স্বাধীনতাবিরোধী মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তি সমাজে ঘৃণা ও সন্ত্রাসের ভাইরাস ছড়াচ্ছে

Ecare Solutions

আজ রবিবার বিকাল ৩টায় শহীদজননীর ২৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে শহীদজননীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রতি বছরের মতো ‘জাহানারা ইমাম স্মারক বক্তৃতা’, আলোচনা সভা এবং ‘জাহানারা ইমাম স্মৃতিপদক’ প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

এ বছর ‘জাহানারা ইমাম স্মারক বক্তৃতা’ প্রদান করেন বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সভাপতি নাট্যনির্দেশক ও চলচ্চিত্রনির্মাতা বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দীন ইউসুফ। তাঁর বক্তৃতার বিষয় ছিল ‘মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে মৌলবাদের উত্থান এবং আমাদের দায়’। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য প্রতি বছরের মতো এ বছরও বরেণ্য ব্যক্তিত্ব ও সংগঠনকে ‘জাহানারা ইমাম স্মৃতিপদক’ প্রদান করা হয়। এ বছর ব্যক্তি হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল ঢাকার চিফ প্রসিকিউটর ভাষাসৈনিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট গোলাম আরিফ টিপু ও ফরিদা পারভীন ফাউন্ডেশনের সভাপতি লালনগীতি স¤্রাজ্ঞী ফরিদা পারভীন-কে এবং সংগঠন হিসেবে ‘বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার’-কে জাহানারা ইমাম স্মৃতিপদক প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে এডভোকেট গোলাম আরিফ টিপুর পক্ষে সম্মাননা গ্রহণ করেন তাঁর কন্যা ডানা নাজলী।

উক্ত অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে বক্তব্য প্রদান করেন ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইন্সটিটিউটের সভাপতি নাট্যজন বীর মুক্তিযোদ্ধা রামেন্দু মজুমদার, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সহসভাপতি শিক্ষাবিদ শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, ১৯৭১: গণহত্যা নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট-এর সভাপতি অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটর সভাপতি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব গোলাম কুদ্দুস, সম্মাননাপ্রাপ্ত সঙ্গীতশিল্পী ফরিদা পারভীন এবং বাংলাদেশ যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি যাত্রাভিনেতা, পালাকার ও নির্দেশক মিলন কান্তি দে।

সভাপতির প্রারম্ভিক ভাষণে ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র প্রতিষ্ঠাতা আহŸায়ক শহীদজননী জাহানারা ইমামের ২৮তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘তিরিশ বছর আগে নির্মূল কমিটির অভ‚তপূর্ব নাগরিক আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল দুটি প্রধান দাবির ভিত্তিতে১) ’৭১-এর গণহত্যাকারী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং ২) ’৭২-এর সংবিধানে বর্ণিত ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ করে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ ও সমাজ গঠন। আমাদের প্রথম দাবি আংশিক পূরণ হলেও দ্বিতীয় দাবি আজও অর্জিত হয়নি। কারণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিনাশী মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তি রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের আধিপত্য বিস্তারে সক্রিয় রয়েছে, যা আরম্ভ হয়েছে ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকান্ডের পর থেকে। সমাজ ও রাজনীতিতে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে জামায়াত-বিএনপি-হেফাজত। সরকার ও প্রশাসন এ বিষয়ে শুধু নির্বিকার নয়, অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্রয়ও দিচ্ছে। কখনও ওয়াজের নামে, কখনও নামাজের খোৎবার নামে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেভাবে ’৭১-এর পরাজিত শক্তি ভিন্নধর্ম, ভিন্নমত ও ভিন্ন জীবনধারায় বিশ্বাসী মানুষের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ও সন্ত্রাসের ভাইরাস ছড়াচ্ছে একে প্রতিহত করতে না পারলে বাংলাদেশ অন্তিমে মোল্লা উমরের তালেবানি আফগানিস্তানে পরিণত হবে।’

