ভিন্ন ধর্ম ও মতাবলম্বীদের নামে দায়েরকৃত ষড়যন্ত্রমূলক মামলা প্রতাহারের দাবি নির্মূল কমিটির

Ecare Solutions

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক শহীদজননী জাহানারা ইমামের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আজ ৬ মে  বিকেল ২.৩০ টায় একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি আয়োজিত ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মৌলবাদীদের সাম্প্রদায়িক জিহাদ প্রতিরোধ’ শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক ওয়েবিনারে এই দাবি জানানো হয়।

উল্লেখ্য, এ বছর ৩ মে ঈদুল ফিতরের দিন ছিল নির্মূল কমিটির প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক শহীদজননী জাহানারা ইমামের ৯৩তম জন্মবার্ষিকী। ঈদের কারণে এই দিন আমাদের নেত্রী শহীদজননী জাহানারা ইমামের সমাধিতে পুষ্পার্ঘ অর্পণ ছাড়া অন্যান্য কর্মসূচি যথাসময়ে পালন করা সম্ভব হয়নি।

নির্মূল কমিটির সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরের সভাপতিত্বে এই ওয়েবিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফা জব্বার। ওয়েবিনারে ধারণাপত্র পাঠ করেন নির্মূল কমিটির বহুভাষিক সাময়িকী ’জাগরণ’-এর যুগ্ম সম্পাদক অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট লেখক মারুফ রসুল।

সম্মানিত আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় নেতা ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ, টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি ফোরাম ফর হিউম্যানিটি তুরস্ক সাধারণ সম্পাদক লেখক ও চলচ্চিত্রনির্মাতা শাকিল রেজা ইফতি,  সর্ব ইউরোপীয় নির্মূল কমিটির সভাপতি সমাজকর্মী তরুণ কান্তি চৌধুরী, সুইডেনে অবস্থানকারী নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় নেতা ও জাগরণ-এর যুগ্ম সম্পাদক লেখক সাংবাদিক সাব্বির খান, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট লেখক সুইজারল্যান্ডপ্রবাসী অমি রহমান পিয়াল, ‘জাগরণ’-এর হিন্দি বিভাগের সম্পাদক ভারতের সমাজকর্মী তাপস দাস, সাম্প্রদায়িক ভারত থেকে অনলাইন একটিভিস্ট আইনজীবী সালমান আখতার, নির্মূল কমিটি আইটি সেল সভাপতি শহীদসন্তান আসিফ মুনীর তন্ময়, ব্লগার এন্ড অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক-এর সভাপতি ড. কানিজ আকলিমা সুলতানা, কলামিস্ট ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট সমাজকর্মী লীনা পারভীন, নির্মূল কমিটির আইন সহায়ক কমিটির সদস্য এডভোকেট নাসির মিঞা, নির্মূল কমিটি কুমিল্লা জেলা শাখার সভাপতি সাংবাদিক দিলিপ মজুমদার, সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের শিকার মুন্সিগঞ্জের শিক্ষক হৃদয় মন্ডল, সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের শিকার সুনামগঞ্জের ঝুমন দাস, সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের শিকার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রসরাজ দাস, সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের শিকার কুমিল্লার অনীক ভৌমিক, বাংলাদেশ কৃষক লীগ, সিলেট জেলার প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের শিকার সমাজকর্মী রাকেশ রায়, সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের শিকার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের ছাত্র জয়দেব চন্দ্র শীল ও নির্মূল কমিটির সাধারণ সম্পাদক সমাজকর্মী কাজী মুকুল।

