ধর্মের নামে হত্যা ও সন্ত্রাসের পাল্টা বয়ান হচ্ছে সুফিদের শান্তি ও মানবপ্রেমের ইসলাম

Ecare Solutions

আজ ১৭ ডিসেম্বর ২০২১ দুপুর ২টায় সুফি কবি জালালউদ্দিন রুমির ৭৪৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তারা একথা বলেন। ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনের আলোচনার বিষয় ছিল: ‘শিল্প ও সংস্কৃতি চর্চাই ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদী সমাজ গড়ার হাতিয়ার’।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিতব্য এই সম্মেলনে বক্তব্য প্রদান করেন তুরস্কের আর্থ সিভিলাইজেশন প্রজেক্ট-এর প্রতিষ্ঠাতা, বরেণ্য কবি, নাট্যকার, অভিনেতা তারিক গুনারসেল, পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘তেহরিক-ই-নিসওয়ান’-এর সভাপতি, কিংবদন্তী ধ্রুপদী নৃত্যশিল্পী, পরিচালক, প্রযোজক, নারী অধিকার নেত্রী সীমা কেরমানি, যুক্তরাজ্যের ইরানি সুফি গবেষক, মানবাধিকার নেতা আব্বাস ফয়েজ, পাকিস্তানের মানবাধিকার নেত্রী তাহেরা আবদুল্লাহ, সুইডেনে অবস্থানকারী উইঘুর পেনের প্রেসিডেন্ট লেখক কায়সার আবদুর রসুল উঝহুন, ভারতের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং সম্প্রদায়ের ক্ষমতায়ন এবং দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তির জন্য কর্মরত সেচ্ছাসেবী সংগঠনের জাতীয় নেটওয়ার্ক ‘কোভা’র নির্বাহী পরিচালক শান্তিকর্মী ড. মাজহার হুসাইন, তুরস্কের টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি ফোরাম ফর হিউম্যানিটি-এর সভাপতি লেখক চলচ্চিত্রনির্মাতা ফেরহাত আতিক, যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মানবাধিকার নেতা ড. এবিএম নাসির, ইস্তাম্বুলের সুফি একাডেমির সভাপতি, শিক্ষাবিদ, লেখক, সঙ্গীতশিল্পী হাকান মেনজুস, ইউক্রেনের সেমা নৃত্যশিল্পী, গীতিকার, গায়িকা নাদিয়া মায়া, নির্মূল কমিটির সাংস্কৃতিক স্কোয়াডের সাধারণ সম্পাদক, সঙ্গীতশিল্পী মানবাধিকার নেত্রী জান্নাত-ই-ফেরদৌসী, যুক্তরাজ্যের ভারতীয় লেখক, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রিয়জিৎ দেব সরকার, টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি ফোরাম ফর হিউম্যানিটি, তুরস্ক-এর সাধারণ সম্পাদক লেখক ও চলচ্চিত্রনির্মাতা শাকিল রেজা ইফতি এবং সিঙ্গাপুরে নির্বাসিত আফগান সঙ্গীতশিল্পী ২০১৫ সালে শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার মনোনীত ঝালা সরমস্ত।

তুরস্ক, ইরান ও আফগানিস্তানের সুফি সাধক ও কবি জালালউদ্দিন রুমির ৭৪৮তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে অনুষ্ঠানের সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘রুমির অনুসারী ও অনুরাগীরা তার মৃত্যুবার্ষিকীতে শোক নয় উৎসব হিসেবে উদযাপন করেন। সুফীরা বিশ্বাস করেন মৃত্যুর মাধ্যমে মানুষ স্রষ্টার নৈকট্য লাভ করতে পারেন, যার জন্য তারা জীবনভর প্রার্থনা করেন। রুমি একজন ধর্মপ্রচারক ছিলেন। তার কাব্য ও অন্যান্য রচনায় তিনি সৃষ্টির ভেতর স্রষ্টাকে আবিষ্কার করেছেন এবং ধর্ম-বর্ণ-গোত্র  নির্বিশেষে মানবপ্রেমের কথা বলেছেন। রুমির মানবপ্রেম ও শান্তির ইসলাম তার অনুসারীরা সমগ্র বিশ্বে প্রচার করেছেন। সিলেটের সুফিসাধক হযরত শাহজালাল ছিলেন রুমির একজন মুরিদ। উপমহাদেশে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সুফিসাধকরা সব সময় প্রেম ও শান্তির ইসলাম প্রচার করেছেন। অন্যদিকে ওহাবি, সালাফি এবং পরবর্তীকালে জামায়াতে ইসলামীর মওদুদিবাদীরা যাবতীয় হত্যা, সন্ত্রাস ও নির্যাতনকে ইসলামের নামে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করেছে। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকালে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে নজিরবিহীন গণহত্যা ও নারীধর্ষণকে ইসলামের নামে জায়েজ করতে চেয়েছে, যা হালআমলে করছে আল কায়েদা, আইএসআইএস ও তালেবানরা। বাংলাদেশে এবং উপমহাদেশের অন্যান্য দেশে এরা এখন অনেক সক্রিয়। ধর্মের নামে হত্যা, সন্ত্রাস, বৈষম্য বন্ধ করার ক্ষেত্রে রুমি এবং অন্যান্য সুফিদের শান্তি ও মানবপ্রেমের ইসলাম প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করতে পারে।’

