‘জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন’ গঠন করে সাম্প্রদায়িক নির্যাতন ও বৈষম্য অবসানের দাবি

Ecare Solutions

আজ (১১ জুন) বিকেল ৩টায় শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির উদ্যোগে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভুক্তভোগী ও প্রকৃত অপরাধী’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা ও সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভুক্তভোগীদের এই সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফা জব্বার। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরের সভাপতিত্বে সম্মেলন সঞ্চালনা করেন নির্মূল কমিটির আইটি সেলের সভাপতি শহীদসন্তান আসিফ মুনীর। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, লেখক মারুফ রসুল।

আলোচনায় অংশ নেন মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী দক্ষিণ এশীয় গণসম্মিলনের সভাপতি বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তাপস বল, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ভাষাসৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পৌত্রী মানবাধিকার নেত্রী আরমা দত্ত এমপি, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সমাজকর্মী কাজল দেবনাথ, নির্মূল কমিটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আইন সম্পাদক এডভোকেট নাসির মিঞা প্রমূখ।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভিকটিমরা সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। এদের মধ্যে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছেন ঢাকার সহকারী অধ্যাপক রুমা সরকার, মুন্সীগঞ্জের শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মÐল, কুমিল্লার শিক্ষক শঙ্কর দেবনাথ, সুনামগঞ্জের সমাজকর্মী ঝুমন দাস, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মৎসজীবী রসরাজ দাস, রংপুরের কবিরাজ টিটু রায় ও টিম পটুয়াখালীর ছাত্র জয়দেব শীল।

সভাপতির প্রারম্ভিক ভাষণে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সাম্প্রদায়িক ষড়যন্ত্রের শিকার, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভিকটিমরা আমাদের এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করছেন। যাদের নিরাপত্তার জন্য আইনটি প্রণীত হয়েছিল সেই আইনে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কারানির্যাতন ভোগ করেছেন প্রধানত সংখ্যালঘু সনাতনধর্মালম্বীরা। এদের কেউ শিক্ষক, কেউ ছাত্র, কেউ দোকান কর্মচারী, মৎস্যজীবী কিংবা ক্ষৌরকার। যে বালক নিজের নাম লিখতে শেখেনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সে ফেসবুকে নাকি বিশাল পোস্ট দিয়েছে ইসলাম ধর্ম অবমাননা করে। ফেসবুকে এক মৌলবাদী দুর্বৃত্তের সাম্প্রদায়িক জিঘাংসামূলক বক্তব্যের সমালোচনার জন্য একজনকে জেল খাটতে হয়েছে, তার গ্রামে হামলা হয়েছে, কারণ ধর্মীয় পরিচয়ে সে সংখ্যালঘু। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের একটি সন্ত্রাসবিরোধী বক্তব্যে শুধু ‘লাইক’ দেয়ার জন্য বাংলাদেশে দু’জন সনাতন ধর্মাবলম্বী নাগরিককে মাসের পর মাস কারানির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে। যারা এসব মামলা করেন তাদের জানা উচিৎ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এর অভিঘাত কী হতে পারে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগের শিকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরীহ মানুষদের উপর মাসের পর মাস, বছরের পর বছর যে নির্যাতন চলছে তার দায় সরকার এড়াতে পারে না। ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যার পর থেকে জঙ্গি মৌলবাদীরা বাংলাদেশকে মনোলিথিক মুসলিম রাষ্ট্র বানাবার চক্রান্ত করছে। সেই এজেণ্ডা থেকে তারা আজও সরে আসে নি। প্রকাশ্য সমাবেশে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যারা ভিন্নধর্ম ও ভিন্নমতের মানুষদের বিরুদ্ধে কুৎসিৎ হিংসাত্মক মন্তব্য করছে, বাংলাদেশের সংবিধানের বিরুদ্ধে বিষোদগার করছে, তাদের গ্রেফতার করা হয় না। গ্রেফতার হয় রসরাজ, ঝুমন, জয়দেব, রুমা, সৌরভ, শঙ্কর ও হৃদয় মণ্ডলের মতো প্রান্তজন এবং আলোকিত মানুষরা। আজকের সম্মেলন থেকে আমরা জোরালো দাবি জানাচ্ছি- সাম্প্রদায়িক ষড়যন্ত্রের অন্তর্গত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সকল মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। ভুক্তভোগীদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং প্রকৃত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।’

শাহরিয়ার কবির আরও বলেন, ‘২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ঘোষণা করেছিল ক্ষমতায় গেলে ‘সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন’ প্রণয়ন করা হবে, জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন করা হবে। চার বছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে- এখনও তা করা হয়নি। আমরা অবিলম্বে ‘জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন’ গঠন করে ভিন্ন ধর্ম ও ভিন্নমতের নাগরিকদের উপর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সাম্প্রদায়িক নির্যাতন ও বৈষম্য অবসানের দাবি জানাচ্ছি।’

সম্মেলন শেষে সভাপতি হিসেবে সমাপ্তি ঘোষণাকালে শাহরিয়ার কবির সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন ও বৈষম্য দূর করার জন্য নতুন একটি গণকমিশন গঠনের ঘোষণা দেন। তিনি নতুন এ গণকমিশনের নাম দেন ‘সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন ও বৈষম্য বিলোপরোধে গণকমিশন’। এ গণকমিশনের চেয়ারপার্সন হিসেবে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তাপস বলকে সদস্য সচিব হিসেবে নাম ঘোষণা দেন তিনি।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফা জব্বার তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই শিক্ষিকা রুমা সরকারের সঙ্গে রাষ্ট্র যে আচরণ করেছে তার জন্য করজোড়ে মার্জনা প্রার্থনা করেন এবং অন্যান্য ভিকটিমদের নিকটও তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করে বলেন,  ‘আমরা যে আইসিটি আইন তৈরি করেছি সেই আইনে ভিকটিমাইজ হওয়ার দোষটা আইনের চায়তে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং বিচার ব্যবস্থার বেশি। এর সবচেয়ে বড় কারণ রাজনৈতিক। একাত্তরে আমরা স্বাধীন হয়েছি বটে কিন্তু এখনো মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে, স্বাধীনতা বিরোধীদের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধ চলমান।’ মন্ত্রী, আইসিটি আইনে আর কোনো মানুষ যেন ভিকটিমাইজ না হয় সেজন্য দেশের আটটি সাইবার ট্রাইব্যুনাল অপরাধ আদালতে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতৃত্বে আটটি সাইবার ট্রাইব্যুনাল আইনজীবী প্যানেল তৈরির পরামর্শ দেন।’

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফা জব্বার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারীর বাহিনীর সমালোচনা করে বলেন, ‘পুলিশ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং আইন মন্ত্রণালয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দেওয়ার নামে জেল হেফাজতে নিয়ে যান।’ ‘তাহলে বাংলাদেশের সমস্ত জায়গায় সংখ্যালঘুরা অবস্থান করছেন তাদের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য কী পুরো বাংলাদেশকেই জেলখানায় রূপান্তর করে ফেলবেন?’ মন্ত্রী প্রশ্ন রাখেন।

আইসিটি মন্ত্রী বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাষ্ট্র, সমাজ, আইন বিরোধী যে কোনো কর্মকাণ্ড হলে এবং আমরা যদি তার রিপোর্ট পাই তাবে তার বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করার সক্ষমতা আমরা ইতোমধ্যে অর্জন করেছি।’

‘আমরা কোনোভাবেই আমাদের দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, ইতিহাস-ঐতিহ্য দুর্বৃত্তদের হাতে যেতে দিব না। আমাদের সংগ্রাম চলবেই এই সংগ্রামের সূচনা করতে হবে সামাজিক ভিত্তিতে। আমাদের সকলকে একযোগে এদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে তবেই আমরা চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতে পারব।’ বলে মন্ত্রী তার বক্তব্য শেষ করেন।’

মূল প্রবন্ধে পাঠকালে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, লেখক মারুফ রসুল বলেন, ‘সম্প্রতি বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ একটি সন্দেহজনক আইনে পরিণত হয়েছে। আইন জননিরাপত্তা বিধানের জন্য হলেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি রক্ষক না ভক্ষকের ভ‚মিকায়- সে বিষয়ে আমরা সাধারণ জনগণই কেবল নই, বোধ করি সরকার-সমর্থিত অনেক গণ্যমান্যজনও সন্দিহান। এই আইনের ১৪টি ধারার অপরাধ আমলযোগ্য ও অ-জামিনযোগ্য হওয়ায় খুব সহজেই এর সুযোগ গ্রহণ করতে পারছে নানা পক্ষ এবং সেটা নানা কারণে, নানাভাবে। যতবার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগ ঘটেছে- ততবারই জাতীয়ভাবে এর একটি রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ঘটেছে। নিপীড়িত হয়েছেন রাষ্ট্রের সহ-নাগরিকবৃন্দ- কোথাও ধর্মীয় পরিচয়ে কোথাও জাতিগত পরিচয়ে। ফলে বিশ্বব্যাপী এর একটি ক‚টনৈতিক প্রতিক্রিয়াও ঘটেছে। এবং বিশ্ব গণমাধ্যমে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও ক্ষতুœ হয়েছে।

মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী দক্ষিণ এশীয় গণসম্মিলনের সভাপতি বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রসরাজ একজন মৎসজীবী, ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। সে তো ফেসবুকই চালাতে পারে না, ফেসবুকে কিভাবে সে স্টাটাস দিবে? ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভুক্তভোগীর প্রত্যেকেই এরকম কোন না কোনভাবে ষড়যন্ত্রের শিকার। বর্তমানে পুলিশের মস্তিষ্কে ধর্মান্ধতা ঠাই নিয়েছে। আগে তাদেরকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। এই ডিজিটাল আইনটি মামলা করা হচ্ছে হিন্দুদের বিরুদ্ধে অথচ আব্বাসী, চরমোনাইয়ের পীরদের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে না।’

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তাপস বল বলেন, ‘মৌলবাদীরা বেছে বেছে সংখ্যালঘুদের বিশেষ করে হিন্দুদের টার্গেট বানিয়ে আইসিটি আইনে মিথ্যা মামলা দেয়। আইসিটি আইন সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যথাযথ প্রশিক্ষণ না থাকায় তারা সে মিথ্যা মামলা নথিভুক্ত করে। এর ফলে ভুক্তভোগীরা মিথ্যা মামলায় নিজেদের অর্থকরী মান-সম্মান সময় সবকিছু হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে। সরকারের উচিত অবিলম্বে আজকের উপস্থিত ভুক্তভোগীসহ সকল ভুক্তভোগীদের ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে তাদেরকে স্বাধীন ও সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকার ফিরিয়ে দেয়া।

মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ভাষাসৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পৌত্রী মানবাধিকার নেত্রী আরমা দত্ত এমপি বলেন, ‘ অনেক কষ্টের বিষয় যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষ দিনের পর দিন ভুগছে। যারা আইনটি প্রয়োগ করছে তারাও হয়তো এটা জানে না। আইনটি রাষ্ট্রের উপকারের জন্য করা হলে এখন এটি অনেক মানুষের ক্ষতি করছে। এই মিথ্যা মামলাগুলো থেকে ভিকটিমদেরকে যেন মুক্তি দেয়া হয়, আইনটিকে যেন আবার রিভিউ করা হয় এটা সরকারের কাছে আমার বিনীত অনুরোধ।’