ওয়েবিনারের সভাপতির প্রারম্ভিক বক্তব্যে নির্মূল কমিটির সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির ৯৩তম জন্মবার্ষিকী উদযাপনকালে শহীদজননী জাহানারা ইমামের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবদেন করে বলেন, ‘তিন দশকেরও অধিককাল পূর্বে আমরা শহীদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যে অভূতপূর্ব নাগরিক আন্দোলনের সূচনা করেছিলাম তার দুটি প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, ’৭১-এর গণহত্যাকারী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং স্বাধীনতাবিরোধী গণহত্যাকারীদের ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ধর্মনিরপেক্ষ কল্যাণ রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তোলা। আমাদের প্রথম উদ্দেশ্য আংশিকভাবে সফল হলেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনও অগ্রগতি হয়নি। স্বাধীনতার ৫০ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তি বিভিন্ন মাধ্যমে ইসলামের দোহাই দিয়ে ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন মত এবং ভিন্ন জীবনধারার অনুসারী নাগরিকদের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষমূলক প্রচারণা অব্যাহত রেখেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অমুসলিম ও মুক্তচিন্তকদের পাশাপাশি বাংলাদেশের সংবিধান এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনার প্রতি তারা ক্রমাগত বিষোদগার করছে। ইসলাম অবমাননার অপবাদ দিয়ে ‘ডিজিটার নিরাপত্তা আইনে’ তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে এবং তাদের ঘরবাড়ি, পাড়া মহল্লা, গ্রামে হামলা হচ্ছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও মুক্তচিন্তার অনুসারীরা বার বার মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে সামাজিকভাবে লাঞ্ছিত হচ্ছেন, বিনা অপরাধে মাসের পর মাস কারানির্যাতন ভোগ করছেন বিভিন্নভাবে, বিড়ম্ভিত হচ্ছেন এবং তাদের জীবন-জীবিকা বিপর্যস্ত হচ্ছে।’

শাহরিয়ার কবির অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের জন্য সরকার যদিও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করেছে প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্র ও জননিরাপত্তার প্রতি প্রধান হুমকি হচ্ছে স্বাধীনতাবিরোধী মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তি, যারা এই আইনের সুযোগ নিয়ে ভিন্ন ধর্ম ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের নির্মূল করে বাংলাদেশকে মোল্লা উমরের আফগানিস্তান বানাতে চাইছে। এসব সাইবার সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে না। আজকের অনুষ্ঠানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের ভুক্তভোগীরা জানাবেন কোনও অপরাধ না করে কীভাবে তারা মৌলবাদীদের সন্ত্রাসের শিকার হয়ে বছরের পর বছর কারাগারে কাটিয়েছেন এবং এখনও অনিশ্চিত ও বিড়ম্বিত জীবন যাপন করছেন। আমরা আবারও দাবি করছি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণাকারী মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিনাশী মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এবং অবিলম্বে ভিন্নধর্ম ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলাগুলো প্রতাহার করে ভিকটিমদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।’

প্রধান অতিথির ভাষণে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফা জব্বার শহীদজননী জাহানারা ইমামের জন্মবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, ‘তিনি যে পথ দেখিয়ে গেছেন সেই পথে আমরা চলছি। স্বাধীনতাবিরোধী মুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে তাঁর কর্মজীবন আমাদের কাছে পাথেয়।’

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘ভিকটিমদের কাছ থেকে সরাসরি হয়রানির চিত্র জানতে পেরে এই আয়োজনের জন্য একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। ইসলামিক রিপালিক পাকিস্তানকে পরাস্ত করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আমরা পিপলস রিপাবলিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছি। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় এসব মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক ঘটনা হুমকিস্বরূপ। বাংলাদেশ বাঙালি জাতীয়তাবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত। মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তি যেভাবে শেকড় গেঁড়েছে বাংলাদেশে তা উপড়ে ফেলা একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ। সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে যে স্বাধীনতাবিরোধীদের মৌলবাদী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে তার বিরুদ্ধে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি দীর্ঘদিন যাবত মৌলবাদী সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে, তাদেরকে সাধুবাদ জানাই।’