শাহরিয়ার কবির আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করেছে। সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো অনন্যসাধারণ স্থাপনা নির্মাণ করে বাংলাদেশ উন্নয়নের পাশাপাশি গৌরব ও সাহসের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তবে আমাদের যাবতীয় আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের অহঙ্কার জ্ঞান হয়ে যায় যখন আমরা রাষ্ট্র ও সমাজে মানবিক উন্নয়নের বেদনায়ক অধোগতি অবলোকন করি। ধর্মকে যখন বিদ্বেষ-বৈষম্য ও সন্ত্রাস বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যখন ধর্ম-বর্ণ-বিত্ত-লিঙ্গ নির্বিশেষে মানুষের মর্যাদা ধুলায় মিশে যায, যখন সম্প্রীতি ও সহমর্মিতার বোধ যখন হারিয়ে যায়Ñ সে রাষ্ট্র ও সমাজ কখনও সভ্য বলে দাবি করতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিনাশী সকল অপশক্তিকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে মোকাবেলার পাশাপাশি আদর্শিকভাবেও মোকাবেলা করতে হবে। বাঙালির হাজার বছরের ধর্মনিরপেক্ষ মানবতার সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে মৌলবাদের কৃষ্ণগহরে। অসাম্প্রদায়িক বাঙালিত্বের চেতনা রক্ষা করতে হলে সংস্কৃতির ক্ষেত্রে নবজাগরণ ঘটাতে হবে, যেমনটি করেছিলেন পাকিস্তানের কলোনিকালে আমাদের পূর্বসূরিরা। আমরা চাই আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপনের পাশাপাশি বাংলাদেশ মানবিক উন্নয়নের সূচকেও অনুুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

জাহানারা ইমাম স্মারক বক্তৃতায় বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, ‘রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির প্রতিরোধে ২০০৬ এ মৌলবাদ ও জঙ্গি সমর্থিত জাতীয়তাবাদী সরকারের পতন হলে এবং ২০০৮ এর নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির বিজয় হলে মৌলবাদীরা পিছু হটে। কৌশলও বদলে ফেলে। মসজিদ ও মাদ্রাসাকে লক্ষ করে তাদের তৎপরতা চালাতে থাকে। কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা সরকারের নিয়ন্ত্রণে না থাকাতে তাদের মাধ্যমে অর্থাৎ মাদ্রাসা নিয়ন্ত্রক হেফাজতে ইসলামের মাধ্যমে তারা এক নতুন কৌশল অবলম্বন করে। এ কথা আমাদের স্মরণে রাখতে হবে যে, যদিও দেশে একাধিক মৌলবাদী ইসলামী সংগঠন নানা নামে একই লক্ষ অর্থাৎ ইসলামী হুকুমত কায়েমের লক্ষ্যে তাদের কার্যক্রম পরিচালিত করছে। হেফাজতে ইসলাম ২০১৩ সালের গণজাগরণ মঞ্চের যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তির দাবি আন্দোলনের সময় স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করে। যুদ্ধাপরাধী, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ও ২১ আগষ্টের হত্যাকারীদের রক্ষার জন্য ও ইসলামী শাসন কায়েমের লক্ষে বিএনপি ও অন্যান্য ইসলামী সংগঠনের সহায়তায় শাপলা চত্ত¡রে একটি মৌলবাদী সমাবেশ করে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটাতে চেয়েছিল। কিন্তু সরকার ও নতুন প্রজন্মের সামাজিক শক্তির প্রতিরোধে তা নস্যাৎ হয়ে যায়। কিন্তু সমাজের অভ্যন্তরে পুষ্ট হতে থাকা জঙ্গিবাদ ‘হলি আর্টিজান’র মত নৃশংস হত্যাকান্ডের ঘটিয়ে জানান দেয় তাদের ভয়াবহ অস্তিত্ব। আমরা প্রত্যক্ষ করি, একটি ভারসাম্য রক্ষার নিমিত্তে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার হেফাজতে ইসলামকে দমন না করে বশে আনার কৌশল নেয়! বিগত বছরগুলোতে প্রশাসনে নিযুক্ত হওয়া স্বাধীনতা বিরোধীরা এই কৌশল সরকারের কাছে প্রস্তাব করেছে বলে আমাদের ধারণা। কিন্তু এ কৌশল সাময়িক সাফল্য অর্জনে সমর্থ হলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা ফলপ্রসূ হবে না। কেননা, হেফাজতে ইসলাম মনে করে ১৯৭১-এ তারা পরাজিত হয়েছিল। সাধের পাকিস্তান কার্যত ধ্বংস হয়েছে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের জন্য। আর বাংলাদেশের তথাকথিত সকল মৌলবাদী সংগঠনের লক্ষ হচ্ছে মৌলবাদী ইসলামী রাষ্ট্র। যা মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের পরিপন্থী। বর্তমানের সামাজিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ কি আমাদের এ ইঙ্গিত দেয় না যে, বাংলাদেশে এই মানবতা বিরোধী মৌলবাদী শক্তির তীব্র উপস্থিতি? ঐতিহ্যবাহী বাঙালি ও আদিবাসী সংস্কৃতির চ্যালেঞ্জ করে ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে হিংসা ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রচার করে সমাজে হিংসা ও ভিন্নধর্মের প্রতি অসহিষ্ণুতা ছড়িয়ে দিচ্ছে। তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় তাদের এই বিদ্বেষের বীজ ছড়িয়ে যাচ্ছে দেশের আনাচে কানাচে। সমাজ বিভক্ত হচ্ছে। রাষ্ট্র আমাদের মুক্তিযুদ্ধের শক্তির হাতে কিন্তু সমাজ ক্রমশ আমাদের হাত থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। সম্মুখে এক ভয়াবহ সংঘাতময় সময় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।’

