হেপাটাইটিস— আর অপেক্ষা নয়

Ecare Solutions

বিশ্ব এখনো অতিমারি সামলাতে ব্যস্ত। মাঝে কমে গিয়ে আবারও চোখ রাঙাচ্ছে কভিড-১৯। বাংলাদেশে নতুন শনাক্ত হওয়া দৈনিক রোগীর সংখ্যা এখনো কয়েক শ থেকে হাজারের কোটায় ওঠানামা করে। জাপানসহ কোনো কোনো দেশে তা ছাড়িয়েছে লাখের কোটা।

এমন সময় ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টাতেই সামনে এলো জুলাইয়ের ২৮ তারিখ। এ তারিখটি হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস আর ভাইরাসটির প্রতিষেধক আবিষ্কারক মার্কিন চিকিৎসাবিজ্ঞানী অধ্যাপক ব্লুমবার্গের জন্মদিন। এই টিকাটি সারা পৃথিবীতে অসংখ্য-অজস্র মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে, কারণ এটি অনেক মানুষের লিভারের ক্যান্সার ঠেকিয়েছে।

বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই, বিশেষ করে এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে লিভার ক্যান্সারের প্রধান কারণই এই ভাইরাস। অথচ এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটির জন্য ব্লুমবার্গ কখনো কোনো পেটেন্ট করেননি। এই মহান চিকিৎসাবিজ্ঞানীর জন্মদিনটিকেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাই বেছে নিয়েছে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস হিসেবে, যা সংস্থাটির অনুমোদিত মাত্র আটটি দিবসের একটি।

এবারের বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে, ‘হেপাটাইটিস—আর অপেক্ষা নয়। ’ প্রশ্ন হচ্ছে, চলমান প্যান্ডেমিকের মধ্যে কি এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়াল হেপাটাইটিস, যে আর একটি মুহূর্তও অপেক্ষা করার সময় নেই আমাদের এ নিয়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এ দেশে প্রতিবছর হেপাটাইটিস ‘বি ও সি’ ভাইরাসজনিত লিভার রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে প্রায় ২০ হাজার মানুষ, যা এই প্যান্ডেমিকে এ পর্যন্ত এ দেশে যতজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে তার অর্ধেকের চেয়ে বেশি। আর কভিড অতিমারিতে যখন বিঘ্নিত হয়েছে নন-কভিড স্বাস্থ্যসেবা, তখন এই সংখ্যা যে বেড়েছে বৈ কমেনি, তা তো বলাই বাহুল্য।

এখন মৃত্যুর এই মিছিল যদি কমিয়ে আনতে হয়, তাহলে সবার আগে মানুষকে সচেতন করতে হবে, যেন তাঁরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জেনে নেন তাঁদের হেপাটাইটিস ‘বি বা সি’ ভাইরাস ইনফেকশন আছে কি না। কারণ হেপাটাইটিস ‘বি ও সি’ ভাইরাসে যাঁরা সংক্রমিত, তাঁদের ৫ শতাংশও জানেন না যে তাঁদের লিভারে জ্বলছে এই ‘তুষের আগুন’।

এটা অবশ্য সংগতও, কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভাইরাস দুটি রোগের কোনো লক্ষণই তৈরি করে না, এমনকি লিভার অনেকখানি আক্রান্ত হয়ে গেলেও না। আর এই সচেতনতা তৈরির কাজটা যে কী দুঃসাধ্য, তা তো কভিডই আমাদের প্রতি মুহূর্তে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। তবে শুধু সচেতনতা সৃষ্টিই যথেষ্ট নয়। যাঁরা সচেতন হয়ে এগিয়ে আসবেন তাঁদের জন্য সহজে আর সুলভে পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। যাঁরা নেগেটিভ রিপোর্ট পাবেন তাঁদের জন্য চাই সুলভে হেপাটাইটিস ‘বি’ ভ্যাকসিন আর পজিটিভ হলে লাগবে সস্তায় ওষুধ আর সহজে লিভার বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে চিকিত্সা নেওয়ার সুযোগ।

এ ক্ষেত্রে যে আমাদের প্রস্তুতি একেবারেই খারাপ তা-ও কিন্তু না। প্যান্ডেমিকটি শুরু হওয়ার আগেই আমরা আমাদের পাঁচ বছর বয়সীদের মধ্যে হেপাটাইটিস ‘বি’র সংক্রমণ ১ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে পেরেছি, যা একটি বড় অর্জন, আর এর স্বীকৃতি দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও। আমাদের রয়েছে একটি অত্যন্ত সফল টিকাদান কর্মসূচি, আর সঙ্গে সরকারের হেপাটাইটিস ‘বি ও সি’ নির্মূলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে আছে একটি অপারেশনাল প্ল্যান বা ওপি। দেশে সম্প্রসারিত হয়েছে লিভার রোগের চিকিত্সার ক্ষেত্র।