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সমাজকর্মী কাজল দেবনাথ বলেন, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রথম ভিকটিম অভিযুক্তের গ্রামের লোক। এরপর অভিযুক্ত জামিনের পর দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়। ভোগান্তির শিকার হতে হয়। আইনটাই যদি হয় ভিকটিমের বিরুদ্ধে, তাহলে সেখানে কোন ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ নেই। ওয়াজে কি ভিন্ন ধর্মের বিরুদ্ধে বলা হচ্ছে না? সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর জ্বলছে কিন্তু আসল সন্ত্রাসীরা তো গ্রেফতার হচ্ছে না। আইনটি যেন সঠিক জায়গায় প্রকৃত অপরাধীদের জন্যই প্রয়োগ করা হয়।’

নির্মূল কমিটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আইন সম্পাদক এডভোকেট নাসির মিঞা বলেন, ‘মৌলবাদীদের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের ভিকটিম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রসরাজের বিরুদ্ধে সিআইডি এবং পিবিআই এর ফরেনসিক প্রতিবদনে পোস্ট দেওয়ার কোনো তথ্য না পাওয়া গেলেও তাকে অভিযুক্ত করে তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অপরদিকে সঞ্জু বর্মণের মামলাটি শিশু আদালত ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিচারাধীন। রসরাজ এবং সঞ্জু বর্মণ দুজনই অক্ষরজ্ঞানহীন। তারা কেউই ফেসবুক অপারেট করতে জানে না। তাদেরকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মামলাতে জড়ানো হয়েছে।’

সংযুক্তি: ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভিকটিমদের লিখিত বক্তব্য

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভিকটিম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রসরাজ দাস (আইনজীবীর মাধ্যমে প্রদত্ত)

আমি একজন নিরীহ মৎস্যজীবী। জলাশয় থেকে মাছ আহরণ করে বিক্রিত আয় থেকে বৃদ্ধা মা সহ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কোনোমতে জীবনধারণ করি। মিথ্যা অভিযোগে সা¤প্রদায়িক সহিংসতার শিকার হয়ে এবং তথ্য ও যোগাযোগ আইনের মিথ্যা মামলার অভিযুক্ত আসামি হয়ে মামলার ঘানি টানতে টানতে এখন আমি নিঃস্ব। স¤প্রতি আমার বিরুদ্ধে করা মামলাটি চট্টগ্রামের সাইবার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হয়েছে। এই মামলা প্রতিনিয়ত আমাকে দিশেহারা করে দিচ্ছে।

আমি ষড়যন্ত্রের শিকার। ২০১৬ সালের ২৯ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টায় আমি যখন পার্শ্ববর্তী বালিংখা বিল থেকে তিন দিন মাছ ধরে বিক্রি করার জন্য হরিণবেড় বাজারে আসি তখন একই ইউনিয়নের শংকরাদহ গ্রামের মোঃ জাহাঙ্গীর আলম (২৫), মোঃ সালাম খান (২৫), ঈসমাইল (২৫), মোঃ রবিউল হাসান (২৪) এবং হরিণবেড় গ্রামের রিপন মিয়া (২৫) সহ স্থানীয় ৮/১০জন লোক আমাকে বেধড়ক মারধর শুরু করে।

তৎক্ষণাৎ খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে আমাকে উদ্ধার করে নাসিরনগর  থানায় নিয়ে যায়। এ ঘটনায় পুলিশ আমাকে আসামি করে ওই দিনই নাসিরনগর থানায় মামলা করে। ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আমাকে পরদিন আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠায়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উল্লেখিত মামলায় আমাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৩১ অক্টোবর ৭ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করলে বিজ্ঞ আদালত ৩ নভেম্বর রিমান্ড আবেদন শুনানির  দিন ধার্য করেন।

৩ নভেম্বর আদালতের বারান্দায় প্রায় শতাধিক বিজ্ঞ আইনজীবী বিক্ষোভ মিছিল করে এক ভীতিকর পরিবেশের সৃষ্টি করলে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের অসহযোগিতায় আমি কোনো আইনজীবীকে জামিন আবেদনের জন্য ওকালতনামাও দিতে পারি নাই। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞ হাকিম (সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যজিস্ট্রেট সুলতান সোহাগ উদ্দিন) আমাকে কোনো কিছু জিজ্ঞাসা করেন নাই। এমনকি আমি কোনো আইনজীবী নিয়োগ করব কী না তাও জিজ্ঞাসা না করেই আমাকে ৫দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করলে ওই দিনই অর্থাৎ ৩ নভেম্বর আমাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়।

এদিকে, আমি যখন জেলহাজতে তখন সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক ও বিশিষ্ট লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির একটি প্রতিনিধি দল ২০১৬ সালের ৫ নভেম্বর নাসিরনগরের ঘটনাস্থল সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং তদন্ত করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সার্কিট হাউজে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন যে, উক্ত ঘটনা ও নাসিরনগরে সা¤প্রদায়িক সহিংসতার সাথে আল আমিন সাইবার পয়েন্ট ও স্টুডিও’র মালিক এবং এই মামলার ১ নং সাক্ষী মোঃ জাহাঙ্গীর আলম জড়িত। তাদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে পুলিশ সুপার মহোদয় উক্ত মামলার তদন্তের ভার জেলা গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) হাতে অর্পণ করেন। মামলা তদন্তকারী  কর্মকর্তার আবেদনের  প্রেক্ষিতে বিজ্ঞ আদালত আমার মোবাইল, মেমোরি কার্ড ও স্ক্রিন শটের ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য অনুমোদন প্রদান করেন। ৮ নভেম্বর তদন্তকারী কর্মকর্তা ৫দিনের রিমান্ড শেষে আমাকে আদালতে উপস্থাপন করে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুনরায় ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। একই দিন আইনজীবীর মাধ্যমে আমি জামিনের আবেদন করলে বিজ্ঞ আদালত উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে জামিন ও রিমান্ড আবেদন নামঞ্জুর করেন।

এদিকে, ঘটনার নেপথ্য নায়ক মোঃ জাহাঙ্গীর আলম আত্মগোপনে চলে গেলে আদালতের অনুমতিক্রমে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ২০১৬ সালের ১৩ নভেম্বর আল আমিন সাইবার পয়েন্ট ও স্টুডিও তল্লাশি করে মোঃ জাহাঙ্গীর আলমের দুটি হার্ডডিস্ক, দুটি পেনড্রাইভ এবং একটি মোবাইল জব্দ করেন। জাহাঙ্গীর আলমকে পুলিশ ২৯ নভেম্বর (২০১৬) নাসিরনগর থানার মামলা নং-২২এ (ধারা- ১৪৩/৪৪৭/৪৪৮/৩২৩/৩৮০/২৯৫/২৯৫(ক)/৪২৭দঃবিঃ) গ্রেপ্তার করে। আমার মামলায় (মামলা নং -২১)। তদন্তকারী কর্মকর্তা ২ ডিসেম্বর (২০১৬) মোঃ জাহাঙ্গীর আলমকে গ্রেপ্তার দেখানোর জন্য আবেদন করেন। এদিকে, জাহাঙ্গীর আলমকে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, বিতর্কিত ছবিটি তার পিসির হার্ডডিস্কে রক্ষিত আছে এবং উক্ত হার্ডডিস্কটি তার বন্ধু বদরুদ্দিনের ঘরে রয়েছে। তার দেয়া তথ্যমতে মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা এস.আই মিজানুর রহমান জাহাঙ্গীরকে সাথে নিয়ে শংকরাদহ গ্রাম থেকে বন্ধু বদরুদ্দিনের ঘরের আলমারীর ভেতর থেকে দুটি হার্ডডিস্ক জব্দ করেন এবং আদালতের অনুমিতক্রমে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য সিআইডিতে পাঠান। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল যে, ফরেনসিক পরীক্ষায় মোঃ জাহাঙ্গীর আলমের হার্ডডিস্কের ভিতরে পবিত্র কাবা শরীফের উপর শিবের মূর্তি সংযুক্ত বিতর্কিত ছবিটি পাওয়া যায়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কর্তৃক আদালতে পেশকৃত আমার মোবাইল, মেমোরি কার্ড, সিম কার্ডসহ কথিত পোস্টের স্ক্রিন শর্টের ফরেনসিক ল্যাবের পরীক্ষার প্রতিবেদনে ওই ছবিটির অস্তিত্ব সম্পর্কে কোনো সুষ্পষ্ট তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। উক্ত প্রতিবেদনের মতামত অংশে দেখা যায়, ফেসবুক আইডি ‘জধংৎধল উধং’ পরীক্ষা করে ফেসবুক আইডিতে “পবিত্র কাবা শরীফের উপর শিবমূর্তি স্থাপনকৃত অবস্থার কোনো ছবির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, আমার ফেসবুক টাইমলাইনে গত ২৯/১০/২০১৬ তারিখে সকাল ১১.২৪ মিনিটে ক্ষমা প্রার্থনার একটি পোস্ট পাওয়া যায়। যা আশুতোষ দাস দিয়েছিলেন বলে বিজ্ঞ আদালতে ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেয়া বিবৃতিতে জানান। এছাড়া ক্ষমা প্রার্থনা করার কথিত পোষ্টেও আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এমন কি কোনো সাক্ষী ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬১ ধারায় প্রদত্ত জবানবন্দিতেও উল্লেখ করেননি।

মোঃ জাহাঙ্গীর আলম এবং তার সাঙ্গ-পাঙ্গরা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে আমাকে অকথ্য নির্যাতন করে পুলিশে সোপর্দ করেন। পরবর্তীকালে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করে রিমান্ডে নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে। সেসব বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা মনে হলে এখনো গা শিউরে ওঠে। দীর্ঘ ২ মাস ১৮দিন হাজতবাসের পর জামিনে মুক্তিলাভ করে দীর্ঘ ৫ বছর যাবৎ প্রতি মাসে বিজ্ঞ আদালতে নিয়মিত হাজিরা দিয়ে আসছি। আমি দিন এনে দিন খাওয়া একজন মানুষ। একদিন মাছ না ধরলে না খেয়ে থাকতে হয়। আদালতে হাজিরা দিতে গিয়ে যাতায়াত খরচ জোগাড় করাসহ একদিনের মাছ ধরতে না পারার ফলে পরিবারের আহার জোগাড়ে হাজার টাকার দেনার দায়ে আবদ্ধ হতে হচ্ছে। এতে করে দিন দিন দেনার দায় বাড়ায় দিশেহারা অবস্থায় আছি। আমার বিরুদ্ধে সিআইডির ফরেনসিক রিপোর্টে কথিত পোস্টে আমার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি প্রমাণিত হয়নি। এছাড়া মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ঘটনাস্থলের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন না করেই আমাকে এবং মোঃ জাহাঙ্গীর আলমকে অভিযুক্ত করে বিগত ২৯/১২/২০২১ তারিখে বিজ্ঞ আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন। বিজ্ঞ আদালত এর পরদিনই গত ৩০ ডিসেম্বর মামলাটি বিচারের জন্য সাইবার ট্রাইব্যুনাল, চট্টগ্রামে প্রেরণ করেন। আমি কোনোদিন চট্টগ্রামে যাই নাই। তা ছাড়া চট্টগ্রামে আসা যাওয়া করার মতো আমার কোনো আর্থিক সঙ্গতিও নাই। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিজ্ঞ মানবিক আইনজীবীগণ বিনা ফিতে আমার মামলাটি পরিচালনা করেছেন। চট্টগ্রামের মতো অপরিচিত জায়গায় আমার মামলা ফি দিয়ে পরিচালনা করার মতো আমার কোনো সামর্থ নাই। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে আমি চরম আর্থিক দুরাবস্থার মধ্যে রয়েছি। এমতাবস্থায় এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা মামলা থেকে আমি মুক্তি চাই।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভিকটিম সুনামগঞ্জের ঝুমন দাস

