শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের উপলব্ধি – অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব

আজ শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। ’৭১-এর এইদিনে পরাজয় অত্যাসন্ন বুঝতে পেরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এদেশীয় দোসররা তালিকা ধরে রাতের আঁধারে উঠিয়ে নিয়ে যায় দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের। বিজয়ের পর রায়েরবাজারের বধ্যভূমিতে আবিষ্কৃত হয় তাদের মৃতদেহ। বাসা থেকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর বধ্যভূমিতে নিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করার আগ পর্যন্ত তাদের আটকে রাখা হয়েছিল মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে, করা হয়েছিল নির্মম নির্যাতন। পৃথিবীর ইতিহাসে গণহত্যার অজস্র উদাহরণ রয়েছে। পৃথিবীর নানা জাতিকেই নানা সময় এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এটাই আমাদের পৃথিবীর রূঢ় বাস্তবতা। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাপারটা একেবারেই আলাদা। পৃথিবীর আর কোন দেশে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস বলে কোন দিবসের অস্তিত্ব নেই, যেদিনটিতে গোটা জাতিকে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করতে হয় অকালে হারিয়ে যাওয়া তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের।

’৭১-এর অবরুদ্ধ বাংলাদেশে ২৫ মার্চ রাতের অপারেশন সার্চলাইট থেকে শুরু করে ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্সে প্রকাশ্যে নির্লজ্জ আত্মসমর্পণের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত টানা গণহত্যা চালিয়েছিল। মাত্র নয় মাসে শহীদ হন ত্রিশ লাখ মানুষ। এমন গণহত্যা আর মানবতাবিরোধী অপরাধ পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন। তারপরও আলাদাভাবে স্মরণ করতে হয় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের। এর কারণ এভাবে টার্গেট করে কোন দেশের পেশাজীবী আর বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার আলোকিত মানুষগুলোকে হত্যা করার ঘটনা কখনই দেখেনি এ বিশ্ব। যে আলোকিত মানুষগুলোকে স্বাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল, যাদের দিকনির্দেশনা, প্রজ্ঞা আর সুবিবেচনাকে পুঁজি করে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল তার অভীষ্ট লক্ষ্যে বাছাই করে করে তাদেরই হত্যা করা হয়েছিল, যাতে দেশটা মেধাশূন্য হয়ে পড়ে। আর এরই ধারাবাহিকতায় বিজয়ের সাড়ে তিন বছরের মাথায় সপরিবারে হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধুকে। মেধাশূন্য জাতিটিকে এভাবেই সঙ্গে সঙ্গে নেতৃত্বশূন্য করে তুলে দেয়া হয় একের পর এক পাকিস্তানী ঘরানার শাসকের হাতে, যারই ফলশ্রুতিতে জেনারেল জিয়া, জেনারেল এরশাদ কিংবা খালেদা জিয়ার সময়ের বাংলাদেশের সারমর্ম হচ্ছে একশ’ মিটার স্প্রিন্টে পেছনে ছুটে চলা।

বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকাণ্ডের রেশ কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশের দীর্ঘ সময় লেগেছে। আর এখনও যে আমরা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পেরেছি তেমনটাও হলফ করে বলা সম্ভব না। আমি পেশায় যেহেতু চিকিৎসক এবং যদিও এই পেশায় আমার চলার শুরু বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-ের দুই যুগেরও বেশি সময় পর, পেশায় দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বের শূন্যতায় কিভাবে আজও ধুঁকছে আমাদের স্বাস্থ্য খাত তা আমি হাড়ে হাড়ে টের পাই। চলমান কোভিড প্যান্ডেমিকে অনেক সময় তা টের পেয়েছে পুরো বাংলাদেশই। এ কথা অনস্বীকার্য যে, কোভিড-১৯ প্যান্ডেমিকে আমাদের স্বাস্থ্য খাতের অর্জন অনেক। এত অল্প পরিসরের এত ঘনবসতির বাংলাদেশে এত কোটি মানুষকে কোভিড থেকে সামলে রাখাটা চাট্টিখানি কথা নয়। বিশেষ করে যখন আমাদের নিজস্ব কোন ভ্যাকসিন নেই। কিন্তু একটু যদি গভীরভাবে চিন্তা করা যায় খেয়াল করে দেখবেন এ খাতে আমাদের যা কিছু অর্জন তার সবকিছুই শুধু ঐ একজন শেখ হাসিনার জন্যই। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য খাত একেবারেই পারফর্ম করেনি এমন মন্তব্য অবশ্যই অসত্য এবং স্বাস্থ্য খাতের প্রতি অবমাননাকর তো বটেই। তারপরও এ কথা মানতেই হবে যে, এত সমর্থন আর সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে অমন বিশ্বনন্দিত নেতৃত্ব থাকায় আমাদের স্বাস্থ্য খাত আরেকটু ভাল পারফর্ম করবে এটুকু প্রত্যাশা এ জাতির ছিল এবং জাতির সেই প্রত্যাশা আমাদের স্বাস্থ্য খাত সেভাবে পূরণে সক্ষম হয়নি। আমার বিবেচনায় এর জন্য আমরা দুর্নীতি থেকে শুরু করে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য, আমলাতন্ত্র ইত্যাদি অনেক কিছুকেই দায়ী করে প্রশান্তি পেতে পারি ঠিকই, কিন্তু এর মূল কারণ এই পেশায় ভিশনারি নেতৃত্বের সঙ্কট। যে ডাঃ আব্দুল আলীম চৌধুরী কিংবা ডাঃ ফজলে রাব্বিরা একদিন নিজ পেশার উর্ধে উঠে গোটা দেশের দিশারী হয়ে উঠেছিলেন, তাদের উত্তরসূরিরা আজ বড়ই ‘টানেল ভিশনড’। ফলে আমরা অনেক সময়ই আমাদের চেনা আশপাশটাকে চিনতে ভুল করি। আমাদের মেধাবী পরবর্তী প্রজন্ম আরও ওয়াইড ভিশনড হোক, আগামীর ডাঃ আব্দুল আলীম চৌধুরী আর ডাঃ ফজলে রাব্বিদের প্রজ্ঞায় আলোকিত হোক আমাদের স্বাস্থ্য খাত এতটুকুই প্রত্যাশা। কারণ বাদবাকিটুকু যেহেতু হয়েই আছে, এই শূন্যতাটুকু পূরণ হলেই এ খাতের আলোয়ও উদ্ভাসিত হবে বাংলাদেশ।

লেখক: অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)

ডিভিশন প্রধান, ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজি ডিভিশন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
আঞ্চলিক পরামর্শক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা
সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ
অর্থ সম্পাদক, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।

বাংলা প্রবাহ/এম এম

, ,
শর্টলিংকঃ