শাহরিয়ার কবির সাম্প্রতিককালে জালালউদ্দিন রুমি এবং উপমহাদেশে তার প্রভাব সম্পর্কে নির্মিত দুটি প্রামাণ্যচিত্রের উল্লেখ করে বলেন, ‘আজকের সম্মেলনে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ইরান, আফগানিস্তান, তুরস্ক, চীন, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সুফিগবেষক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক, মানবাধিকার নেতা ও সুফি শিল্পীরা যুক্ত হয়েছেন বিশ্বব্যাপী চলমান ধর্মের নামে সন্ত্রাস প্রতিরোধের সাংস্কৃতিক ব্যবস্থাপত্র সম্পর্কে আলোচনার জন্য।’

তুরস্কের আর্থ সিভিলাইজেশন প্রজেক্ট-এর প্রতিষ্ঠাতা, বরেণ্য কবি, নাট্যকার, অভিনেতা তারিক গুনারসেল বলেন, ‘যত বেশি আমরা বিভিন্ন ধরনের শিল্পচর্চা, সঙ্গীতচর্চা, বিজ্ঞানভিত্তিক সংস্কৃতিচর্চা বিশেষ করে শিশুদের বিভিন্ন ধরনের উৎসব আয়োজন করতে পারব ততবেশি এগুলো মানুষের ইচ্ছাশক্তি ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করবে। বাংলাদেশ, তুরস্ক এবং অন্যান্য রাষ্ট্রের সবাইকে নিজস্ব দর্শন নিয়ে ঘন ঘন একত্রিত হতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের মানবিক ও উদারপন্থীদের নিয়ে নিজস্ব মতামত আদান প্রদান করতে হবে।’

পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘তেহরিক-ই-নিসওয়ান’-এর সভাপতি, কিংবদন্তী ধ্রুপদী নৃত্যশিল্পী, নারী অধিকার নেত্রী সীমা কেরমানি বাংলাদেশের বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, ‘মাওলানা রুমির দর্শন আমাকে শক্তি ও সাহস যোগায়। সুফি নৃত্যের মাধ্যমে আমি নিজেকে ও অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে খুঁজে পাই। বিশ্বের সকল প্রান্তেই ধ্রুপদী নৃত্য হয় যা কোনও না কোনোভাবে সুফি নৃত্যের সাথে সংযুক্ত। মানুষ এর মাধ্যমে অন্তরের শান্তি খুঁজে পায়। জালালউদ্দিন রুমির দর্শন ছিল সকলের প্রতি ভালোবাসা। অথচ জঙ্গি উগ্রবাদীরা বলে সুফি নৃত্য হলো শয়তানী কার্যক্রম এর থেকে সকলের বিরত থাকা উচিৎ। সেই উগ্রবাদীদের জানা উচিৎ এই সুফিরাই এই উপমহাদেশসহ সারা বিশ্বে ইসলামের শান্তির বার্তা প্রচার করেছেন। যখন সুফিরা ইসলাম প্রচার করতেন তখনই সারা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ইসলামের প্রচার হয়েছে। কিন্তু যখনই মওদুদিরা ইসলাম ধর্ম প্রচারের চেষ্টা করেছে তখনি তারা জঙ্গিবাদের জন্ম দিয়েছে।’

