ত বৃটিশ মানবাধিকার নেতা জুলিয়ান ফ্রান্সিস বলেন, ‘বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমি বাংলাদেশে ভয়াবহ গণহত্যা প্রত্যক্ষ করেছি। আমি দেখেছি কিভাবে ভয়ে আতঙ্ক হয়ে হাজার হাজার নারী পুরুষ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। নারী-পুরুষ-শিশু বৃদ্ধ সকলেই নৃশংসতায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কেননা তাদের সামনে হত্যা করা হয়েছিল তাদের প্রিয়জনদের।’

রোহিঙ্গা গণহত্যার নিন্দা জানিয়ে এবং শরণার্থীদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে জাতিসংঘকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়ে জুলিয়ান ফ্রান্সিস আরও বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কয়েক দশক ধরে রোহিঙ্গা সমস্যাটিকে অবহেলা করেছে এবং এখন কিছু দেশ আলোচনায় বাধা দিচ্ছে। কফি আনান কমিশন রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবার্সনের যে প্রতিবেদন দাখিল করেছিল তার কোন অংশই মিয়ানমার সরকার বাস্তবায়ন করেনি। মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবার্সনের জন্য কোন প্রকার আস্থার জায়গা তৈরি করতে না পারায় রোহিঙ্গা শরণার্থীরা মিয়ানমার ফিরে যেতে আগ্রহী হচ্ছে না। সুতরাং রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবার্সনের ব্যাপারে দ্রুত বিশ্ব সম্প্রদায়কে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।’

পাকিস্তানের নারী অধিকার ও শান্তি কর্মী, ‘তেহরিক-ই-নিশওয়ান’-এর সভাপতি ধ্রুপদী নৃত্যশিল্পী সীমা কেরমানি বলেন, ‘পাকিস্তানের নারীদের পক্ষে আমরা ১৯৭১-এর গণহত্যার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি। পাকিস্তানের উচিত রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশের কাছে গণহত্যা, নারী নির্যাতন ও যুদ্ধাপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। হামুদুর রহমান কমিশনের রিপোর্টে বাংলাদেশে গণহত্যাকারী পাকিস্তানি সমরনায়কদের চিহ্নিত এবং বিচারের কথা বলা হয়েছে। পাকিস্তানের ধর্মীয় সাম্রাজ্যবাদী নীতির কারণে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং গণহত্যায় এত বিপুলসংখ্যক বাঙালি নিহত হয়। পাকিস্তানের সেই নীতি এখনও অব্যাহত যা আমরা প্রত্যক্ষ করছি বিভিন্ন ক্ষেত্রে পাকিস্তানের অমুসলিম জনগোষ্ঠীর অধিকারহরণ, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ওপর দমনপীড়ন ও নির্যাতনের মাধ্যমে। পাকিস্তানের পাঠ্যবইতে ভিন্ন ধর্মের মানুষদের প্রতি বিদ্বেষমূলক বক্তব্য রয়েছেÑ আমরা যার নিন্দা করি।’

বাংলাদেশের গণহত্যার দায়ে পাকিস্তানকে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানিয়ে সুইডেনের ইউনাইটেড নেশনস অ্যাসোসিয়েশন-এর মানবাধিকার নেত্রী এ্যাটর্নি মোনা স্ট্রিন্ডবার্গ বলেন, ‘বাংলাদেশের গণহত্যার ৫০ বছর পার হয়ে গেছে অথচ এখনো পাকিস্তানি গণহত্যাকারীদের বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব হয়নি। কেননা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখনো এই গণহত্যাকে স্বীকৃতি দেয়নি। আমাদের উচিৎ বাংলাদেশের এহেন বর্বর গণহত্যাকে বৈশ্বিক স্বীকৃতির জন্য আওয়াজ তোলা। গণহত্যাকারীদের বিচার না হলে তারা পুনরায় গণহত্যা সংঘটিত করার সাহস পায়।’

যুক্তরাজ্যের ওয়ার্ল্ড সিন্ধি কংগ্রেস-এর সাধারণ সম্পাদক মানবাধিকার নেতা ড. লাকুমাল লুহানা বলেন, ‘পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাংলাদেশে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ গণহত্যা চালিয়ে ত্রিশ লক্ষ বেসামরিক নাগরিককে নির্যাতন ও হত্যা করে এবং তিন লক্ষ নারীকে ধর্ষণ করে। মানব ইতিহাসে এই গণহত্যাটি অন্যতম বড় একটি গণহত্যা। অথচ গণহত্যাকারী পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এই জঘন্য অপরাধের জন্য কোন সাজা পায়নি। ফলশ্রুতিতে তারা খোদ পাকিস্তানের সিন্ধি এবং বালুচ প্রদেশের জনগণের ওপর গণহত্যা সংঘটিত করেছে। বর্তমানে সিন্ধি জনগণ পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সংস্থা কর্তৃক সংঘটিত একটি নিয়মতান্ত্রিক, নির্মম এবং সুদূরপ্রসারী গণহত্যার মুখোমুখি হচ্ছে।’