২০০৯ সালে যেদিন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন, সেদিন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে শুধু ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে লিভার বিভাগে সহকারী অধ্যাপকের একটি শূন্য পদ ছিল, অথচ আজ তা অনেক বেড়ে গেছে। একসময় শুধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়েই হেপাটোলজিতে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের সুযোগ ছিল।

এখন বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস এবং ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজেও এ বিষয়ে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করা যায়। আর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের সব সেক্টরে যে শনৈঃ শনৈঃ উন্নতি তার ছোঁয়া লেগেছে আমাদের ওষুধশিল্পেও। এ দেশে তৈরি ওষুধ একদিকে রপ্তানি হচ্ছে পৃথিবীর ১০০টিরও বেশি দেশে, অন্যদিকে দেশের মানুষও হেপাটাইটিস ‘বি ও সি’, লিভার সিরোসিস আর লিভার ক্যান্সারের যাবতীয় আধুনিক ওষুধ পাচ্ছে দেশে বসে, অনেক কম খরচে।

পাশাপাশি লিভার রোগের চিকিৎসায় নানা আধুনিক পদ্ধতির প্রচলনেও বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়। এ দেশে লিভার বিশেষজ্ঞরা ন্যাসভ্যাক নামের হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসের একটি নতুন ইমিউনথেরাপির সহ-উদ্ভাবক। বাংলাদেশে উদ্ভাবিত প্রথম ওষুধ হিসেবে ওষুধটির রেসিপি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ড্রাগ কন্ট্রোল কমিটির অনুমোদন পেয়েছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশে পরিচালিত ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ভিত্তিতে ওষুধটি এরই মধ্যে কিউবা, বেলারুশ, নিকারাগুয়া, হন্ডুরাস ও অ্যাঙ্গোলায় অনুমোদন পেয়েছে এবং জাপানে একাধিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যায়ের উদ্যোগে এই ওষুধটির একটি বড় ট্রায়াল বর্তমানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে দেখা যায় ন্যাসভ্যাকই একমাত্র ওষুধ, যা ব্যবহারের পাঁচ বছর পরও বেশির ভাগ রোগীর লিভারে কোনো ধরনের সমস্যা দেখা দেয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইরাল হেপাটাইটিস ফাউন্ডেশন ২০২১ সালে ন্যাসভ্যাককে হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসের বিরুদ্ধে সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল ইমিউনথেরাপি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিভার বিভাগে মুজিববর্ষ উদযাপনের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে লিভার ফেইলিওর রোগীদের চিকিৎসায় ‘মুজিব প্রটোকল’ বা প্লাজমা এক্সচেঞ্জ চালু করা হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশে লিভার সিরোসিসের চিকিত্সায় অটোলোগাস হেমোপয়েটিক স্টেম সেল ট্রান্সপ্লানটেশন শুরু হয়েছে। আর পাশাপাশি লিভার ফেইলিওরের চিকিত্সায় ব্যবহার করা হচ্ছে লিভার ডায়ালিসিস। একইভাবে এ দেশে এখন লিভার ক্যান্সারের রোগীদের জন্য বিশ্বের সর্বাধুনিক লোকোরিজিওনাল থেরাপি রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি অ্যাবলেশন এবং ট্রান্স-আর্টারিয়াল কেমোএম্বোলাইজেশন আর নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কনসেপ্ট ইমিউনথেরাপিও এখন সহজলভ্য।

এর পরও এ কথা মানতেই হবে, আমাদের যেতে হবে এখনো অনেকটা পথ। কারণ সময় হাতে মাত্র ৯ বছর। এসডিজির অন্যতম গোল হচ্ছে ২০৩০-এর মধ্যে পৃথিবী থেকে হেপাটাইটিস ‘বি ও সি’ নির্মূল করা। বাংলাদেশ যেহেতু পৃথিবীর বাইরে নয়, এমডিজিগুলো অর্জনের সাফল্যের কথা মাথায় রেখে আমাদেরও এই কাজটি করেই ছাড়তে হবে। কাজটা এমনিতেই কত কঠিন আর তার ওপর উটকো উৎপাত হিসেবে জেঁকে বসেছে কভিড প্যান্ডেমিক। আর এই যে চিত্রপট, এটি কিন্তু বিশ্বব্যাপী মোটামুটি একই রকম। এ প্রেক্ষাপটেই এবারের বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসের প্রতিপাদ্যে তাই হেপাটাইটিস নিয়ে এত তাড়াহুড়া।

লেখক: অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)
ডিভিশন প্রধান, ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজি ডিভিশন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
আঞ্চলিক পরামর্শক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা
সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ
অর্থ সম্পাদক, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।

Ecare Solutions
শর্টলিংকঃ