আমি রাজনৈতিকভাবে কোনো দল করি না। তবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে আমি অনুপ্রাণিত, স্বাধীনতার স্বপক্ষে অবস্থানকারী। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের বাড়ি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। আমাদের বাড়িতে সাতজন বীর মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন, এখনো ৪ জন জীবিত আছেন। আমি সবসময় বঙ্গবন্ধু, স্বাধীনতা এবং অসা¤প্রদায়িক বাংলাদেশ নিয়ে লিখি। স্বাধীনতার বিরোধীদের বিরুদ্ধে আমার অবস্থান ছিল সবসময় স্পষ্ট।

২০২১ সালের ১৫ মার্চ হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনল হক আমাদের পার্শ্ববর্তী উপজেলা দিরাই আসেন। ওখানে তিনি বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার ঘোষণা দেন। তাছাড়া উনি সনাতন ধর্ম নিয়েও বাজে মন্তব্য করেন। আমি পরের দিন ২০২১ সালের ১৬ মার্চ সকাল ১০ টায় মামুনুল হকের সা¤প্রদায়িক বক্তব্যের প্রতিবাদ করে ফেইসবুকে একটি পোস্ট দেই। এই দিনই স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থানকারীদের নতুন প্রজন্মরা এটা ভাইরাল করে দেয়। শাল্লা উপজেলার আওয়ামী লীগের সভাপতি ওলিউল হকের ছেলে শাহরিয়ার নেপচুন মসজিদের মাইক দিয়ে আমার বিরুদ্ধে সবাই একত্র হওয়ার আহŸান জানায়। যখন আমাদের বাড়িতে সবাই বিষয়টা শুনে আমাকে বকাবকি করে। আমি নাকি বড় হুজুরের বিরুদ্ধে লিখেছি, বাড়ির সবাই আওয়ামী লীগ। সবাই বলল এখন তোকে তোর বঙ্গবন্ধু বাঁচাবে? আমাকে আমার এক কাকা চড় দিলেন। রাগে অপমানে আমি বাড়ি ছেলে পাশের একটি বাজারে চলে যাই। ঠিক তখন আমার বাড়ি থেকে ফোন দিয়ে বলল, যদি আমি পুলিশের হাতে ধরা না দেই তবে আমার বাড়িতে হামলা হবে, সবাই বিপদে পড়বে।

আমি পুলিশের হাতে আত্মসমর্পন হলাম। ওইদিন থানায় পুলিশ আমাকে খুব মারধর করে। তখনও আমার বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি। রাত তিনটায় আমাকে সুনামগঞ্জ নিয়ে যায় পুলিশ।

পরদিন রাত নয়টায় আমাকে কোর্টের নির্দেশে কারাগারে প্রেরণ করে। এক পুলিশ অফিসার জানিয়েছিল যে, হামলাকারীরা আমার সহ গ্রামের সবার বাড়িঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে।

আমি অনেক কাঁদলাম, কারাগারে যাবার সাতদিন পরে বুঝতে পারলাম আমার নামে মামলা হয়েছে। বাড়ি-ঘরে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে আমার মা মামলা করেন। সেই মামলায় হামলাকারীরা জেলে যাওয়ার পর তারা কারাগারের ভেতর থাকা হাজতীদের কাছে আমার নামে গুজব ছড়ায় যে, আমি নাকি ইসলাম অবমাননা করেছি। এরপর কারাগারের ভেতরেই তারা আমাকে খুন করার হুমকি দেয়। আমি তখন একা। কিছুই করার ছিল না আমার। আমি রুম থেকে বেরুলেই তারা আমাকে মারার হুমকি দিত। পরে মাননীয় জেল সুপার মহোদয় আমাকে কিছুটা নিরাপত্তা দিলেন। তারপরেও আমি প্রতিনিয়ত তাদের হুমকির মুখে ছিলাম। সারাদেশের মানবিক মানুষদের চেষ্টায় ২৩/০৯/২০২১ তারিখে আমার জামিন দেয় হাইকোর্ট। আমি ২৮/০৯/২০২১ তারিখে কারাগার থেকে বের হয়ে নিজ বাড়িতে ফিরি। তখন থেকেই আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।

বঙ্গবন্ধুর পক্ষে কথা বলায় আর সাঈদীকে রাজাকার বলায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ওলিউল হকের ছেলের সাথে আমার ফেইসবুকে একদিন কথা কাটাকাটি হয়। সেদিন থেকেই সে আমায় দেখে নেয়ার হুমকি দেয়। কিছু করতে না পারলেও মিথ্যা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ তুলে তারা আমাদের বাড়িতে হামলা করে। আমাদের গ্রামের ৮টি মন্দির ভেঙে ফেলে এবং সবকিছু লুটপাট করে নেয়।

আমি প্রায় সাত মাস জেল খেটে সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে বসে আছি। ভয়ে এখন কোনো কর্মসংস্থানেও যোগ দিতে পারছি না। উপজেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি, উপজেলা চেয়ারম্যান আল আমিন চৌধুরী বলেছিলেন আমাকে পুলিশের হাতে তুলে দিলেই সবাই শান্ত হবে, কেউ কিছু করবে না। আমি কোনো অপরাধ না করেও পুলিশের হাতে আত্মসমর্পন করেছি। তারপরেও কেন আমার বাড়িতে, আমার গ্রামে হামলা করা হলো তার উত্তর আজ পর্যন্ত পেলাম না। আমি এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলা নিয়ে অনেক ভোগান্তি এবং হয়রানির মধ্যে আছি। এই মামলা থেকে আমি মুক্তি চাই।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভিকটিম কুমিল্লার অনিক ভৌমিক

২০২০ সালের ১লা নভেম্বর সকালে ঘুম থেকে উঠে কাকার ঔষধের দোকানে যাই। প্রতিদিনের মতো সেই দিনও ফেসবুকে ঢুকি এবং বন্ধুদের সাথে চ্যাট করি। কিন্তুু হঠাৎ দেখি আমার মাসির ছেলে অর্থাৎ মাসতুতো ভাই আমার নিজ আইডি অহরশ ইযড়সিরশ জধল-এ একটি ছবি ট্যাগ করেছে। তারপর সেই ছবিতে আমি একটি লাইক দেই। লাইক দেওয়ার ফলে আমার ফেইসবুক ফ্রেন্ডদের কাছে দৃশ্যমান হয় যে, আমি এরকম একটা ছবিতে লাইক দিয়েছি। তাছাড়া আমাকে ট্যাগ করার ফলে ছবিটি আমার টাইমলাইনে এসে জমা হয়েছে।

আমার কয়েকজন পূর্বপরিচিত বন্ধু এই ছবিটি দেখে এবং আমাকে শাস্তি দেয়ার জন্য তারা মিটিং করে সিদ্ধান্ত নেয়। এই বন্ধুদের মধ্যে প্রধান লিডার ছিল মাসুম বিল্লাল এবং আরাফাত  গাফফার মিয়া সহ আরোও অনেকে। এরপর তারা আমাদের বাদামতলী বাজারের কমিটির সাধারণ সম্পাদকের কাছে বিষয়টি জানায়। বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক সোহেল মিয়া আমাকে আমার কাকার দোকান থেকে ডাক দিয়ে নিয়ে যায় এবং সেখানে নিয়ে তার দোকানের ভেতরে বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন শুরু করে। এক পর্যায়ে আমার হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে যেতে চায়। তখন আমি একটু জোর গলায় বললাম, আমি আমার ফোন দেব না। তখন সে আমাকে দুইটা থাপ্পড় মারে।

যে ছেলেরা আমার বিষয়ে অভিযোগ এনেছিল তারা তৎক্ষণাৎ একসাথে মিছিল করা শুরু করে। সেই খবর আমাদের উপজেলার চেয়ারম্যানের বাড়ি হায়দারাবাদ তখন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব হারুন আর রশিদ সাহেব বিষয়টি জানতে পেরে বাজার কমিটির নেতা সোহেল মিয়াকে বলেন বিষয়টা যেন মিটমাট করে দেওয়া হয়। তারপর আমাদের আন্দিকুট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আসেন এবং আমাকে বলেন যে, বিষয়টা শেষ করে দিব তোর বাবা মাকে বল আমাকে ৩০ হাজার টাকা দিতে। টাকা দিলেই এই বিষয়টা মিটমাট করে দিব। তখন আমি তাকে বলেছিলাম, আমি কি এমন অন্যায় করছি যে সেটার মাশুল টাকার মাধ্যমে শেষ করতে হবে? তখন সোহেল আমাকে গালি দিয়ে বলে যে, তোর মুখে এতবড় কথা? তখন চেয়ারম্যান পুলিশে ফোন দিলে সিদ্ধিরগঞ্জ ফাঁড়ি থেকে পুলিশ আসে। তখন আমার কাকাত ভাই কার্তিক কাকার দোকান থেকে ১০ হাজার টাকা এনে চেয়ারম্যানের হাতে দেয়। কিন্তু চেয়ারম্যান ১০ হাজার টাকা না নিয়ে বলে ৩০ হাজার টাকার কমে বিচার মিটমাট হবে না। তারপর চেয়ারম্যান বলেন এই সোহেল থানায় একটা ফোন দিয়ে দেও তো। তারপর সোহেল থানায় ফোন দেয়ার পর পুলিশ আসলো। তখন চেয়ারম্যান আর সোহেল বলে, এই নাস্তিকের বাচ্চাকে থানায় নিয়ে যান আমি আসতেছি। তখন আমার হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। থানার ওসি অমর চন্দ্র দাস আমার নাম, বাবার নাম, ঠিকানা, বয়স ইত্যাদি জিজ্ঞেস করেন।

তারপর আমার মা আসলো আমাকে দেখতে। ওসির রুম থেকে যখন সোহেল এবং চেয়ারম্যান বেরিয়ে যায় তখন সোহেল আমার মাকে বলে, তোমার এই ছেলে টাকার মর্ম বুঝে না। টাকাটা দিলে কিন্তু এত কিছু হতো না বৌদি। এসব বলে সে চলে গেল। পরে শুনেছিলাম বাবা নাকি থানার গেইটে দাঁড়িয়ে ছিল। আমার বাবাকে তারা বলে যে আপনার ছেলেকে কিন্তু জেলে পাঠাইয়া দিমু যদি টাকা না দেন। আর যদি টাকা দেন তাহলে মামলাটা না করার চেষ্টা করব। তারপর আমার বাবা লিটন মিয়ার সাথে কোনো কথা বলে নাই। আমার বাবা পিসির বাড়ি থেকে ৩০ হাজার টাকা নিয়ে থানায় আসে। তখন টাকা নিয়ে ওসি অমর দাসের রুমে এসে বাবা বলে যে, আমার ছেলেকে স্যার ছেড়ে দেন। তখন ওসি অমর দাস বলেন, দেখেন এই বিষয়টা নিয়ে মামলা হয়ে গেছে, আমার কোনো কিছু করার নাই, যা করার করবে আদালত। তখন বাবা থানা থেকে বাড়িতে চলে যায়। রাতটা সেদিন থানায় কাটে মশার কামড়ে। তারপর ঠিক রাত ৪ টার সময় হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে গাড়িতে করে কুমিল্লায় নিয়ে আসে এবং কোর্টের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। তারপর দীর্ঘ ১১ মাস ৯ দিন হাজতবাসের পর কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পাই। আমি এই হয়রানিমূলক মামলা থেকে মুক্তি চাই।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভিকটিম বেগম বদরুন্নেসা মহিলা কলেজের সহকারি অধ্যাপক রুমা সরকার

