মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রেরণা ছিল বাঙালিত্বের চেতনা: শাহরিয়ার কবির

আজ ১৬ ডিসেম্বর ২০২১ বিকেল ৩টায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তীতে ‘বাঙালির অবিস্মরণীয় বিজয়’ শীর্ষক ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি কর্তৃক আয়োজিত আন্তর্জাতিক ওয়েবিনার সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি লেখক সাংবাদিক চলচ্চিত্রনির্মাতা শাহরিয়ার কবির একথা বলেন।

নির্মূল কমিটির আইটি সেলের সভাপতি শহীদসন্তান আসিফ মুনীর তন্ময়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে প্রধান বক্তার বক্তব্য প্রদান করেন নির্মূল কমিটির সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির।

আলোচনায় বক্তব্য প্রদান করেন নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় সদস্য শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের পুত্র শহীদসন্তান তৌহিদ রেজা নূর, শহীদ শেখ আব্দুস সালামের কন্যা শহীদসন্তান শেখ সালমা নার্গিস, শহীদ কাজী শামসুল হক-এর পুত্র শহীদসন্তান কাজী সাইফউদ্দিন আব্বাস, নির্মূল কমিটির অস্ট্রেলিয়া শাখার উপদেষ্টা মুক্তিযোদ্ধা কামরুল হাসান খান, নির্মূল কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক উপাধ্যক্ষ কামরুজ্জামান, সর্ব ইউরোপীয় নির্মূল কমিটির সভাপতি সমাজকর্মী তরুণ কান্তি চৌধুরী, নির্মূল কমিটির রংপুর শাখার সভাপতি ডাঃ মফিজুল ইসলাম মান্টু এবং নির্মূল কমিটির খুলনা শাখার সহ-সভাপতি সাংবাদিক গৌরাঙ্গ নন্দী।

প্রধান বক্তার বক্তব্যে নির্মূল কমিটির সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘বেশিররভাগ মুক্তিযোদ্ধাই যারা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছেন তাঁরা জীবন বাজী রেখেই মুক্তিযুদ্ধে গেছেন, যুদ্ধ করেছেন। আমিও বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম কোনওদিন বেঁচে ফিরব এমনটা আশা করিনি। আমাদের অনেক সহযোদ্ধা যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। আমরা বিজয় অর্জন করেছি। মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হবে। যা মুক্তিযুদ্ধের সময় বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার এই বোধগুলো যুদ্ধের মধ্য দিয়ে হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি বরং বাঙালি জাতির ইতিহাস যখন থেকে শুরু হয়েছে তখন থেকেই আমাদের সমাজে ছিল। বিভিন্ন সময়ে আমাদের সমাজে বিভিন্ন ধর্ম এসেছে। সবগুলো ধর্মকেই বাঙালি নিজেদের মতন করে গ্রহণ করেছে। বাঙালি সংস্কৃতির প্রভাব সব ধর্মেই আছে যা আমাদের ধর্মগুলোর মধ্যে একটা সমন্বয়ের জায়গা তৈরি করেছে। বাঙালি সংস্কৃতি অবিভাজ্য। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রেরণা ছিল এই বাঙালিত্বের চেতনা। এই চেতনা দিয়েই আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি এবং যুদ্ধে জয়ী হয়েছি। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতার নজির পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয়টি নেই।’

লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির আরও বলেন, ‘আমাদের অনেক সাফল্য আছে, অনেক অর্জন আছে কিন্তু ’৭৫-এর পর থেকে বেশিরভাগ সময় মুক্তিযুদ্ধবিরোধীরা ক্ষমতায় থেকে আমাদের অর্জনগুলোকে এক এক করে নস্যাৎ করেছে। প্রথমবার বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার শুরু করলেন এবং দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করলেন। এতে আমরা আংশিক সাফল্য অর্জন করলেও আমাদের মূল যে দাবি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সংবিধান পুনঃপ্রবর্তন তাতে আমরা পুরোপুরি সফল হইনি। এই দাবি আদায়ের জন্য তরুণদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দিতে হবে।’

শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের পুত্র শহীদসন্তান তৌহিদ রেজা নূর বলেন, ‘১৯৭২-এর সংবিধানে বিধৃত আছে আমাদের লালিত স্বপ্নগুলো কী ছিল, কী ধরনের সমাজ আমরা চাই। মুক্তিযুদ্ধের মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা এবং মুক্তিযুদ্ধের অগ্রগণ্য নেতৃবৃন্দকে হত্যার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সমাজ গড়ে তোলার আনুষ্ঠানিক, প্রশাসনিক কাজ শুরু হয়।’

শহীদসন্তান তৌহিদ রেজা নূর আরও বলেন, ‘আজকে ২০২১ সালে যেখানে আমরা মহান মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছরের কথা বলছি, সেটি আসলে এই অঞ্চলে সংঘটিত গণহত্যারও পঞ্চাশ বছর, যা সংঘটিত হয়েছিল ১৯৭১ সালে। কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে এর স্বীকৃতি আজও আমরা পাইনি। রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রায় ৪৬ বছর পরে এসে একটি ‘গণহত্যা দিবস’ ঘোষণা করতে পেরেছি আমরা। এর কারণ মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা যে স্বপ্নগুলো লালন করছিলাম সে জায়গা থেকে বেরিয়ে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী মানুষেরা তাদের জন্য স্বর্গরাজ্য তৈরির প্রচেষ্টা নিয়েছিল। কী পাঠ্যপুস্তকে, কী প্রশাসনে, গণমাধ্যামে, সামগ্রিকভাবে সব জায়গায়। একজন শহীদের সন্তান হিসেবে এখনকার তরুণদের মাঝে তখন আশা ও আশঙ্কার দুটো জায়গাই দেখি। আশার জায়গাটি হলো, অনেকেই মুক্তিযুদ্ধকে মনে রেখে, তার গুরুত্ব বুঝতে পেরে নানাভাবে সক্রিয়। আবার একটি অংশ বিভ্রান্ত হয়েছে নানাভাবে। তারা আমাদের জাতীয় জীবনে কোন অংশটি শ্রদ্ধার, কোন অংশটি ঘৃণার এ বিষয়ে এখনো পরিষ্কার নয়। ফলে তারা বুঝে অথবা না বুঝে বাংলাদেশবিরোধী, স্বাধীনতাবিরোধী শিবিরের পতাকাতলে শামিল হয়ে আছে। সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী নানা কর্মকাণ্ড, দুর্নীতিতে তারা লিপ্ত। এমনকি প্রশাসনেও তাদের ছায়াও দেখি।’

শহীদ শেখ আব্দুস সালামের কন্যা শহীদসন্তান শেখ সালমা নার্গিস বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করতে হলে সর্বাত্মকভাবে নৈতিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে, বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতির মূল উৎপাটন করতে হবে এবং প্রশাসনের কোন কোন স্তরে সুবিধাভোগের কোন কোন ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের মানুষ অবস্খান করছে তা যথাযথভাবে যাচাই করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’

শহীদ কাজী শামসুল হক-এর পুত্র শহীদসন্তান কাজী সাইফউদ্দিন আব্বাস বলেন, ‘শর্ষীনার পীরের অনুরোধে আমার বাবাকে ১৯৭১ সালে হত্যা করা হয়। ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের পরে শর্ষীনার পীর পুনরায় স্বমহিমায় ফিরে আসেন। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান তাকে স্বাধীনতা পদক প্রদান করেন। বর্তমানে বরিশালের অনেক আওয়ামী লীগ নেতা শর্ষীনার পীরের কাছে যান। এভাবে আমাদের নিজেদের মধ্যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। এই ক্ষত সারিয়ে তুলতে হবে।’

নির্মূল কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক উপাধ্যক্ষ কামরুজ্জামান বলেন, ‘আমরা ৫০ বছরে এখনও অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্ত্বা গড়ে তুলতে পারিনি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ যেন আমরা গড়ে তুলতে পারি সেই প্রচেষ্টাই আমরা করব।’

সভাপতির বক্তব্যে শহীদসন্তান আসিফ মুনীর তন্ময় মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের সাথে লড়াইয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকলকে একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানান।

বাংলা প্রবাহ/এম এম

, , ,
শর্টলিংকঃ