নাসির উদ্দীন ইউসুফ আরও বলেন, এ দেশটি তার হাজার বছরের লালিত সংস্কৃতির আলোকে বিকশিত হয়েছে। দেশভাগ, ধর্মীয় দাঙ্গা, রাজনৈতিক সহিংসতা সকল কিছুকে অতিক্রম করে বাংলাদেশ রাষ্ট্র একটি অসা¤প্রদায়িক, সমতা ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে বিকাশমান। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ আজ প্রভূত উন্নয়নের মুখে। এই উন্নয়ন তখনই শতভাগ সফল হবে যখন দেশটি সকল ধর্ম, বর্ণ, জাতিসত্ত¡ার মানুষের হবে। রাষ্ট্রকে এ নিশ্চয়তা দিতে হবে যে শিক্ষা কার্যক্রম একমুখি ও বিজ্ঞানভিত্তিক হবে। কোনো ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব নয় সকল ধর্মের মানবিক শিক্ষাই উত্তম। রাষ্ট্রের সকল স্তরে সকল ধর্ম বর্ণের মানুষের যুক্ত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত হবে। সাংবিধানিকভাবে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। আর এর জন্য দরকার শিক্ষা পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন। নারী পুরুষের সমঅধিকার নিশ্চিত করে পরিবার সমাজে ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালনা করা। দরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা।’

শহীদজননী জাহানারা ইমামকে সাহসের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করে ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইন্সটিটিউটের সভাপতি নাট্যজন বীর মুক্তিযোদ্ধা রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘বাংলাদেশে একদিকে আমরা যখন গৌরবের পদ্মাসেতু উদ্বোধন করছি, অন্যদিকে নড়াইলে শিক্ষকের গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেয়া হচ্ছে। অদ্ভুত বৈপরীত্যের বাংলাদেশ আমাদের। পাকিস্তান আমালের চেয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা দশগুণ বেড়েছে। তাই সংস্কৃতিকর্মীদের সামনে এগিয়ে আসতে হবে। সংস্কৃতিকর্মীরা পরাজিত হননি বরং তারা পিছু হটেছে। এর অন্যতম একটি কারণ রাজনীতির সাথে সংস্কৃতির সংযোগ নেই। এই সংযোগটি ঘটাতে হবে। আমাদের বাংলাদেশে অনেক উন্নয়ন হয়েছে তবে নৈতিক অবক্ষয়ও ঘটেছে। এই অবক্ষয় রোধ করতে না পারলে বাংলাদেশকে সঠিক পথে ফেরানো যাবে না।’

নির্মূল কমিটির সহসভাপতি শিক্ষাবিদ শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের সমাজ ছিনতাই হয়ে গেছে। সমাজ আমাদের হাতে নাই। কিছুদিন আগে পাঁচজন হিন্দু লেখকের কবিতা নবম-দশম শ্রেণির বই থেকে বাদ দিয়ে দেয়া হয়েছে। করোনার সময়ে শর্ট সিলেবাসে ইংরেজি বইয়ের ‘ফাদার অফ দ্যা ন্যাশন’ চ্যাপ্টার বাদ দিয়ে দেয়া হয়েছে। এরকম সু²ভাবে অনেক ঘটনা ঘটছে। এটি পরিকল্পিতভাবে হচ্ছে। আমাদের সংস্কৃতি ধ্বংসের পথে যাচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে পাকিস্তানি-আফগানিস্তানি সংস্কৃতি ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে। এই পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আমাদের সোচ্চার হতে হবে।’