বঙ্গবন্ধুর আদর্শ সৈনিক আমার বাবার পথ অনুসরণ করে আমি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অবিচল আছি। সবসময় সোচ্চার থেকেছি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধীদের বিরুদ্ধে। সেই অবস্থান থেকেই গত ১৯শে অক্টোবর ২০২১- এ পূজামন্ডপে পবিত্র কোরআন রাখাকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী ঘটতে থাকা সা¤প্রদায়িক আক্রমণ প্রতিহত করার কথা বলি। যার মধ্যে ধর্মের বা রাষ্ট্রের এমন কি সমাজের বিভাজন তৈরি হয় এমন কোনো কথা বলি নি। তারপরেও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে ১৯ শে অক্টোবর দিবাগত রাতে র‌্যাব আমার বাসার দরজা ভেঙে আমার ৭ বছর বয়সী দুটো জমজ শিশুর সামনে থেকে জোর করে তুলে নিয়ে যায়। নিয়ে গিয়ে র‌্যাবের সদর দপ্তরে আমাকে পরবর্তী ৩৫ ঘন্টা আটকে রাখে। এরপর সদর দপ্তর থেকে মধ্যরাতে র‌্যাব-৩ এ নিয়ে গিয়ে নানাবিধ হয়রানি করে। যেমন ছবি তোলাসহ, গায়ে পরা দুর্গার মালা ছিড়ে ফেলার চেষ্টা করে। সেখান থেকে ২১ অক্টোবর ভোরে আবার রমনা থানায় নিয়ে আসে এবং আমার নামে মামলা দায়ের করে। আমার ২ টি ফোন জব্দ করা হয়। ফোন ২টি আমাকে এখনো ফেরত দেয়া হয়নি। আমার দুটি সন্তান দার্জিলিংয়ের অনলাইন ক্লাশ করতো। তাদের পড়াশোনা ব্যাহত হয়েছে।

এরপর আদালতের নির্দেশে দু’দিনের জন্য রিমান্ডে নেয়া হয়। রিমান্ড শেষে ২৪ অক্টোবর আমাকে আবারও আদালতে উপস্থাপন করে। এরপর আদালতের নির্দেশে আমাকে কাশিমপুর কারাগারে প্রেরণ করে। আদালতের নির্দেশনা সত্তে¡ও আমাকে ডিভিশনে না রেখে সাধারণ বন্দীদের সঙ্গে পরবর্তী ৭০ দিন রাখে। কারাবাস শেষে ৩০ ডিসেম্বর, ২০২১ জামিনে বের হই। জামিনে মুক্তি লাভ করেও কর্মক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত সহকর্মীদের দ্বারা হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছি। আমি সর্বদা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে এবং রাষ্টের স্বার্থে কাজ করে আসছি। এরপরেও আমাকে পূর্বপরিকল্পিত এবং উদ্দেশ্যমূলকভাবে মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। এই মামলা থেকে আমাকে নিঃশর্ত মুক্তি দানের ব্যবস্থা করার জন্য বিনীতভাবে অনুরোধ করছি।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভিকটিম মুন্সিগঞ্জের শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মন্ডল

২০ মার্চ, ২০২২ সেদিন বিজ্ঞানের ক্লাস নিচ্ছিলাম। কয়েকজন ছাত্র এর মধ্যে আমাকে ধর্মীয় নানা প্রশ্ন করতে থাকে। আমি বুঝিনি যে আমার কথাগুলো রেকর্ড করা হচ্ছে। আমি তাদের প্রশ্নগুলোর জবাব যেটা হওয়া উচিত সেভাবেই দিচ্ছিলাম। কিন্তু এর কিছুক্ষণ পরই সেই কয়েকজন ছাত্র স্কুলের মাঠে বিক্ষোভ শুরু করে। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় বাইরের কিছু লোক। বিক্ষোভ চরম আকার ধারণ করলে হেডমাস্টার লিখিতভাবে আমাকে শোকজ করেন। শুধু তাই নয় তিনি পুলিশ ডেকে আনেন। আমাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এই ঘটনাটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত। আমার এলাকা ও আমার স্কুলের কিছু বিপথগামী শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্য এ ঘটনার পেছনে জড়িত। তারাই বাইরের লোকদের সঙ্গে আঁতাত করে এ ঘটনা ঘটিয়েছেন। স্কুলে আমিই একমাত্র শিক্ষক যে কিনা ক্লাসে ছাত্রদের পড়াশোনার বিষয়ে বেশি বেশি করে বলতাম। আমাকে ছাত্ররা পছন্দ করতো যেটা ওই শিক্ষকদের হিংসার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ কারণেই আমার উপর তাদের আক্রোশ ছিল অনেক আগে থেকেই।

আগে এমন ঘটনা না ঘটলেও আমাকে নানাভাবে হয়রানি করতেন কিছু শিক্ষক। গত কয়েকমাস ধরেই আমি অপরিচিত লোকদের দ্বারা হয়রানির শিকার হচ্ছিলাম। যেমন, আমার বাসার দরজায় ইট-পাথর নিক্ষেপ করা, আমাকে অনুসরণ করা। কয়েকদিন এমনও হয়েছে কয়েকজন যুবক আমার বাসার সামনে দিয়ে চিৎকার করতে করতে গিয়েছে এই বলে, ‘ইসলামের শত্রæরা হুশিয়ার সাবধান’। আমি কখনো এলাকায় কিংবা ক্লাসে ধর্মের বিরুদ্ধে বিশেষ করে ইসলামের বিরুদ্ধে কিছু বলি নি, করি নি। কেউ কখনো আমার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আনতে পারবে না। অথচ এই অভিযোগেই আমাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে তারা। নানাভাবে হয়রানি করে আমাকে টলাতে না পেরে এবার আমার বিরুদ্ধে ধর্মকে ব্যবহার করেছে।

শিক্ষক হিসেবে আমি সবসময় আমার সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করেছি। তবে এ ঘটনায় দুঃখ পেলেও ভেঙে যাইনি। কারাবাসে দুঃখবোধের জায়গা থেকেই মনে হয়েছে, যাদের জাগাতে চাচ্ছি তারাই যদি বিপথগামী হয় তাহলে তার পরবর্তী প্রজন্ম কিভাবে যথাযথভাবে বেড়ে উঠবে? সরকার এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট আমার আকুল আবেদন ও অনুরোধ আমার নামে দায়ের করা ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলাটি যেন প্রত্যাহার করা হয় এবং প্রতিটি স্কুলে বিজ্ঞানের শিক্ষক যেন বিজ্ঞানই পড়ান, গডুতের শিক্ষক গডুত। এক বিষয়ের ক্লাসে গিয়ে অন্য বিষয় যেন কেউ না পড়ায়। যেমন বিজ্ঞানের ক্লাসে ধর্ম পড়ানো যাবে না কিংবা ধর্ম ক্লাসে বিজ্ঞান পড়ানো যাবে না। একইভাবে গডুতের ক্লাসে ধর্ম কিংবা বিজ্ঞান পড়ানো যাবে না। এলোমেলো শিক্ষা দান করার ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। এর ফলে বিভিন্ন সময়ে তাদেরকে ব্যবহার করতে পারছে কিছু সা¤প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন শিক্ষক কিংবা অন্য কেউ।’ এই মামলাটির ফলে আমি হয়রানির শিকার হচ্ছি। এই মামলা থেকে আমি মুক্তি চাই।

সিলেটের রাকেশ রায়

ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে বাংলাদেশ কৃষক লীগ সিলেট জেলা শাখার প্রচার ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক এবং জাতীয় হিন্দু মহাজোট সিলেট বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক রাকেশ রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের ৫ জুন সাইবার ট্রাইবুনাল সিলেটে ৫৭ (২) ধারায় মামলা দায়ের করে হেফাজত কর্মী ফুজায়েল আহমদ। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ৭ জুন, ২০১৭ তারিখে পুলিশ তাকে কোমরে দড়ি বেঁধে থানায় নিয়ে যায়। এরপর তাকে আদালতের নির্দেশে ৪ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। ২৩/১০/২০১৭ তারিখে তিনি সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেলেও ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে বারবার কারাভোগ করেন। সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবের রিপোর্ট অনুযায়ী নির্দোষ প্রমাণিত হলেও এখনো তিনি এই মামলায় হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

রাকেশ রায় তার লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘২০১৭ সালে গণজাগরণ মঞ্চের ব্যানারে আন্দোলন চলাকালীন মৌলবাদীদের হাতে শহীদ হওয়া আমার গ্রামের হারাধন ও শুকলাল বিশ্বাসের হত্যার বিচারের দাবিতে সোচ্চার ছিলাম। তখন উগ্র ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবে হিন্দু ধর্ম অবমাননাকারী জামায়াত নেতা নওমুসলিম আব্দুল আজিজের বিরুদ্ধে গোলাপগঞ্জ থানায় একটি মামলা করি। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করলেও সে এখন জামিনে আছে। সেই সময় সাম্প্রদায়িক জিহাদী গোষ্ঠী হেফাজত, জামায়াত-বিএনপি চক্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কথিত ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়ায়। এরপর সর্বদলীয় ইসলামী ঐক্যজোটের ব্যানারে মুসলিম লীগ নেতা যুদ্ধাপরাধী  মৃত আব্দুল লতিফের প্রতিষ্ঠিত এতিমখানা ও মাদ্রাসা শিক্ষকদের ব্যবহার করে জকিগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে। কিছু সন্ত্রাসী আমার বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। পুলিশের উপস্থিতি থাকা সত্তে¡ও স্থানীয় পল্লীশ্রী বাজার মসজিদের ছাত্র-ছাত্রীদের দিয়ে আমার ফাঁসির দাবিতে মিছিল করানো হয়। এ নিয়ে হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে দাঙ্গা বাধানোর চেষ্টা করেছিলেন পল্লীশ্রী মসজিদের ইমাম।

‘এরপর জমিয়ত নেতা হেফাজত কর্মী ফুযায়েল আহমদ বাদী হয়ে আমার বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্মের অবমাননার অভিযোগ তুলে জকিগঞ্জ থানায় ০৫/০৬/১৭ তারিখে একটি মামলা করেন। বর্তমান মামলা নং জি আর ৮৯/১৭ সাইবার ট্রাইবুনাল ঢাকা ৫৩১/১৮ সাইবার ট্রাইবুনাল সিলেট ৭১/২১। মামলা তদন্ত হওয়ার আগেই সাম্প্রদায়িক জিহাদী সন্ত্রাসীদের চাপের মুখে পুলিশ আমাকে ০৭/০৫/২০১৭ তারিখে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের এক কনস্টেবল আমার ফাঁসির দাবি করে ফেসবুকে পোস্ট করে। পরদিন পুলিশ আমাকে আদালতে হাজির করলে ৪ দিনের রিমান্ডে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। আদালতে আমি একজন আইনজীবীও দাঁড় করাতে পারিনি। রিমান্ড শেষে আমাকে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। সেখানে নিরাপত্তার অজুহাতে আমাকে ফাঁসির আসামীর মত ১ ও ৮ নং সেলে প্রায় ৬ মাস বন্দী করে রাখা হয়।