তিনি বলেন, ‘বিটিআরসি’র মাধ্যমে আমরা বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালের আপত্তিকর পোস্ট ও কমেন্ট মুছে ফেলার জন্য একটি অ্যাপস তৈরির পরিকল্পনা করছি। এর বাইরে যেহেতু দেশের ৪ লাখ অ্যাকাউন্ট ফেসবুকের সঙ্গে ব্যবসায়ে যুক্ত তাই ফেসবুক বন্ধ করার কথা বলা যাচ্ছে না। তবে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে নিয়মিত। এখন ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্ট রিপোর্ট করে তা মুছে ফেলার ক্ষেত্রে আগে আমাদের সফলতার হার ছিল ৫ ভাগ, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ ভাগে। মৌলবাদী সন্ত্রাস নির্মূলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা অগ্রণী। আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলে তার মাধ্যমে মৌলবাদী সন্ত্রাস নির্মূলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের এ বিষয়ে সচেতন করার উদ্যোগ নিতে পারি।সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের শিকার ভিকটমদের তাদের মামলার বিবরণ আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্য তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী নির্মূল কমিটির প্রতি আহবান জানান।’

ওয়েবিনারে ধারণাপত্র পাঠকালে নির্মূল কমিটির বহুভাষিক সাময়িকী ’জাগরণ’-এর যুগ্ম সম্পাদক অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট লেখক মারুফ রসুল বলেন, ‘সাম্প্রদায়িকতার বিস্তারকে জঙ্গিবাদের মতোই শূন্য সহিষ্ণুতায় দেখতে হবে। রামু, নাসিরনগর, গোবিন্দগঞ্জসহ গত এক দশকে বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসগুলো অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সরকার কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়নি। অথচ, যাদের ভিকটিম বানানো হয়েছে, তারা বিনা কারণে জেল খেটেছেন, অনেকে বাড়িঘর ছেড়েছেন, এমনকি দেশ ছাড়তেও বাধ্য হয়েছেন। এ কারণেই সরকারের কাছে দাবি, সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসগুলোর বিচার করতে হবে। ডিএসএর কতোগুলো ধারার বিষয় সুস্পষ্ট করতে হবে।’

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের শিকার মুন্সিগঞ্জের শিক্ষক হৃদয় মন্ডল বলেন, ‘আমাদেরকে এই পৃথিবীতে একটু শান্তিতে বসবাস করতে হলে প্রথমত দরকার হয় অসম্প্রদায়িক ও মানবিক গুনাবলীর অধিকারী হওয়া, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের মতামতকে সন্মান দেখানো। গোটা বিশ্বেই আজ এমন একটা অস্থিরতা তৈরি হয়েছে যা কিনা মানবসভ্যতার জন্য হুমকি স্বরূপ। এই সকল অপতৎপরতা থেকে সমাজ ও সমাজের মানুষকে রক্ষা করতে সমাজের সুশীল মানুষগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সরকারকে কঠোরভাবে অতিদ্রুত মৌলবাদী অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।’

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের শিকার সুনামগঞ্জের ঝুমন দাস বলেন, ‘আপনারা জানেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মৌলবাদীদের উগ্র থাবায় আমি পড়েছিলাম। মামুনুল হকের সাম্প্রদায়িক বক্তব্যের গঠনমূলক সমালোচনা করে আমি প্রতিবাদ করেছিলাম ফেসবুকে। এর পরের ঘটনা আপনাদের সবারেই জানা আছে। সাতমাস জেল খেটে জামিনে বের হয়েছি আমি। মামলা চালাতে এখন হিমশিম খেতে হচ্ছে আমাকে। সুনামগঞ্জ থেকে মামলা এখন সিলেট ট্রাইব্যুনালে, এখন আবার মামলা চলে যাচ্ছে ঢাকায়। আমি আশা করছি, স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি এবং বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র আমাকে এই মামলা থেকে অবিলম্বে রেহাই দেবে। আমাকে নিশ্চিত নিরাপত্তা দেবে এই রাষ্ট্র।’

