জয়তু শেখ হাসিনা, আপনাকে অভিনন্দন

Ecare Solutions

একুশের অমর গানের স্রষ্টা প্রয়াত আব্দুল গাফফ্ার চৌধুরীকে বঙ্গবন্ধু একসময় বলেছিলেন, একাত্তর নিয়ে অমন আরেকটা গান লেখার জন্য। গাফফার চৌধুরী বিনয়ের সঙ্গে উত্তর দিয়েছিলেন, অমন সৃষ্টি জীবনে একাধিকবার করা কঠিন। যেমন বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ। ঘটনাটি প্রয়াত গাফফার চৌধুরীর মুখে শোনা। যেমন গত বুধবারের প্রেস কনফারেন্সটি। সঙ্গত কারণেই আমি সেখানে ছিলাম না। থাকার কোনো সঙ্গত কারণও ছিল না, কারণ আমি পেশায় স্বাস্থ্যসেবা কর্মী, সংবাদকর্মী নই। তবে প্রেসকনফারেন্সটি আমি শুনেছি এবং হাল জমানার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে একাধিকবারই শুনেছি এবং প্রতিবার শোনার পর সশরীরে ওখানে থাকতে না পারায় একটু হলেও আক্ষেপ জন্মেছে। প্রেসকনফারেন্সটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর চলমান প্যান্ডেমিকের মধ্যে এই প্রথম সাংবাদিকদের মুখোমুখি হলেন। তবে ওখানে উপস্থিত না থাকতে পারায় আমার আক্ষেপটা সেই কারণে নয়। আমার দৃষ্টিতে এটি প্রধানমন্ত্রীর একটি ল্যান্ডমার্ক প্রেসকনফারেন্স। কারণ মূলত উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই প্রেসকনফারেন্সটিতে তিনি এমন কিছু সংজ্ঞা দিয়েছেন, যা আগামীর বাংলাদেশকে নতুন করে চেনাবে।

আমাদের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় যারা সহযোগী, বিশ্বব্যাংকের মতো সেই বন্ধুদের নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন তিনি এই প্রেস কনফারেন্সটিতে। এতদিন আমাদের কাছে তারা ছিলেন ‘দাতা’। তাদের দানের উপর নির্ভর করে আমাদের বর্তমান আর ভবিষ্যত, এই জেনেই প্রাইমারী থেকে শুরু করে এসএসসি, এইচএসসি আর ডাক্তারী পাস করেছিলাম আমরা। ২২ জুন, বুধবারের প্রধানমন্ত্রীর প্রেস কনফারেন্সে চোখটা খুলে গেলো। তারা দাতা নন, কেবলই ‘উন্নয়ন সহযোগী’। তারা আমাদের অনুদান দেন না, আমাদের প্রয়োজনে আমরা তাদের কাছ থেকে উন্নয়ন সহযোগিতা নিই এবং যথা সময়ে তা সুদে এবং আসলে কড়ায় এবং গন্ডায় তাদের বুঝিয়েও দিই। এখানে সম্পর্কটা সমানে সমান, দাতা আর গ্রহীতার নয়।

তবে তারচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা তিনি এই প্রেস কনফারেন্সটিতে দিয়েছেন। বুধবার থেকে বাঙালি জানতে এবং বুঝতে শিখেছে যে তারা আর পরনির্ভরশীল নয়। কবিগুরু একদিন আক্ষেপ করে বলেছিলেন, বাঙালি শুধু বাঙালিই আছে, মানুষ হয়নি। বাহাত্তরের দশ জানুয়ারি সদ্য কারামুক্ত বঙ্গবন্ধু ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কবি গুরুকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, ‘কবিগুরু দেখে যাও তোমার বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে’। সেদিন বঙ্গবন্ধু বুঝলেও বাঙালি সম্ভবত বুঝেনি। বুঝলে স্বাধীনতার সাড়ে তিন বছরের মাথায় বাঙালির হাতে বাঙালির সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সন্তানের অমন পরিণতি হতো না। বাঙালি একাত্তরে কি পেয়ে পঁচাত্তরে কি হারিয়েছিল তা বুঝেছে গত বুধবার। পরনির্ভরশীলতায় অচলায়তন ভেঙে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মান বাঙালির সত্যিকারের স্বাধীনতা আর স্বাবলম্বীতার প্রমাণ। পদ্মার বুকে ওই মেগা স্ট্রাকচারটি শুধু একটি রেকর্ড ব্রেকিং ব্রিজই নয়,  এটি নিজেকে নতুন করে চিনতে শেখা আর বাঙালি জাতির প্রতি এই ব্রিজের কারণে আমাদের জিডিপিতে কত শতাংশ যুক্ত হবে তা আদৌ গুরুত্বপূর্ণ নয়। বাঙালি একদিন পদ্মার ওই সেতুর চেয়েও আরো মেগা আরো অনেক প্রজেক্ট আগামীতে বাস্তাবায়ন করবে তাও আমি বাজি ধরে বলতে রাজি। কিন্তু বাঙালি আজ পদ্মা সেতুর দ্বিতীয়টি বানাতে পারবে না। যা একটি সাবলম্বী স্বাধীন জাতি হিসেবে বাংলাদেশের বাঙালিকে বিশ্বের সামনে স্বগৌরবে তুলে ধরবে।

চীন যখন এই সেতুকে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ বলে এই কৃতিত্বে ভাগ বসাতে চায় আমি তখন তাতে এতটুকুও বিরক্ত হই না। কিংবা সামান্যতমও বিস্মিত হই না যখন জাপান বলে যে তারা দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর নির্মানে সহযোগী হতে চায়। আমার কাছে বরং মনে হয় এমনটাই তো স্বাভাবিক। গর্বের অংশ হয়ে গর্বিত হতে কে না চায়। পদ্মা সেতুটি আমাদের গর্বের সেই জায়গায় নিয়ে গেছেন। আর প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ তিনি আমাদের হাত ধরে, পথ দেখিয়ে  গর্বের সেই ঠিকানায় শুধু পৌছিয়েই দেননি, তার গত বুধবারের এই প্রেস কনফারেন্সটির মাধ্যমে আঠারো কিংবা উনিশ কোটি বাংলাদেশের মানুষকে নিজেদের ঠিকঠাকমতো চিনতেও শিখিয়েছেন। অমন একটি প্রেস-কনফারেন্সে সশরীরে না থাকতে পারার আমার এই আক্ষেপ আর যারা ছিলেন তাদের প্রতি ভীষণ, ভীষণ হিংসে তাই কখনো গোচর নয়। জয়তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।

লেখক: অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)
ডিভিশন প্রধান, ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজি ডিভিশন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
আঞ্চলিক পরামর্শক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা
সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ
অর্থ সম্পাদক, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।

Ecare Solutions
শর্টলিংকঃ