‘সিলেটের জকিগঞ্জ আদালতে আমার জামিন চাওয়ার জন্য কোন আইনজীবী না পাওয়ায় সিলেট জেলা বারের একজন বিজ্ঞ আইনজীবী সৈয়দ মহসিন আলী সাহেব সিলেট থেকে জকিগঞ্জ আদালতে আসেন গত ১৫/০৬/২০১৭ তারিখে এবং আমার প্রথম জামিন প্রার্থনা করেন। আদালত জামিন নামঞ্জুর করলে আমার আইনজীবী আদালত ত্যাগ করার সময় বাদীপক্ষের লোকজন তার গাড়িটি ভাঙচুর করে। এরপর ১৭/১০/২০১৭ তারিখে মহামান্য হাইকোর্ট ৬ মাসের জামিন মঞ্জুর করলে গত ২৩/১০/২০১৭ তারিখে আমি সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পাই।

‘হাইকোর্টের জামিনের মেয়াদ থাকাকালীন সময়ে বাদীকে হুমকি দিয়েছি মর্মে একটি আবেদনের প্রেক্ষিতে পুলিশের ভুয়া তদন্ত রিপোর্টের আলোকে আদালত আমার জামিন বাতিল করে পুনরায় আবারো আমাকে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠায়। গত ৩০-০৭-২০১৮ তারিখে থানা পুলিশ আদালতে চার্জশীট প্রেরণ করলে সাইবার ট্রাইব্যুনাল ঢাকা আদেশে ধার্য হওয়ার ১ মাস পূর্বে আমাকে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কেরানীগঞ্জ কারাগারে প্রেরণ করা হয়। সেখানে আরো ২ মাস থাকার পর দ্বিতীয় বার হাইকোর্ট ১ বছরের জামিন মঞ্জুর করলে গত ১৪-১১-২০১৯ইং তারিখে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করি। মুক্ত অবস্থায় কয়েকটি হাজিরা দিয়েছি মাত্র। ৩-৪ জন এ পর্যন্ত সাক্ষ্য দিয়েছে। এসময়ে বিশ্বব্যাপী মহামারী করোনা ভাইরাস থাকায় ২টি হাজিরা দেওয়া সম্ভব হয়নি। হাইকোর্টের একটি সার্কুলারে ১ বছরের জামিনের মেয়াদ শেষ হলেও আর নতুন করে বাড়ানোর প্রয়োজন হয়নি উচ্চ আদালতের আদেশে। ইতিমধ্যে সিলেটে নতুন করে সাইবার ট্রাইব্যুনাল ব্রাঞ্চ চালু হলে ঢাকা থেকে মামলাটি সিলেট পাঠানো হয়। আমার ও আমার আইনজীবীর অগোচরে গত ১৪-১১-২০২১ইং তারিখে সাইবার ট্রাইব্যুনাল বিজ্ঞ বিচারক আমার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ইস্যু করলে গত ১১-১২-২০২১ তারিখে জকিগঞ্জ থানা পুলিশ গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে সিলেট কারাগারে প্রেরণ করে । প্রায় ২ মাস সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে ৩৪নং সেলে আটক থাকার পর গত ০৭-০২-২০২২ইং ধার্য তারিখে আদালত জামিন মঞ্জুর করেন। এর একদিন পর গত ০৯-০২-২০২২ ইং তারিখে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পাই। মুক্ত অবস্থায় ২টি হাজিরা দিয়েছি কিন্তু কোনো সাক্ষী আসেনি ।

‘সাক্ষীরাই মূলত অপরাধ করেছে এবং তার সঙ্গ দিয়েছে হেজাবি আদর্শে বিশ্বাসী রাষ্ট্রযন্ত্রের কিছু লোক। গত ০৮-০৮-২০১৭ইং ও ০৫-০৪-২০১৮ইং ২ দফা সিআইডি ফরেনসিক ল্যাবরেটরি ঢাকার রিপোর্টে তদন্ত কর্মকর্তা কর্তৃক চাহিত তথ্য পাওয়া যায়নি মর্মে রিপোর্ট দেওয়ার পরও আমি এখনো আসামী হিসেবে মামলার ঘানি টানছি। অথচ আজ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের জন্য দায়ী রহমত আলী হেলালী ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের কোনো শাস্তি হয়নি।

‘দীর্ঘ প্রায় ৬ বছর ধরে এই হয়রানীমূলক মামলার ঘানি টানতে গিয়ে অর্থ সংকটে আমার পরিবার পরিজনের আজ দিশাহারা অবস্থা। শিশু সন্তানের শিক্ষা জীবন বিপন্ন । জানি না কবে এ মিথ্যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ মামলা থেকে রক্ষা পাবো। আমি অবিলম্বে এই হয়রানি থেকে মুক্তি চাই।’

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভিকটিম চট্টগ্রামের সৌরভ চৌধুরী

আমি চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) এর পুরকৌশল (সিভিল) বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র। আমি ছিলাম আমার বিভাগের ১ম স্থান অধিকারী ছাত্র এবং পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগে আমার প্রবল সম্ভাবনা ছিল।

আমার পিতা, ২০১৭ সালে পরলোকগমন করেন। তার অবর্তমানে আমি টিউশনি করে খুবই কষ্টে পরিবারের ভরণপোষণ চালিয়ে আসছিলাম। ২০২১ সালের ৩০ই মার্চ দিবাগত রাত ৩.৪০-এ রাউজান থানার পুলিশ কোনো ধরনের ওয়ারেন্ট ছাড়াই আমার বাসায় অভিযান চালায় এবং কোনো কারণ ছাড়াই জোরপূর্বক আমাকে গ্রেফতার করে। আমার মোবাইল, ল্যাপটপ, আইডি কার্ড সহ ব্যক্তিগত আরো কিছু জিনিস জব্দ করে। আমাকে কেন গ্রেফতার করা হচ্ছেÑ এ প্রশ্নের উত্তরে পুলিশ জানায়, উপর মহলের নির্দেশে আমাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে।

রাতেই আমাকে রাউজান থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আমাকে হাজতে বন্দী করে রাখা হয়। সকালে আমাকে ডেকে বলা হয়, আমি নাকি ফেসবুকে ইসলাম ধর্ম এবং হযরত মোহাম্মদ (স) কে নিয়ে কট‚ক্তিপূর্ণ মন্তব্য করেছি। তারা আমার মোবাইল থেকে মন্তব্যগুলো খুঁজে পেয়েছে। আমাকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ এর মামলার আসামী করা হয়েছে। এখন আমি যদি আমার উপর আরোপিত দোষ স্বীকার না করি, তাহলে আমাকে তারা মেরে ফেলবে। এসব কথা শুনে আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। আমিতো এসব ব্যাপারে কিছু জানিই না। তাছাড়া আমি যা লিখিনি তার দোষ কেন স্বীকার করবো? সেইসময় আমাকে স্বীকারোক্তি দেওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো হয়। সেইদিনই আমাকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রেরণ করা হয়। পরবর্তীকালে আমাকে ২৯-৩০ মার্চ, ২০২১ এই দুইদিনের জন্য রিমান্ডে নেওয়া হয় এবং থানায় পুলিশ কর্তৃক পুনরায় আমার প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। সেই দুইদিন আমাকে লাঠি এবং ভোতা অস্ত্র দিয়ে মারাত্মকভাবে টর্চার করা হয়। এক পর্যায়ে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। পরবর্তীতে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে আমাকে বাধ্য করা হয় ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে। এরপর আবার আমাকে পুনরায় জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়। ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট এবং জর্জ কোর্টে ৪ বার আমার জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করা হয়। পরবর্তী সময়ে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়–য়া স্যারের মাধ্যমে আমি হাইকোর্ট থেকে জামিন পেতে সক্ষম হই। দীর্ঘ প্রায় ৬ মাস জেলে থাকার পর ৩০ আগস্ট, ২০২১ এ জামিনে মুক্তি পাই।

উল্লেখ্য, আমি ইসলাম ধর্ম নিয়ে কট‚ক্তিপূর্ণ মন্তব্য করেছি এই বিষয়গুলো পত্রপত্রিকা এবং অনলাইন মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যাওয়ায় আমার পরিবারের পক্ষেও বেঁচে থাকাটা অনেক কঠিন হয়ে পড়েছিল। তারা বিভিন্ন সময় আত্মগোপন করতে বাধ্য হয়েছিল। বিভিন্ন সময় আমার পরিবারের সদস্যদেরকে লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে। আমার মামলার খরচ জোগাড় করতে গিয়ে এবং সেই ৬ মাস পরিবারের ভরণপোষণের জন্য বিভিন্ন আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকে প্রচুর ধারদেনা করতে হয়েছিল।

অন্যদিকে, আমাকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় জেলে প্রেরণের পর ধর্মান্ধ শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের চাপে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিসিপ্লিন কমিটি আমাকে তখন সাময়িকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করে। পরবর্তীকালে আমি জেল থেকে মুক্তি লাভের পর আমাকে ৩ বছরের (২০২৪ পর্যন্ত) জন্য বহিষ্কার করে।উল্লেখ্য, আমাকে যখন গ্রেফতার করা হয় তখন আমার স্নাতক শেষ সেমিস্টারের পরীক্ষা চলছিল। আর মাত্র ৫টি পরীক্ষা দিলেই আমি বিভাগের ১ম স্থান অধিকারী ছাত্র হিসেবে স্নাতক সম্পন্ন করতে পারতাম। এই ঘটনায় আমি এবং আমার পরিবারের সদস্যদের জীবন তছনছ হয়ে গিয়েছে। ধর্মান্ধ জনগোষ্ঠীর ভয়ে এখনো আমাদেরকে লুকিয়ে চলাফেরা করতে হয়। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় ছাত্র আমাকে প্রকাশ্যে খুন করার হুমকি দেয়। এজন্য আমি আগের মত প্রকাশ্যে চলাচল করতে পারছি না। বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে টিউশনি করাও সম্ভব হচ্ছে না আমার পক্ষে। আমার পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই করুণ। বর্তমানে আমরা মানবেতর জীবনযাপন করছি। এছাড়া মামলা চালাতে গিয়ে যে বিশাল অর্থের প্রয়োজন তাও আমাদের পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব হচ্ছে না। আমার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। সরকারের কাছে আমার আকুল আবেদন, আমাকে এই মিথ্যা মামলা থেকে নিষ্কৃতি দেওয়া হোক।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভিকটিম পটুয়াখালীর জয়দেব চন্দ্র শীল