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের শিকার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রসরাজ দাস বলেন, ‘ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা ফেসবুক আইডি থেকে পবিত্র ‘কাবাঘর’ অবমাননার অভিযোগে ৩০ অক্টোবর ২০১৬ তারিখে গ্রেফতার করা হয়ে ২ মাস ১৬ দিন জেলে খেটে কারাগার থেকে বের হয়ে আসি। আমি ৫ বছর ধরে প্রতিমাসে আদালতে হাজিরা দিতে দিতে খুবই অসহায় হয়ে পড়েছি। প্রতিমাসে গ্রাম থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে গিয়ে হাজিরা দিতে যে টাকা খরচ হয় তা বহন করার অবস্থা আমার নেই। আমি রাষ্ট্রের কাছে এই মামলা থেকে বেকসুর খালাস চাই। এই মামলা থেকে রেহাই পেতে চাই।’

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের শিকার কুমিল্লার অনীক ভৌমিক বলেন, ‘বাংলাদেশ হচ্ছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। ১৯৭১ সালের এই দেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল দেশ স্বাধীনের জন্য; কিন্তুু আমার জীবনের যুদ্ধ আরম্ভ হয়েছে ২০২০ সাল ১লা নভেম্বর, সেই দিনটা এখনো আমার মনে পড়ে। ফেসবুকে নির্দোষ একটা লাইক দেয়ায় কারণে আমার জীবনে অন্ধকার নেমে আসে।’

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের শিকার বাংলাদেশ কৃষক লীগ, সিলেট জেলার প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক রাকেশ রায় বলেন, ‘কথিত ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে করা মামলায় এক বছর জেল খাটতে হয়েছে আমাকে। ৫ বছর ধরে চলা এই মামলা চালাতে গিয়ে রীতিমতো নিঃস্ব হয়ে পরেছি। সরকারের কাছে আমার দাবি, সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির করা মিথ্যা মামলাগুলো তুলে নিতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের শিকার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জয়দেব চন্দ্র শীল বলেন, ‘২০১৭ সালের ১৭ মে মৌলবাদী সন্ত্রাসীরা আমাকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে ভয়ঙ্কর নির্যাতন করে আমাকে দিয়ে জোর করে ধর্ম অবমাননার কথা বলিয়ে থানা পুলিশের হাতে তুলে দেয়। ১৮ মে ২০১৭ সালে সেই সময়টাতে থানাতেও আমারকে নির্যাতন করা হয়। পরদিন আদালতে মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করা হলেও নির্যাতন থেকে রেহাই পাইনি। নির্মূল কমিটিকে ধন্যবাদ, তাদের সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ছাত্রত্ব বাতিল হওয়ার বিষয় থেকে রক্ষা পেয়েছি। তবে মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে আমি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। সরকারের কাছে আমার দাবি, আমি আমার মামলা প্রত্যাহার চাই।’

নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় নেতা ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ বলেন, ‘সাইবার ক্ষেত্র জিহাদ আকৃষ্ট করার নতুন একটি প্লাটফর্ম। জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সাইবার কাউন্টার জিহাদ কেমন করে করতে হবে তার একটি রূপরেখা আমাদের তৈরি করতে হবে এবং সে অনুযায়ী আমাদের সামনে এগোতে হবে। জঙ্গি গোষ্ঠীরা অনলাইনে একের পর এক জিহাদের মোটিভেশন দিয়ে যাচ্ছে তাদেরকে প্রতিহত করতে হলে সরকার এবং আমাদের মধ্যে একটি সমন্বয় থাকা দরকার এবং সেই সমন্বয়ের মাধ্যমে আমরা তাদেরকে প্রতিহত করতে পারবো বলে বিশ্বাস করি।’

টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি ফোরাম ফর হিউম্যানিটি তুরস্ক সাধারণ সম্পাদক লেখক ও চলচ্চিত্রনির্মাতা শাকিল রেজা ইফতি বলেন, ‘মা যেভাবে সন্তানকে সকল দুর্যোগ দুঃসময়ে পরম মমতায় আগলে রাখে, শহিদ জননী জাহানারা ইমামও ঠিক সেভাবে কখনও নিজের পরিবারকে যুদ্ধে পাঠিয়ে সন্তানহারা হয়ে, কখনও আবার ঘাতক দালাল রাজাকারদের শাস্তির দাবিতে পথে নেমে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে চেয়েছেন স্বাধীনতাবিরোধী শত্রুদের হাত থেকে।’

সর্ব ইউরোপীয় নির্মূল কমিটির সভাপতি সমাজকর্মী তরুণ কান্তি চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৯০% এর বেশি মুসলমান., তারপরেও কেন জেহাদের প্রয়োজন সেটা আমাদের বিশ্লেষণ করে জানা দরকার। তার একমাত্র কারণ মৌলবাদ। মৌলবাদ ধর্মকে পুঁজি করে রাজনীতিকরার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে অস্থির করে তোলা।’

সুইডেনে অবস্থানকারী নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় নেতা ও জাগরণ-এর যুগ্ম সম্পাদক লেখক সাংবাদিক সাব্বির খান বলেন, ‘ডিজিটাল আইনের প্রয়োজন আছে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য। তবে এই আইনের ব্যাপক অপপ্রয়োগ হচ্ছে।’

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট লেখক অমি রহমান পিয়াল বলেন, ‘অনলাইনে সাম্প্রদায়িক শক্তি ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যারা লড়াই লড়ছেন তাদের মধ্যে ঐক্যের অভাবটা প্রকট। নিজেদের এজেন্ডার কারণেই ভিন্ন মোডাস অপারেন্ডিতে পারষ্পরিক অবিশ্বাস নিয়েই লড়ছেন তারা। তবে আশংকার জায়গা হচ্ছে সরকার বিরোধী আন্দোলনের স্বার্থে একদল এই মৌলবাদী শক্তির সঙ্গেই আপোষে যেতে আগ্রহী। সেক্ষেত্রে লড়াইটা এখন গায়ের উপর এসে পড়ছে।’

‘জাগরণ’-এর হিন্দি বিভাগের সম্পাদক ভারতের সমাজকর্মী তাপস দাস বলেন, ‘মৌলবাদী চেতনায় বিশ্বাসী মানুষ সামাজিক গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে বাংলাদেশ সহ পৃথিবীতে হিংসা এবং বিভাজনের রাজনীতির জন্ম দিয়েছে তার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। আমি মনে করি যদি সরকার প্রভাবিত ক্ষেত্র থেকে নিরপেক্ষ আন্দোলন না গড়ে তোলা যায় তাহলে এদের বিরুদ্ধে লড়াই করা সম্ভব না।’

নির্মূল কমিটি আইটি সেল সভাপতি শহীদসন্তান আসিফ মুনীর তন্ময় বলেন, ‘বর্তমানে মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক সুসংগঠিত এবং বিস্তৃত। সেই তুলনায় অসাম্প্রদায়িক শক্তির পাল্টা জবাব এই মাধ্যমে সুসংগঠিত নয়। এজন্য অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের নিয়মিত মতবিনিময় প্রয়োজন। পাশাপাশি তথ্য প্রযুক্তি সংক্রান্ত আইন ও নীতিমালায় সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদ উস্কানীমুলক অপতৎপরতার জন্য শাস্তির বিধান ও প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ডের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা এবং পৃষ্ঠপোষকতার বিধান থাকতে হবে।’

ব্লগার এন্ড অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক-এর সভাপতি ড. কানিজ আকলিমা সুলতানা বলেন, ‘মৌলবাদীরা ইতোমধ্যে সাংস্কৃতিক জগত ও নারীরা তাদের টার্গেটে পরিণত হয়েছে। ওদের প্রতিরোধ করতে তাই সাংস্কৃতিক কর্মী ও নারীদের বিশেষভাবে সক্রিয় হতে হবে। অনলাইনে মৌলবাদীদের জিহাদ প্রতিরোধে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এই উদ্যোগটা সরকারকে নিতে হবে।’