যুক্তরাজ্যের ইরানি সুফি গবেষক, মানবাধিকার নেতা আব্বাস ফয়েজ বলেন, ‘রুমির দর্শন বর্তমানে সুফিবাদ হিসেবে পরিচিত। সারা বিশ্বের মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত। যার প্রথম ভাগ হলো সেই সমস্ত মানুষ যারা সকল ক্ষেত্রে স্বাধীনতা চায়। এই দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন মাওলানা রুমি। সুফিবাদ ধর্ম, সৃষ্টি ও স্রষ্টাকে জানার সবচেয়ে উৎকৃষ্ট পন্থা। ইমাম গাজ্জালির দর্শন মানুষকে যুদ্ধের পথ বেছে নিতে বলে, অন্যদিকে মাওলানা জালালউদ্দিন রুমির দর্শন মানুষকে শান্তি ও ভালোবাসার কথা বলে। রুমির দর্শন সমাজের সকল ধর্ম বর্ণের মানুষকে একত্রিত হতে বলে। মানুষের প্রতি সহমর্মী হতে বলে।’

বক্তব্যের শেষে মানবাধিকার নেতা আব্বাস ফয়েজ পারস্যের দোতার-এ সুফি সঙ্গীত পরিবেশন করেন।

পাকিস্তানের মানবাধিকার নেত্রী তাহেরা আবদুল্লাহ বলেন, ‘গতকাল ছিল বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী এবং সবাইকে বাংলাদেশের বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীর শুভেচ্ছা জানাই। ১৯৭১ সালের এই দিন বাংলাদেশের মানুষের জন্য আনন্দময় হলেও বিচ্ছেদের কারণে অনেক পাকিস্তানীর জন্য এক বিষাদময় দিন ছিল যদিও আমরা অল্প কিছু সংখ্যক মানুষ নির্যাতিত বাঙালিদের বিজয়ে আনন্দিত হয়েছিলাম।’ ১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য পাকিস্তানিদের পক্ষে মানবাধিকার নেত্রী তাহেরা আবদুল্লাহ বাংলাদেশের মানুষের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে সুফি কবি রুমি সম্বন্ধে বলেন ‘প্রতিটি ধর্মেই ভালবাসা আছে। কিন্তু ভালবাসার ধর্ম নেই। মওলানা রুমি ও রাবেয়া বসরীর সুফি দর্শনের মূল কথা  স্রষ্টাকে পেতে হলে মানুষকে ভালোবাসতে হবে।’

সুইডেনে অবস্থানকারী উইঘুর পেনের প্রেসিডেন্ট লেখক কায়সার আবদুর রসুল উঝহুন বলেন, ‘যুদ্ধ কখনো পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। বর্তমানে আমার জন্মস্থান ছেড়ে নির্বাসিত জীবনযাপন করছি। চীনা সামরিক জান্তার অত্যাচারে উইঘুর সম্প্রদায়ের মানুষেরা আজ অস্তিত্বহীন। উইঘুর জনগোষ্ঠীরা নিজ ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বন্দি ও অত্যাচারিত। তাই আমি রুমির দর্শনে দীক্ষা নিয়ে নিজেকে সমগ্র বিশ্বের মানবতার জন্য উৎসর্গ করেছি।’

তুরস্কের টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি ফোরাম ফর হিউম্যানিটি-এর সভাপতি লেখক চলচ্চিত্রনির্মাতা ফেরহাত আতিক বলেন, ‘ইতিহাস জুড়ে সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শিল্প সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সংস্কৃতি মানবতাকে সভ্যতার নিকট পৌঁছে দিয়েছে এমন শিল্পীদের দ্বারা যারা কেবল শিল্প উৎপাদন এবং বিক্রয় করে। ইসলাম এবং ইসলামিক শিল্পও এমন একটি ক্ষেত্র যা এই সভ্যতাকে ধারণ করে এবং শত শত বছর ধরে এটি রয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত, আমরা উন্নতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে কেবল মৌলবাদকে সমাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখিনি, ধর্মনিরপেক্ষতাকেও দূরে সরিয়ে দিচ্ছি। ধর্মনিরপেক্ষতা এবং মানবতাবাদ মানুষকে ন্যায়সঙ্গত এবং মুক্ত বিশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা দেয়। এই কারণেই আজ যখন আমরা মাওলানা রুমিকে স্মরণ করি, তখন আমাদের ইসলামের প্রকৃত মানবতাবাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষতার গুরুত্বের উপর জোর দিতে হবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মানবাধিকার নেতা ড. এবিএম নাসির বলেন, ‘ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে ধর্মের মাধ্যমে বদ্ধ করে দিচ্ছে। আমাদের ধর্মীয় পরিচয়ের সীমাবদ্ধতাকে ভেঙে রুমির মানবিকতা ও শান্তির দর্শনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ধর্মের নামে সহিংসতা, সন্ত্রাসবাদকে প্রতিরোধ করতে হবে।’