১৭ই মে, ২০১৯ তখন রমজান মাস চলমান, আমি সন্ধ্যার দিকে একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ শেষে আমার মেসে ফিরি ঠিক তখন রিয়াজ উদ্দিন মেসে প্রবেশ করে। যেহেতু রমজান মাসের মাঝামাঝি সময় তাই মেসের অনেক সদস্যই বাড়ি চলে গিয়েছিল। শুধুমাত্র মেসের ৬নং রুমের সদস্য যাদের সাথে এসে এই স্থানীয় ছেলে প্রায় সময় আড্ডা দিতো। ঘটনার দিন ২নং রুমের সদস্য এবং তার একজন গেস্ট এবং ৩নং রুমের ৩ জন সদস্য মেসে অবস্থান করছিল। ঐ দিন রিয়াজউদ্দিন অভি নামের ছেলেটি আমার রুমে এসে আমার কাছে আমার সেল ফোনটি চায় সে তার কোনো এক বন্ধুকে জরুরি ফোন দিবে এই বলে। আমি দিতে রাজি হচ্ছিলাম না। সে অনেক অনুনয়-বিনয় করে যে তার ফোনের ব্যালেন্স শেষ হয়ে গিয়েছে তার জরুরি ফোন করতে হবে। তার অনুনয়-বিনয় দেখে তাকে আমি আমার মোবাইল ফোনটি দেই। সে আমার মোবাইল ফোনটি নিয়ে সেই ৬নং রুমে চলে যায়। আমি তারপর ফ্রেশ হতে যাই। ফ্রেশ হয়ে পড়ার টেবিলে বসি। এই রিয়াজউদ্দীন ৩০ মিনিট পর এসে আমার মোবাইলের সম্পূর্ণ চার্জ শেষ করে মোবাইলটা আমার হাতে দিয়ে মেস থেকে বের হয়ে চলে যায়।

আমি যথারীতি মোবাইলটা চার্জে বসাই। ৩০ মিনিট পর মোবাইল ফোনটা অন করতেই দেখা যায় আমার ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে অনেকগুলো হুমকিমূলক ম্যাসেজ। সাথে সাথে বিভিন্ন জায়গা থেকে ফোন আসতে থাকে একের পর এক। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বড় ভাই ফোন করে বলে ‘জয়দেব তুমি কি সা¤প্রদায়িক কোনো পোস্ট কিংবা কমেন্ট ফেসবুকে করছো ?’ আমি রীতিমতো হতবাক। আমি তাকে বললাম, ভাই আমি তো কেবল বাহির থেকে এসে ফ্রেশ হয়ে পড়ার টেবিলে বসলাম। সে আমাকে বলে যে, তুমি ফেসবুকে ঢুকে দেখো কি অবস্থা। আমি আমার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ঢুকতেই দেখি আমার নামে ধর্মীয় উস্কানিমূলক একটি স্ক্রিনশট ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে যা মুহূর্তের মধ্যে সারাদেশে ভাইরাল হয়ে যায়। আমি রীতিমতো ভীত ও হতাশ হয়ে পড়ি। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই রিয়াজ উদ্দিন মেস বহির্ভূত আরো কিছু স্থানীয় ছেলে নিয়ে এসে আমার রুমে আমাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলে। আমার হাত থেকে আমার মোবাইল ফোনটি ছিনিয়ে নিয়ে সবাইকে উস্কে দেয় মারার জন্য এই বলে যে, আমি ধর্ম নিয়ে কট‚ক্তি করেছি। তারপর তারা আমাকে জোর করে ৩নং রুমে নিয়ে যায়। তারপর মেসের ৬নং রুমের আমজাদ হোসেন, মেস বহির্ভূত লোকাল ছেলে রিয়াজ উদ্দিন এবং তার দলবল মিলে আমার উপর আক্রমণ শুরু করে। তারা সারারাত ধরে আমার উপর বর্বরোচিত নির্যাতন চালায়। তারা লোহার রড, স্টীলের পাইপ, এমনকি ইলেকট্রিক শক দিয়ে আমাকে সেই রাতে নির্যাতন করে।

সারারাত অমানবিক নির্যাতনের পর তারা সকালবেলা আমাকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। পুলিশ আমার কোনো কথা না শুনেই যখন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের কথা শুনেছে সাথে সাথে হাতে হাতকড়া পরিয়ে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে আসে। থানায় এনে আমাকে কাস্টোডিতে রাখে। কাস্টোডির ভিতর প্রায় ১৫-২০ জন আসামীকে বন্দী করে রাখা ছিল। সেই ১৫-২০ জনকে ঐ থানার একজন কনস্টেবল আমার বিরুদ্ধে উস্কে দেন এই বলে যে, ও ধর্ম নিয়ে কথা বলেছে ওরে মার। থানার মধ্যে আমি আরেক দফা নির্যাতনের শিকার হই, তাও আবার অ্যারেস্ট করে আনা বন্দী আসামীদের হাতে। কাস্টোডির ভিতরে থাকা এসব উগ্রবাদীরা আমার উপর খুব বাজেভাবে চড়াও হয় এবং প্রচন্ড মারধর করতে থাকে। এক পর্যায় আমি ব্যথায় চিৎকার শুরু করলে অবস্থা খারাপ দেখে থানায় কর্তব্যরত এক সাবইন্সপেক্টর তার রুমে নিয়ে আমাকে হাত কড়া পরিয়ে বসিয়ে রাখে।

সেই ইন্সপেক্টর, যে কিনা পরবর্তীতে আমার মামলার তদন্তকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, তিনি আমার কাছে এক লক্ষ টাকা দাবি করেন এবং বলেন যে, টাকা দিলে সে আমাকে মামলা থেকে বাঁচিয়ে দেবে। তাকে আমি বারবার বুঝাতে চেষ্টা করলাম যে, আমি কিছুই করি নাই আমাকে ফাঁসানো হইছে, আর আমি নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে এই মুহূর্তে এক লক্ষ টাকা কোথায় পাবো? তিনি উল্টো বলেন যে, টাকা না দিলে সে যা করার দরকার সেটাই করবে।

১৮ই মে ২০১৯ তারিখে সারাদিন রাত কুমিল্লা কোতোয়ালি থানার পুলিশ কাস্টোডিতে রাখা হয় আমাকে। ১৯ই মে ২০১৯ তারিখে সকালবেলা আমার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ এর ২৮(১) এবং ২৯(১) ধারায় মামলা দায়ের করে কোর্টে চালান করা হয়। কোর্ট থেকে আমাকে জেল হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে কুমিল্লা শহরে ইসলামি শাসনতন্ত্র বাংলাদেশ এর অনুসারী কুমিল্লা শাখার তারা আমার বিরুদ্ধে কুমিল্লা শহরে মিছিল বের করে। এমনকি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসে হাতে গোনা কিছু মৌলবাদী স্টুডেন্ট আমার স্থায়ী বহিষ্কারের দাবিতে মানববন্ধন করে, যার প্রেক্ষিতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ২৪-৪৮ ঘন্টার মাথায় আমার নামে সাময়িক বহিষ্কার আদেশ জারি করে দেয়। এই ঘটনার সময় আমি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফাইনাল ইয়ারের ফাইনাল সেমিস্টারে অধ্যয়নরত ছিলাম।

কারাগারেও আমি নিরাপদ ছিলাম না। প্রথম দিনেই কারা কর্তৃপক্ষ আমাকে নিয়ে কনডেম সেলে বন্দী করে রাখে। যেখানে সাধারণ বন্দীদের জেনারেল ওয়ার্ডে রাখা হয় সেখানে আমাকে নিয়ে কনডেম সেলে আটকে রাখা হয়। যেই সেলটাতে আমাকে বন্দী করে রাখা হয় সেটার নাম ছিলো যমুনা-২০ সেল যেটার মধ্যে ৭০-৮০% বন্দীই ছিলো মানসিক রোগী। সেই সেলের ৫নং রুমে আমাকে একা একরুমে সার্বক্ষণিক বন্দী করে রাখা হয়। ঐ সেলে আমার অবস্থানের প্রথম দিন ডিউটিরত এক কারারক্ষী আমার মামলার বর্ণনা শুনতেই আমাকে তার পায়ের বুটের লাথি, হাতের বেত দিয়ে প্রচন্ড প্রহার করেন। এরপর প্রায়শই মৌলবাদী অনেক কারারক্ষী আমাকে নানানভাবে মানসিক এবং শারীরিকভাবে নির্যাতন করে। দীর্ঘ ৪ মাস ২৬ দিন আমি কনডেম সেলে বন্দী ছিলাম। দীর্ঘদিন একই স্থানে বন্দী থাকার কারণে আমি শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ি। পরবর্তীতে কারাগারের উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করি যাতে আমাকে সেল থেকে স্থানান্তরিত করে কারাগারের জেনারেল ওয়ার্ডে রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে কারা কর্তৃপক্ষ আমার শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে আমাকে জেনারেল ওয়ার্ডে স্থানান্তর করে। প্রাথমিক অবস্থায় কারাগারে আমার পরিবারের লোকজনের সাথেও আমাকে সাক্ষাৎ পর্যন্ত করতে দেয়া হয়নি।

কোর্টে আমি বার বার জামিনের আবেদন করলেও জামিন নামঞ্জুর করা হয়। এমনকি হাইকোর্টেও দুই দুইবার জামিন আবেদন করলে নিরাপত্তার কথা বলে জামিন আবেদন প্রত্যাখান করা হয়।

মামলার তদন্তকারী অফিসার মামলার অভিযোগপত্র প্রদান করার পর আমার মামলা কুমিল্লা কোর্ট থেকে ঢাকা সাইবার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হয়। যার প্রেক্ষিতে দীর্ঘ ১৬ মাস পর আমাকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রেরণ করা হয়। ঢাকা সাইবার ট্রাইব্যুনালে আমি দুইবার জামিনের জন্য আবেদন করি, কিন্তু দুইবারই প্রত্যাখান করা হয়। সর্বশেষ তৃতীয় বার হাইকোর্টে জামিনের জন্য আবেদন করলে আমাকে মহামান্য হাইকোর্ট ১১ নভেম্বরে ২০২০ তারিখে ১ বছরের অর্ন্তবর্তীকালীন জামিন প্রদান করেন। অবশেষে ২০ নভেম্বর ২০২০ তারিখে ১৮ মাস কারাগারে বন্দী থাকার পর অবশেষে আমি জামিনে মুক্ত হই।

জেল থেকে মুক্ত হয়ে আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রত্ব ফিরে পাওয়ার জন্য যোগাযোগ শুরু করি। আমি আমার ছাত্রত্ব ফিরে পাওয়ার জন্য এবং আমাকে আমার অনার্স শেষ বর্ষের শেষ সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে অনার্স শেষ করার সুযোগ প্রদান করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের নিকট আবেদন করি। বারংবার আবেদন করার পরেও তারা কোনো ধরনের পদক্ষেপ না নিয়ে শুধু আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছিলেন। অতঃপর আমি নিরুপায় হয়ে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির শরণাপন্ন হই। এবং ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সহযোগিতার কারণে এবং তাদের হস্তক্ষেপ করার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন আমাকে আমার ছাত্রত্ব ফিরিয়ে দেয় এবং পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ প্রদান করে। ইতিমধ্যে আমি আমার অনার্সের ফাইনাল ইয়ারের ফাইনাল সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি।

গত ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকা সাইবার ট্রাইব্যুনালে এই মামলায় আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু করা হয়। পরবর্তীতে দেশের বিভাগীয় জেলাগুলোতে সাইবার ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হলে আমার মামলা ঢাকা সাইবার ট্রাইব্যুনাল থেকে চট্টগ্রাম সাইবার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হয়।