কলামিস্ট ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট সমাজকর্মী লীনা পারভীন বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মৌলবাদীদের জিহাদকে রুখতে হলে সবার আগে দরকার সম্মিলিত প্রতিরোধ পরিকল্পনা। মাঠ ও ভার্চুয়াল দুই মাধ্যমেই একসাথে লড়াইটা চালাতে হবে। শহীদজননী যে কাজটা করতে পেরেছিলেন সেই কাজের পিছনে সফলতা ছিল মৌলবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য। আবারও তেমন একটি মানসিক জাগরণ ঘটাতে হবে।’

ভারত থেকে অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট আইনজীবী সালমান আখতার বলেন, ‘সাম্প্রদায়িক মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে সরকারের নীরব ভূমিকা নিয়ে আমার প্রশ্ন আছে। অনলাইনের বিভিন্ন মাধ্যমে মৌলবাদী গোষ্ঠী তাদের জঙ্গিবাদী কার্যক্রম চালাচ্ছে। এগুলো অনেকদিন ধরেই অনলাইনে চলছে। এগুলো বন্ধ করতে সরকারের কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।’

নির্মূল কমিটির আইন সহায়ক কমিটির সদস্য এডভোকেট নাসির মিঞা বলেন, ‘ মৌলবাদীদের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের ভিকটিম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রসরাজের বিরুদ্ধে সিআইডি এবং পিবিআই এর ফরেনসিক প্রতিবদনে পোস্ট দেওয়ার কোনো তথ্য না পাওয়া গেলেও তাকে অভিযুক্ত করে তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অপরদিকে সঞ্জু বর্মণের মামলাটি শিশু আদালত ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিচারাধীন। রসরাজ এবং সঞ্জু বর্মণ দুজনই অক্ষরজ্ঞানহীন। তারা কেউই ফেসবুক অপারেট করতে জানে না। তাদেরকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মামলাতে জড়ানো হয়েছে।’

নির্মূল কমিটি কুমিল্লা জেলা শাখার সভাপতি সাংবাদিক দিলিপ মজুমদার বলেন, ‘ধর্মের দোহাই দিয়ে একটি গোষ্ঠী সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প সামাজিক মাধ্যম সহ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে তাদের হীন উদ্যেশ্য চরিতার্থ করছে। এ অশুভ চর্চা আর চলতে দেয়া যায় না। অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী যাচাই-বাছাই পূর্বক ঠিক এখনি সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর এই শ্রেণির মামলা প্রত্যাহার সহ ইতিবাচক পদক্ষেপগ্রহণ করা অতীব আবশ্যক।’

শহীদজননীর জন্মদিনে সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে নির্মূল কমিটির সাধারণ সম্পাদক সমাজকর্মী কাজী মুকুল বলেন, ‘সবকিছুর মূলে হচ্ছে রাজনীতি। রাজনীতিতে দুঃখজনক অবনতি হয়েছে। মৌলবাদীদের প্রতিরোধে রাজনীতিবিদদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। মৌলবাদীদের জিহাদ ভাইরাস হয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক বিকাশ, বাঙালির আত্মপরিচয়, নিজস্ব সংস্কৃতি ও নারী অগ্রগতি সহ মানবতার জন্য জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে মৌলবাদীরা এই জিহাদ ভাইরাসকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে। সাধারণ চোখে দেখলে এদের প্রত্যেকের কর্মকান্ড আলাদা মনে হলেও এরা সকলেই এক ছাতার নিচে একই সাম্প্রদায়িক এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। সরকারেরও জঙ্গি দমন কার্যক্রম যত জোরালো ছিল মৌলবাদের ডিজিটাল আগ্রাসন রুখতে তেমন কোনো জোরালো কর্মসূচি দৃশ্যমান নয়।’

Ecare Solutions
শর্টলিংকঃ