ইস্তাম্বুলের সুফি একাডেমির সভাপতি, শিক্ষাবিদ, লেখক, সঙ্গীতশিল্পী হাকান মেনজুস বলেন, ‘সুফিবাদ কি? সুফিবাদ হলো ভালো মানুষ হওয়ার দর্শন। রুমি বলেন, ‘জীবনে আপনি অনেক কিছু হতে পারেন, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আপনাকে একজন ভালো মানুষ হতে হবে।’ তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন নিজের অবস্থান এবং পদবীর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একজন ভালো মানুষ হওয়া। একজন মানুষ হিসেবে ধর্ম, ভাষা, জাতি বা বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে সমানভাবে দেখতে হবে এবং ভালোবাসতে হবে।’

সঙ্গীতশিল্পী হাকান মেনজুস আরও বলেন, ‘আমি বৃহত্তর ভারতবর্ষের সুফি কবিদের সম্বন্ধে পড়েছি। তাদের অনেকেই রুমির মানবিক চেতনা দ্বারা প্রভাবিত। আমি বাংলাদেশের লালন শাহ ও পাঞ্জাবের বুল্লে শাহর কথা বলতে পারি। লালন লিখেছেন, ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে’। একইভাবে বুল্লে শাহও লিখেছেন, ‘বুল্লে জানে না আমি কে’। এগুলো রুমির কবিতা আমি না খৃষ্টান, না ইহুদি, না ফার্সি, না মুসলিম-এর সমতুল্য। রুমি, লালন, বুল্লে এবং অন্যান্য সকল সুফি কবি ‘সকলের জন্য ভালবাসা এবং কারও জন্য ঘৃণা নয়’ এই তত্ত্বের ওপর লিখেছেন। মানবতা ও শাস্তির ওপর তাদের বার্তা অসহিষ্ণুতা, হিংসা বিভেদ এবং ধর্মের নামে নিরীহ মানুষের ওপর অত্যাচারের বর্তমান সময়ে খুবই প্রাসঙ্গিকতা বহন করে। রুমির একজন অনুগামী হিসেবে আমি রুমির ভালবাসা ও শান্তির বার্তা সারাবিশ্বে প্রচার করি।’

ইউক্রেনের সেমা নৃত্যশিল্পী, গীতিকার, গায়িকা নাদিয়া মায়া সুফি সঙ্গীত পরিবেশন করেন যার মূল বিষয় ছিল: কিভাবে পানি প্রবাহিত হয় এবং মানুষকে পানির মত প্রবাহমান হওয়ার আহ্বান জানানো। নাদিয়া মায়ার সঙ্গীতে ‘নে’ বাঁশি বাজান তুরস্কের সঙ্গীতশিল্পী হাকান মেনজুস। সঙ্গীত পরিবেশন শেষে গায়িকা নাদিয়া মায়া বলেন, ‘সুফি একাডেমিতে আমি মূলত নারীদের সুফি শিক্ষা দেই। তুরস্কে একটা প্রচলন আছে নারীরা সুফি হতে পারবে না। কিন্তু রুমির কবিতার কোথাও কোনও নারী পুরুষ বিভাজন নেই। তিনি সবাইকে ভালবাসা ও শান্তির দর্শনে জাগ্রত হতে বলেছেন। আমি ভবিষ্যতে কোনও একদিন নারী-পুরুষ সকলে মিলে সুফি সেমা নৃত্য পরিবেশন করার স্বপ্ন দেখি।’

নির্মূল কমিটির সাংস্কৃতিক স্কোয়াডের সাধারণ সম্পাদক শান্তিকর্মী সঙ্গীতশিল্পী জান্নাত-ই ফেরদৌসী মূল ফারসি ভাষায় রুমির গান পরিবেশন করেন এবং বলেন, ‘সূফিসাধক জালালউদ্দিন মুহম্মদ রুমির জীবন প্রমাণ করে যে সকল ধর্মের মানুষ একত্রে শান্তিতে বসবাস করতে পারে। সকলেই তাঁর ছন্দ ও কবিতার অন্তর্ভুক্ত। তাঁর কবিতায় রয়েছে সকল ধর্মের বিজয়ের শিহরণ। তাঁর দর্শন, কথা ও জীবন আমাদেরকে আত্মিক সুখ ও শান্তি খুঁজে পেতে শেখায়। তাঁর বিখ্যাত উক্তি, “স্রষ্টার কাছে পৌঁছানোর অসংখ্য পথ রয়েছে, যার মধ্যে আমি প্রেমকে বেছে নিয়েছি।” এই উক্তিটি প্রমাণ করে যে প্রেম মানুষ ও সৃষ্টিকর্তা উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের বাউল, মুর্শিদিরা যেমন লালন, হাসান ও আবদুল করিম খান তাদের গানে রুমির মতো একই আবেদন প্রকাশ করেছেন। তাই মানুষের সাম্যতা ও নারীর সমমর্যাদা নিশ্চিত করতে সুফি সঙ্গীত আজও প্রাসঙ্গিক।’