সম্প্রতি মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক দুর্বৃত্তদের হাতে পুলিশের উপস্থিতিতে নড়াইলে মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের লাঞ্ছনার ঘটনার তীব্র নিন্দা করে ১৯৭১: গণহত্যা নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট-এর সভাপতি অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, ‘একজন শিক্ষকের এই অপমান বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজের জন্য চরম অপমান এবং গোটা জাতির জন্যও অপমান। যে পুলিশ কর্মকর্তাদের উপস্থিতি এবং প্রশ্রয়ে এই চরম ন্যাক্কারজন ঘটনা ঘটেছে, সেসব ব্যক্তিকে জবাবদিহিতা ও শাস্তির আওতায় আনতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার জঙ্গি মৌলবাদী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতার ঘোষণা দিয়েছেন। স্বাধীনতাবিরোধী মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে আমাদের রাস্তায় নামতে হবে।’

যেভাবে মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তি ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তে ভেজা এই বাংলাদেশে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে- এর বিরুদ্ধে সংস্কৃতিকর্মীদের একটি মহাসম্মেলন আয়োজনের প্রস্তাব করেন অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন। তিনি একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার ও উদীচী সহ সমমনা সকল প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দকে ঐক্যবন্ধ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণার আহবান জানান।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটর সভাপতি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব গোলাম কুদ্দুস বলেন, ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে যে আন্দোলনের সূচনা জাহানারা ইমাম আরম্ভ করেছিলেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ২৩ বছর আন্দোলন করে আমরা বাঙালি জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছি। বঙ্গবন্ধু সংবিধানে ৪ মূলনীতির দ্বারা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের পর এই মূলনীতির পরিপন্থী গোষ্ঠী পুনরায় বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িকীকরণের প্রক্রিয়া শুরু করেন। রাজনীতিবিদদের উচিৎ অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র বিনির্মাণ করা। আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মীদের উচিৎ সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদবিরোধী এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা।’

ফরিদা পারভীন ফাউন্ডেশনের সভাপতি কন্ঠশিল্পী ফরিদা পারভীন বলেন, ‘আমাকে পদক প্রদান করায় আমি আনন্দিত। আমি ক্ষুদ্র একজন মানুষ। একসময় ডিআইটিতে লালন সাঁইজির গান গাইতাম। অনেকে আমাকে ফোন করে বলতেন, আপনি বেদাতি গান কেন করেন? অনেকে হুমকি দিতো। তখন আমি বলতাম, আমার দোজখ নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না, আপনার বেহেস্ত নিয়ে আপনি ভাবুন। লালন সাঁইজি সকল ধর্ম ও তত্তে¡র কথা বলেছেন। তিনি মানবতা ও সমাজ সংস্কারের কথা বলেছেন। আমরা সকলে মিলে অসুন্দর ও অসত্যকে প্রতিহত করব। মানবতার বাণী ছড়িয়ে দেব একসাথে।’

বাংলাদেশ যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি যাত্রাভিনেতা, পালাকার ও নির্দেশক মিলন কান্তি দে বলেন, ‘১৯৯২ সালের ২৬ শে মার্চ, ঢাকা শহরে গণবিষ্ফোরণ ঘটেছিল। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গণ আদালত গঠিত হয়েছিল। আমরা যাত্রা শিল্পীরা ‘ওগো আমার মা’ শ্লোগান দিতে দিতে গণআদালতে চলে এসেছিলাম। শৃঙ্খলামুক্তি আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশে তার উদ্ভব হয়েছিল। জাহানারা ইমাম আমাদেরকে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের যে পথ দেখিয়ে গিয়েছেন আসুন আমরা সেই পথ অনুসরণ করে দেশ ও সমাজকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাই।’

এর আগে সকাল ৮টায় মিরপুরে শহীদজননী জাহানারা ইমামের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পন করা নির্মূল কমিটির নেতৃবৃন্দ।

Ecare Solutions
শর্টলিংকঃ