আমার মামলায় বাদী এবং সাক্ষী করা হয়েছিল সেদিনকার ষড়যন্ত্রকারী এবং আক্রমণকারী রিয়াজ উদ্দিন এবং তার সহআক্রমণকারীদের। ইতিমধ্যে কোর্ট কর্তৃক মামলার বাদীর উদ্দেশ্যে ৪ বার সমন জারি করা হয়েছে রিয়াজ উদ্দিনকে কোর্টে সাক্ষ্য প্রদান করার জন্য। কিন্তু কোর্ট তাকে হাজির করতে সক্ষম হয়নি। যার কারণে আমার মামলার বিচারিক কার্যক্রম আরো দীর্ঘায়িত হচ্ছে। প্রতি ২ মাস অন্তর আমাকে সেই পটুয়াখালী থেকে চট্টগ্রাম গিয়ে কোর্টে হাজিরা দিতে হচ্ছে। এই মামলার ব্যয়ভার বহন করতে বর্তমানে আমি হিমশিম খাচ্ছি। বর্তমানে এই মামলা চলমান থাকার কারণে এবং এই মামলার বোঝা মাথায় বহন করে আমি কোনো কর্মক্ষেত্রেও প্রবেশ করতে পারছি না এবং আমি মাস্টার্স প্রোগ্রামে ভর্তি হয়ে পড়ালেখা শুরু করতে পারছি না। মামলার ব্যয়ভার এবং এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এই মামলা পরিচালনা করা আমার জন্য দূরহ এবং কষ্টসাধ্য হয়ে উঠছে। আমি এই নির্যাতন ও হয়রানি মামলা থেকে মুক্তি চাই।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভিকটিম কুমিল্লার কৃষ্ণ চন্দ্র শীল (আইনজীবীর মাধ্যমে প্রদত্ত)

আমাদের এলাকায় আমরা কয়েকটি সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবার বসবাস করে আসছি। আমার পরিবার দরিদ্র হওয়ায় আমি লেখাপড়া করতে পারি নাই। তাই অনেক অল্প বয়সে ঢাকায় একটি সেলুনে কাজ করে আসছিলাম। বিগত ০৯/০৯/২০১৭ ইং তারিখে আমি ঢাকা থেকে বাড়ি যাওয়ার পথে আমার এলাকার কিছু ছেলে আমাকে আটকে রেখে অনেক মারধর করে। তারপর তারা গ্রামবাসীসহ আমাদের বাড়িতে হামলা এবং লুটপাট চালায়। তাদের অভিযোগ আমার ফেসবুক আইডিতে কি যেন পাওয়া গেছে। কিন্তু এই বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। শৈশবে আমার মা মারা যায়। তখন থেকে অনেক কষ্ট করে বড় হয়েছি। লেখাপড়া না করার কারণে নিজের নামটি পর্যন্ত ঠিকমত লিখতে পারি না। এমতাবস্থায় এলাকার কিছু প্রভাবশালী লোক এসে বিষয়টি সমাধানের জন্য আমার পরিবারের নিকট বেশ কিছু টাকা দাবী করে এবং ঘরবাড়ি ফেলে রেখে এলাকা ছাড়তে বলে। আমার বাবা অনেক আকুতি মিনতি করে বলে, আমি গরীব মানুষ এত টাকা কোথায় পাব? আর বাপ-দাদার ভিটে ছেড়ে কোথায় যাব? তখন তারা পুলিশ ডেকে এনে আমাকে তাদের হাতে তুলে দেয়। পুলিশ আমাকে দাউদকান্দি মডেল থানায় নিয়ে যায় এবং সেখানে ধর্ম অবমাননার দোষারোপ করে আমাকে আবার মারধর করে। আমার বয়স তখন ১৫ বছর। অনেক ভয় এবং আতঙ্কে আমার প্রাণ যায় যায় অবস্থা। সেই সময় আমাকে সাহায্য করার মত কেউ ছিল না। আতঙ্কে আত্মীয়স্বজন পাড়া প্রতিবেশী কেউ আমার সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেনি। পুলিশের কাছে অনেক আকুতি মিনতি করেছিলাম যে, স্যার আমি কোনো অপরাধ করি নাই, আমাকে আর মাইরেন না। কিন্তু তারা আমার কোনো কথাই শোনে নাই। তাদের একটাই কথা আমি নাকি ইসলাম ধর্মকে অপমান করেছি। এক পর্যায়ে আমি অজ্ঞান হওয়ার পর জ্ঞান ফিরলে বলে, আমাকে মারধরের কোন কথা যেন আদালতে না বলি এবং পুলিশ যা বলে তা যেন আদালতে বলি। তা না হলে আমাকে নাকি মেরে ফেলবে।

আমি তখন অনেক ভয় পেয়ে যাই এবং আমার শরীরের অবস্থা অনেক খারাপ ছিল, তারপর আমাকে দাউদকান্দি হতে কুমিল্লা কোর্টে প্রেরণ করে। আমি নির্যাতনের ভয়ে পরিবারের কথা চিন্তা করে আদালতে পুলিশের কথামত দোষ স্বীকার করি, যা কখনও আমি করি নাই। তারপর আমি আড়াই মাস কারাগারে থাকার পর জামিন পাই। আমি একটানা দুই বছর আদালতে হাজিরা দিয়েছি, একটি তারিখ ও মিস করি নাই। এরপর মামলাটি কুমিল্লার আদালত থেকে ঢাকায় সাইবার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। ঢাকার আদালতে হাজিরা দিতে গেলে আমার জামিন বাতিল করে আবার আমাকে কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। আমি তখন দীর্ঘ নয় মাস কারাগারে ছিলাম, তারপর হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়ে বের হবার পর আমার মামলা আরো একবার ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের আদালতে স্থানান্তর করা হয়।

এখন আমার মামলাটি চট্টগ্রামে চলমান আছে, দীর্ঘ ৫ বছর ধরে মামলা চালিয়ে আমি এবং আমার পরিবার আজ নিঃস্ব হয়ে পথে বসে গেছি। আমি পরিবারের বড় ছেলে, ছোটবেলা থেকে অন্যের সেলুনে কাজ করে সংসার চালিয়ে আসছি। আমাদের পরিবারের কেউ কোনো দিন মামলাতে জড়াই নাই। আমার কারাবাসে এবং মামলার চিন্তায় বাবা অসুস্থ হয়ে এখন মৃত্যু পথযাত্রী। আমি আর এই দুর্ভোগ সহ্য করতে পারছি না। আপনাদের কাছে আমার আকুতি, আমি বাঁচতে চাই, আমাকে বাঁচান।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভিকটিম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সঞ্জু বর্মণের মা উমা রানী বর্মণ (আইনজীবীর মাধ্যমে প্রদত্ত)

আমি উমা রানী বর্মণ, সঞ্জু বর্মণের মা। ফেসবুকের মাধ্যমে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও অনুভূতিতে আঘাত দানের অভিযোগ তুলে আমার ছেলে সঞ্জুকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ এর ২৮২) ধারার অপরাধে তাকে গ্রেফতার করে সূত্রে বর্ণিত (ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ এর ২৮২) ধারার মামলা করে তার বিরুদ্ধে। বিগত ১৯/১০/১৮ইং তারিখ সন্ধ্যা ০৬.৫১ টার সময়ে তার ফেসবুক টাইমলাইনে দীর্ঘ স্ট্যাটাস এর মাধ্যমে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। সবাই জানে যে, আমার সন্তান সঞ্জু লেখাপড়া জানে না। এমনকি সে নিজের নামও স্বাক্ষর করতে পারে না। তারপরও কোনো ধরনের যাচাই বাছাই না করেই তাকে গ্রেফতার পূর্বক সূত্রে বর্ণিত মামলার মাধ্যমে অভিযোগ আনা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত। সে ষড়যন্ত্রের শিকার। তার পক্ষে বর্ণিত স্ট্যাটাস দেওয়া কোনো অবস্থাতেই সম্ভব নয়। স্ট্যাটাস পর্যালোচনায় অনুমান করা যায় যে, স্ট্যাটাসটি কোনো একজন অনেক পড়াশোনা জানা ব্যক্তি কর্তৃক লেখা এবং সম্পূর্ণ ষড়যন্ত্রমূলক ভাবে স্ট্যাটাসটি তৈরি করা হয় এবং পোষ্ট দেওয়া হয়। সঞ্জু বর্মণ উক্ত মামলায়  ব্র্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা জজ আদালত হতে ১৯/১২/২০১৮ইং খিঃ তারিখ জামিন পায়। গত ৭/২/২০১৯খিঃ তারিখ তদন্তকারী কর্মকর্তা সঞ্জু বর্মণের নামে অভিযোগপত্র দাখিল করে। মামলাটি এখন ব্রাহ্মণবাড়িয়া শিশু আদালতে বিচারাধীন আছে। আমার সন্তান সঞ্জু একজন শিশু। অথচ তার নামে অমানবিক  ও ষড়যন্ত্রমূলক মামলা করা হয়েছে। তার জন্ম তারিখ ০১/১২/২০০১। ঘটনার সময় তার বয়স ছিল ১৬ বছর ১০ মাস। সুতরাং এটি স্পষ্ট যে, সঞ্জু এবং আমাদের পরিবারকে হয়রানি করার জন্যই এই মামলা করা হয়েছে। মামলায় হাজিরা দিতে দিতে আমার পরিবার আজ নিঃস্ব। আপনাদের সকলের কাছে আমাদের আকুল আবেদন, আমাদেরকে এই হয়রানি থেকে বাঁচান। আমাদের সাহায্য করুন।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভিকটিম হবিগঞ্জের রজত রায়

আমি একজন সনাতন ধর্মাবলম্বী ক্ষুদ্র মুদি ব্যবসায়ী।  ২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি হেফাজত-জামায়াত-বিএনপি (হেজাবি) সন্ত্রাসীরা আমার ফেসবুকে ‘পবিত্র ক্বাবা শরিফের উপর হনুমানের মূর্তির ছবি পোষ্ট করেছে। তারা এটি পোস্ট করার পর আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে অপপ্রচার চালিয়েছে। আমি আদৌ ধর্ম অবমাননাকর পোস্ট করেছি কিনা এ অভিযোগের তদন্ত হওয়ার আগেই এলাকায় হেজাবি গোষ্ঠী সাম্প্রদায়িক উম্মাদনা সৃষ্টি করে। আমার বাড়িঘর ভাঙচুর এবং আমাকে মারধর করে। এরপর আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করে। মামলা নং (নবীগঞ্জ থানা মামলা নং-১৮/৪৫, তাং-১৯/০২/১৭)। মামলা করার পর আমাকে গ্রেপ্তার এবং নির্যাতন করে। আমি প্রাণের ভয়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় যা বলেছি তা মোটেই সত্য নয়। আমার গ্রামে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের জন্য যারা দায়ী তাদেরকেই সাক্ষী বানিয়ে আদালতে অভিযোগ পত্র (চার্জশীট) জমা দেওয়া হয়েছে অথচ আজ পর্যন্ত তাদের কোনো প্রকার শাস্তি বা বিচার হয়নি। এক অর্থে আমি গ্রেফতার হয়ে প্রাণে বেঁচে গেছি কারণ রামুর উত্তম বড়–য়ার মত নিখোঁজ হইনি। বিগত ৫ বছর ধরে এই কথিত মিথ্যা মামলায় হাজিরা দিতে গিয়ে খরচ চালাতে রীতিমত আজ আমি নিঃস্ব হয়ে পড়েছি। আমার বিরুদ্ধে দায়ের মামলাটি (সাবেক সাইবার ট্রাইবুনাল ঢাকা ৪৭৯/১৭) বর্তমান সাইবার ট্রাইব্যুনাল সিলেট মামলা নং-৪০/২১ চলমান রয়েছে। আপনাদের কাছে আমার আকুল আবেদনÑ আমি বাঁচতে চাই। আমাকে এই হয়রানি থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য করুন।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভিকটিম কুমিল্লার শিক্ষক শংকর দেবনাথ