বাংলাদেশের গণহত্যার বিশদ বিবরণ তুলে ধরার পাশাপাশি সিন্ধি ও বালুচ প্রদেশে চলমান গণহত্যা বন্ধে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি আরও বলেন, ‘গণহত্যার স্বীকৃতি দিয়ে হত্যাকারীদের বিচার না করা গেলে তারা পুনরায় গণহত্যা সংঘঠিত করতে উৎসাহিত হয় যার প্রমাণ খোদ পাকিস্তান। সুতরাং জাতিসংঘ ও বিশ্বসম্প্রদায়কে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সমস্ত গণহত্যার স্বীকৃতি দিয়ে গণহত্যাকারীদের অবিলম্বে বিচারের মুখোমুখি করার আহ্বান জানাচ্ছি।’

পোল্যান্ডের মানবাধিকার কর্মী, ‘নেভার এগেইন’-এর নেতা নাটালিয়া সিনায়েভা পাঙ্কোভস্কা বলেন, ‘যেখানে পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল সেই পোল্যান্ড থেকে আমি বাঙালি ভাই বোনদের ন্যায়সঙ্গত দাবীর সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করছি। আমি হলোকস্ট গণহত্যা নিয়ে গবেষণা করছি এবং পোল্যান্ড ভিত্তিক ‘নেভার এগেইন’-এর একজন সদস্য। গণহত্যার স্বীকৃতি মানুষের মাঝে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করে। আমি মনে করি, বাংলাদেশের গণহত্যাসহ পৃথিবীর সমস্ত গণহত্যাগুলোর স্বীকৃতি অতীব প্রয়োজন কেননা গণহত্যাকারীদের বিচার করতে হলে গণহত্যা স্বীকৃতি দরকার আর বর্বর গণহত্যাকারীদের বিচার না হলে পৃথিবী বারংবার গণহত্যার পুনরাবৃত্তি দেখতে থাকবে।’

গণহত্যাকে নিন্দা জানিয়ে টুয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি ফোরাম ফর সেকুলার হিউম্যানিজম, তুরস্ক-এর সভাপতি, চলচ্চিত্র নির্মাতা, লেখক ফেরহাত আতিক বলেন, ‘প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই মানুষ নিজেদের আদিমতা ও অজ্ঞতার কারণে গণহত্যা সংঘটিত করে এসেছে। মানুষ নিজেদের মধ্যে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছে নানা অজুহাতে। এমন বর্বর হত্যাকাণ্ড এই আধুনিক যুগে কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। আমরা এহেন অজ্ঞতা এবং আদিমতার অবসান আশা করি। আর কিছু গণহত্যাকারীদের গণহত্যা করাটা নেশায় পরিণত হয়েছে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ‘৭১ সাল বাংলাদেশ গণহত্যার গণহত্যা প্রত্যক্ষ করেছে। এখন সময় এসেছে সকলে একজোট হয়ে গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার। সময় এসেছে বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যার বৈশ্বিক স্বীকৃতি দেয়ার। আশা করি সকল প্রচেষ্টায় এই স্বীকৃতি অর্জনে করতে আমারা সক্ষম হব।’

জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের প্রতিনিধি পশতুন নেতা ফ্রান্সের ফজল-উর রেহমান আফ্রিদি পাকিস্তানের পশতুন জনগোষ্ঠীর ওপর পাঞ্জাবী পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর অত্যাচার ও নির্যাতনের সামগ্রিক চিত্র উপস্থাপন করে বলেন, ‘১৯৭১ সালে বাংলাদেশের গণহত্যার মত পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদ নীতি এখনও অব্যাহত রয়েছে।’

উইঘুর গণহত্যার ভুক্তভোগী উজবেকিস্তানের সাংবাদিক সাবো কসিমোভা বলেন, ‘উইঘুর সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী সাবো কাসিমোভা উইঘুর সম্প্রদায়ের উপর চীনের সরকারের চলমান দমন-পীড়ন ও গণহত্যার স্বীকৃতি চেয়ে বলেন, ‘আমার সম্প্রদায়ও চায় গণহত্যাকে স্বীকৃতি দেওয়া হোক এবং ন্যায়বিচার চাওয়া হোক। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, চীন এমন একটি রাষ্ট্র যারা মানবাধিকার লংঘন করে, গণহত্যা সংঘটিত করে অথচ তারা জাতিসংঘের ভেটো প্রদানকারী ক্ষমতাধর একটি দেশ। মানবাধিকার লংঘন ও গণহত্যা সংগঠিত করার জন্য ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো কোন শাস্তি বা বিচার হয় না। যা আমাদের জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের। গণহত্যার শিকার একটি জাতি হিসেবে আমরা উইগুররা বাংলাদেশী জনগণের গভীর বেদনা বুঝতে পারি। যারা গণহত্যার শিকার এবং ভুক্তভোগী আমরা তাদের পাশে আছি এবং থাকব। পরাশক্তি চীন এবং পাকিস্তান গণহত্যার অপরাধ প্রতিরোধ এবং দায়ীদের শাস্তি সম্পর্কিত ১৯৪৮ সালের চুক্তি লঙ্ঘন করে।’