যুক্তরাজ্যের ভারতীয় লেখক, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রিয়জিৎ দেব সরকার বলেন, ‘জালালউদ্দিন রুমি একমাত্র ব্যক্তি যাঁকে এশিয়া মহাদেশের সকল ধর্মের মানুষ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। তাঁর ভালবাসা ও শান্তির ধর্মের অনুপ্রাণিত হয়ে মধ্যযুগে ভারতীয় উপমহাদেশে সুফিরা ধর্মপ্রচার করেন। যুগে যুগে রুমির অনুসারীরা শান্তির ধর্ম প্রচার ও প্রসার করলেও বর্তমানে ধর্মীয় উগ্রবাদীরা এশিয়াসহ সারা বিশ্বে উগ্র মতাদর্শ পালনে মানুষকে বাধ্য করছে এবং জঙ্গিবাদের জন্ম দিচ্ছে। বাংলাদেশে মহান মুক্তিযুদ্ধে তহবিল সংগ্রহের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের রবি শঙ্কর ও জর্জ হ্যারিসন একাধিক সংগীতানুষ্ঠান করেন যেখানে মানবতার গান গাওয়া হয়। যা ছিল জালালউদ্দিন রুমির শান্তির গান, ভালবাসার গান। রুমির দর্শন উপমহাদেশের প্রায় প্রতিটি মানবতাবাদী লেখক ও সাহিত্যিকের রচনায় লক্ষ্য করা যায়।’

টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি ফোরাম ফর হিউম্যানিটি, তুরস্ক-এর সাধারণ সম্পাদক লেখক ও চলচ্চিত্রনির্মাতা শাকিল রেজা ইফতি বলেন, ‘কোন ভাষার মনের ভাব প্রকাশ করা হচ্ছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয় বরং যেকোনও ভাষায়ই যথাযথভাবে মনের ভাব প্রকাশ করার মাধ্যমে মনের অন্তর্নিহিত ইচ্ছাশক্তিকে জাগ্রত করা যায় এবং তার মাধ্যমেই সারা বিশ্বকে মানবতার সুফি দর্শনে প্রভাবিত করা যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম সকলেই তাঁদের রচনায় সুফি দর্শনের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন।’ বক্তব্য শেষে লেখক ও চলচ্চিত্রনির্মাতা শাকিল রেজা ইফতি ‘চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে’ শীর্ষক রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করেন।

সিঙ্গাপুরে নির্বাসিত আফগান সঙ্গীতশিল্পী ঝালা সরমস্ত বলেন, ‘সঙ্গীত বা গান-বাজনার ব্যাপারে তালেবানরা অত্যন্ত কঠোর। সঙ্গীত নিয়ে আমরা কেবলই বিতর্ক করি অথচ সুফিদের শান্তির ইসলামের সঙ্গে তা একেবারেই সাংঘর্ষিক নয়। সঙ্গীত প্রকৃতিতে আছে। সঙ্গীত আমাদের হৃদয়ে আছে। সঙ্গীত আমাদের চারপাশে রয়েছে এবং কেউ মানুষের মন, হৃদয় এবং আত্মা থেকে সঙ্গীতকে মুছে ফেলতে বাধ্য করার ক্ষমতা রাখে না। মানুষের মাঝে থেকে সঙ্গীতকে মুছে ফেলার জন্য যদি তালেবানরা যতো কঠোর ও হিংস্র হবে, তত তাড়াতাড়ি তাদের পতন হবে।’

সম্মেলনের শুরুতে হযরত জালালউদ্দিন রুমির জীবন, সাহিত্য ও তার প্রভাব সম্পর্কে শাহরিয়ার কবিরের নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রের অংশবিশেষ প্রদর্শন করা হয়। এ ছাড়া ধ্রুপদী নৃত্যশিল্পী সীমা কেরমানীর নৃত্য এবং হাকান মেনগুছ, মিথাত ওজচাকল, আব্বাস ফয়েজ ও জান্নাতুল ফেরদৌসীর সুফি সঙ্গীত পরিবেশিত হয়।

বাংলা প্রবাহ/এম এম

Ecare Solutions
শর্টলিংকঃ