২০২০ সালের অক্টোবরের ৩১ তারিখ শনিবার সন্ধ্যে ৬ টার সময় আমার কাছে এক ছাত্রের ফোন আসে। সে বলে, “স্যার আপনার বিরুদ্ধে গ্রামের বাজারে লোক জড়ো হচ্ছেÑ মিটিং হচ্ছে  আপনি নাকি ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে কি মন্তব্য করেছেন। কথাটি শুনে আমি একেবারে হতবাক হয়ে যাই। আমার মনেও নেই, কবে কি মন্তব্য করেছি। পরে জানতে পারি, ঘটনার ছয়দিন আগে ফ্রান্স থেকে কিশোর দেবনাথ কিশান নামে এক ব্যক্তি লিখেছে- “ফ্রান্স এর সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, ঐতিহ্য বজায় রাখার জন্য ফরাসি প্রেসিডেন্ট গধপৎড়হ বিভিন্ন অসামাজিক ও অমানবিক চিন্তা ভাবনাকে শায়েস্তা করার জন্য যে উদ্যোগ নিয়েছে তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়”। আমি এই ঢ়ড়ংঃ এর উপর কমেন্ট করেছি “স্বাগতম প্রেসিডেন্টের উদ্যোগকে”। আমি গ্রামে থাকি, ফ্রান্সে তখন কি ঘটেছে আমি জানতামও না। তাছাড়া এই ঢ়ড়ংঃ এর মধ্যে কোনো ধর্ম, ইসলাম, নবীজী সম্পর্কে কোন শব্দ বাক্য উল্লেখ ছিল না।

আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটি কুচক্রীমহল ধর্ম অবমাননার মিথ্যা গুজব তুলে আমাকে সর্বস্বান্ত  করে দেয়। আধা ঘন্টার মধ্যে সন্ধ্যা ৬টা ৩০ এর দিকে মিছিলের শব্দ শুনতে পাই। তখন আমার স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে প্রাণভয়ে শুধু এক কাপড়ে  প্রতিবেশীর এক বাড়িতে আত্মগোপনে চলে যাই। ঘর থেকে কোনো কিছুই নিয়ে যেতে পারি নাই। কিন্তু কানাডা প্রবাসী আমার শতবর্ষী মাকে জোর করেও আনতে পারি নাই। উনি প্রাণ গেলে তবুও ভিটেমাটি ছাড়বেন না।

কিছুক্ষণের মধ্যে দুষ্কৃতিকারীরা আমার বসতবাড়ী ৬ রুম বিশিষ্ট বিল্ডিং, এবং ৫০০ ছাত্রছাত্রী  অধ্যুষিত অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন আমার স্কুলটি ভাঙচুর ও লুটপাট করে আগুন লাগিয়ে আমার সবকিছু পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। আর আমার শতবর্ষী মা বাড়ীর কর্তারে অবস্থিত একটি টয়লেটে গিয়ে প্রাণ রক্ষা করেন, পরে শেষ রাত্রে অজ্ঞান অবস্থায় কিছু লোক তাকে উদ্ধার করে এবং তিনি প্রাণে বেঁচে যান। ঘটনাটি কুমিল্লার কিছু স্থানীয় পত্রিকায়ও প্রকাশিত হয়েছিল।

তারপর রাত ১০ টার দিকে আমি আমার প্রাণ রক্ষার্থে পুলিশের সাথে যোগাযোগ করে পুলিশ কাস্টোডিতে চলে যাই। পুলিশ আমাকে অধিক নিরাপত্তার কথা বলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এলাকার কাউকে দিয়ে মামলা করিয়ে আমাকে কুমিল্লা জেল হাজতে পাঠিয়ে দেয়। পরের দিন আমার পরিবার পরিজন ঐ গোপন জায়গা থেকে কোনো রকমে প্রাণ বাঁচিয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে আসে। এদিকে, আমার বাড়ি, স্কুল পোড়ানোর পরপরই একই গ্রামে অবস্থিত বাসিন্দা যা আমার বাড়ি থেকে কমপক্ষে আধা কি.মি দূরে অবস্থিত আমার অত্যন্ত প্রিয়ভাজন ঘনিষ্ঠ টানা ২০ বৎসরের জননন্দিত চেয়ারম্যান অধ্যাপক বনকুমার শিবের অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন নতুন ডুপ্লেক্স বাড়িটিসহ তার ভাইদের আরও ৮টি বসতঘর পুড়িয়ে দেয় এবং তাকে প্রাণনাশেরও হুমকি দেয়। এখানে উল্লেখ্য যে আমার গ্রামটি একটি হিন্দু প্রধান অধ্যুষিত গ্রাম। কিন্তু আর কারো বাড়িতে আগুন লাগানো হয় নাই। তখনকার পত্রপত্রিকার, এলাকার অধিকাংশ লোকজন সহ প্রশাসনের ভাষ্যমতে, এটি সম্পূর্ণ একটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। যেটা মূলত চেয়ারম্যান বনকুমার শিবকে কেন্দ্র করে করা হয়েছিল।

আমার ও চেয়ারম্যান এর পরিবারের মধ্যে রাজনৈতিক ও পারিবারিক সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত নিবিড়। এই সম্পর্কই যে আমার জন্য কাল হলে দাঁড়াবে আমি কোনোদিন তা ভাবতেও পারিনি। এখানে উল্লেখ্য যে এই আগুনের ঘটনার প্রায় ১০ দিন আগে আমার স্কুলটি মধ্যরাতে কে বা কারা আগুন ধরিয়ে দেয়। যা থানায় জি.ডি. করা আছে।

আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ওহঃবৎহধঃরড়হধষ জবষধঃরড়হং এ স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নিয়ে এবং আমার স্ত্রীও স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নিয়ে ১৯৯৯ সালে বাড়ীতে ব্লু বার্ড কিন্ডার গার্টেন নামে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করি। একটা পিছিয়ে পড়া সমাজে সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের শিক্ষাদানের মহান ব্রত নিয়ে আমরা শিক্ষকদম্পতি এই পেশায় নিজেদেরকে পুরোপুরি নিয়োজিত করি। একটানা ২২টি বৎসর ১৮ জন টিচার ও ৫০০ ছাত্রছাত্রী নিয়ে অত্যন্ত সুনামের সাথে বিদ্যালয়টি পরিচালনা করে আসছিলাম। এই ২২ বছরে আমার স্কুল থেকে ২৫০ জনের অধিক ছাত্রছাত্রী ৫ম শ্রেণিতে চঊঈ পরীক্ষায় ট্যালেন্টপুল ও সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি পেয়ে মুরাদনগর উপজেলার মধ্যে টপ র‌্যাংকিং রেজাল্ট এর ধারাবাহিকতা আমি নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত রেখেছি। এখন আমার হাতে গড়া অনেক ছাত্রছাত্রী দেশে বিদেশে বিভিন্ন নামকরা ইউনিভার্সিটিতে, মেডিকেলে ও ইঞ্জিনিয়ারিং এ অধ্যয়নরত অবস্থায় আছে এবং অনেকে আজ সুপ্রতিষ্ঠিত। আমার শিক্ষকতার সুনাম, স্কুলের সুনাম ও চেয়ারম্যানের সাথে ঘনিষ্ঠতা আমার এই ভয়াবহ পরিণতি আনতে পারে তা আমি কখনোই ভাবিনি।

আমি শতশত অসহায় গরিব শিশুদের বিনা পয়সায় পড়িয়েছি যাদের সরকারি প্রাইমারী স্কুলে পড়ার সংগতি নাই। আমার পুরো পৈত্রিক বাড়িটিকে স্কুল বানিয়ে ফেলেছিলাম। আমার প্রচেষ্টায় আমাদের এলাকায় ঝরে-পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা একেবারেই কমে গিয়েছিল।

এলাকার অভিভাবকদের প্রতি আমার একটাই মেসেজ ছিল- জমি, বাড়ি, গাড়ি করার চেয়ে একটা শিক্ষিত সুসন্তান অনেক বড় সম্পদ। শিক্ষিত সুসন্তানের পিতা মাতা হওয়া অনেক বেশি গর্বের ও গৌরবের। আমি শুধু বীজটা বপনের কাজ করতাম। কাজটা মূলত মায়েরাই এগিয়ে নিয়ে যেত। আমি মায়েদের পড়ঁহংবষষরহম-এর কাজটা করতাম। এ ক্ষেত্রে অনেকটা সফলও  হয়েছি। কিন্তু একটা ঝড় আমার জীবনের সব অর্জন তছনছ করে দেয়। আমার মুরাদনগর উপজেলায় আমাকে স্ব-শরীরে  অনেকেই চিনে না, কিন্তু শংকর মাস্টার বললে সবাই এক নামে চেনে।

এখন জীবন সায়াহ্নে এসে মনে হচ্ছে  যা করেছি সবই ভুল । নাড়ির টান, মায়া মমতা, ভালবাসা সবই মরিচীকা মিথ্যা। আমার বিচারের বাণী নিরবে কাঁদে। আজ আমি নিঃস্ব, জীবন্মৃত, গ্লানি নিয়ে জন্ম ভিটে ছেঁড়ে বেঁচে আছি। জীবনের ছন্দ, স্বার্থকতা খুঁজে পাই না। আমি যদিও সরাসরি রাজনীতির সাথে যুক্ত নই তবে  আমি বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ভক্ত ছিলাম এবং এখনও আছি । এখন কোথাও যেন ভরসা পাচ্ছি না। ৪ মাস ১১ দিন হাজত বাস, তারপর হাইকোর্টের জামিন,  কিছুদিন পর পর কোর্টে হাজিরা দেওয়া,  আমার বিরুদ্ধে পুলিশের মিথ্যা চার্জশিট,আবার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাজার ভয়, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, হার্টের অসুখ (দুটি রিং পরিহিত), ছেলে মেয়ের অনিশ্চিত ভবিষ্যত, ডায়বেটিস, শতবর্ষী বৃদ্ধ মায়ের যতœ, অর্থাভাব এবং সদা সর্বদা একটা অজানা ভয় আমাকে দুঃশ্চিন্তা ও আতঙ্কগ্রস্ত করে রাখে। আমি পরিপূর্ণ একজন অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ। অনেক মুসলিম গরীব অসহায় ছাত্রছাত্রী আমার বাসায় রেখে বিনা পয়সায় খাওয়া দাওয়ার দায়িত্ব নিয়েও পড়িয়েছি আমি । এলাকায় এরকম বহু নজির রেখেছি  যার  প্রমাণ এলাকার মানুষদের কাছ থেকে পাওয়া যাবে।

পরিশেষে মানবদরদী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, রাষ্ট্র ও দেশবাসীর কাছে  আমার আকুল আবেদন- আমাকে অতিদ্রুত এই মিথ্যা মামলা থেকে মুক্তি দিন। আমি একটু ভালভাবে বাঁচি। আমি এ মামলার গ্লানি আর সইতে পারছি না। আমাকে মুক্তি দিন। আমি আর এভাবে বাঁচতে চাই না।

Ecare Solutions
শর্টলিংকঃ