গণহত্যায় নিহতদের স্মরণ ও শ্রদ্ধা জানিয়ে অস্ট্রেলিয়ার আফগান মানবাধিকার কর্মী অ্যার্টনি কোবরা মোরাদি বলেন, ‘আজ গণহত্যা দিবসের একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দ্বারা গণহত্যার শিকার বাঙালিদের বিশেষভাবে স্মরণ করছি। আমি আফগানিস্তানের হাজারা জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর সদস্য। বাঙালিদের মতো হাজারাদেরও নিপীড়নের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, যা সঠিকভাবে তদন্তের মাধ্যমে নথিভুক্ত করা হয়নি।’

হাজরা সম্প্রদায়ের গণহত্যার করুণ ইতিহাস ও পরিসংখ্যান তুলে ধরে আফগানিস্তানের চলমান গণহত্যার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে তিনি আরো বলেন, ‘আন্তর্জাতিক গণহত্যা স্মরণ ও প্রতিরোধ দিবসে আমি আফগানিস্তানে চলমান নির্যাতনের প্রমাণ নথিভুক্ত, সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য জাতিসংঘকে অবশ্যই একটি স্বাধীন তদন্ত শুরু করার আহ্বান জানাচ্ছি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত আফগানিস্তানে সাধারণ আফগানদের মানবাধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য এখনই কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।’

যুক্তরাষ্ট্রের ইরানি নারী অধিকার কর্মী সাংবাদিক বানাফসে যানদ ইরানের মুক্তচিন্তার মানুষ, বুদ্ধিজীবী, নারী অধিকার, বাক স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর ইরানের বর্তমান সরকারের অত্যাচারের বিবরণ তুলে ধরেন।

আফগানদের বিভীষিকাময় অবস্থার বিবরণ তুলে ধরে পোল্যান্ডে নির্বাসিত আফগান মানবাধিকার নেতা সবুর শাহ দাউদজাই বলেন, ‘আজ আফগানিস্তানে যে সমস্ত আফগানরা রয়ে গেছেন তারা কিভাবে এবং কোন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছেন তা ভাষায় বর্ণনা করা যাবে না। ভাগ্যক্রমে যে সমস্ত আফগানরা পোল্যান্ড, আমেরিকা, কানাডা, জার্মানি, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স এবং বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রের সহায়তায় যারা বেঁচে রয়েছেন তাদের গল্পগুলিও হৃদয়বিদারক। আফগানিস্তানের গল্প অনেকের কাছেই নতুন নয়। তবে প্রতিটি ঘটনার সাক্ষী হওয়া এখানে সবার জন্য নতুন। তালেবান, একটি সন্ত্রাসী দল যারা ২০০৪ সাল থেকে প্রতিদিন অসংখ্য আফগানকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে হত্যা ও গুপ্ত হত্যা করেছে।’

তিনি বলেন, ‘তারা আফগানিস্তানে বসবাসকারী কোন উপজাতির প্রতি কোন দয়া করে না। তালেবানরা পশতুনের ৭০ ভাগেরও বেশি মানুষকে হত্যা করেছে যা অনেকের কাছেই মর্মান্তিক হতে পারে।’

আফগানিস্তানের এখনো যারা গণহত্যার শিকার হচ্ছেন সেই সমস্ত মানুষের জন্য কিছু করার এবং তালেবানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়ে সম্মেলনে উপস্থিত বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার নেতা ও বিশ্ব সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্যে করে তিনি আরও বলেন, ‘এখনো যারা আফগানিস্তানে গণহত্যার শিকার হচ্ছে দয়া করে তাদের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য আপনাদের দরজা প্রশস্ত করুন।’

১৯৭১ সালে গণহত্যার বীভৎস বিবরণ তুলে ধরে ভারতীয় লেখক, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রিয়জিৎ দেব সরকার বলেন, ‘পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ’৭১ সালে তাদের দোসর রাজাকার আলবদরদের নিয়ে বাংলাদেশে যে গণহত্যা সংঘটিত করে তা বর্ণনাতীত। তাদের এহেন বর্বরতার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি জাতিকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা।’

গণহত্যাকারীদের বিচার ও একাত্তরের গণহত্যার বৈশ্বিক স্বীকৃতি দাবি করে সম্মেলনে তিনি উল্লেখ করেন, ‘একাত্তরে যারা গণহত্যার শিকার হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন তারা আজও প্রতীক্ষায় আছেন ন্যায় বিচারের জন্য। গণহত্যাকারীদের বিচার না হলে শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে না।’

অনলাইন আন্তর্জাতিক সম্মেলনের বিশিষ্ট অতিথিদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে সর্বইউরোপীয় নির্মূল কমিটির সভাপতি মানবাধিকার নেতা তরুণকান্তি চৌধুরী তার স্বাগত বক্তব্যে বলেন, ‘একাত্তরের গণহত্যার পাঁচ দশক পরও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রয়োজন। স্বীকৃতি ছাড়া গণহত্যার শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার দেওয়া সম্ভব নয়।’

বাংলা প্রবাহ/এম এম

, ,
শর্টলিংকঃ