আগস্টের ভাবনা – অধ্যাপক ডাঃ মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)

Ecare Solutions

বঙ্গবন্ধু যদি সেদিন ৩২-এ না থেকে থাকতেন গণভবনের সুরক্ষিত পরিবেশে, কিংবা সেদিনের সেনাপ্রধান যদি বঙ্গবন্ধুর ফোনটা পেয়ে সে রাতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতেন, এমনি আরও অনেক ‘কি হলে কি হতে পারতো আর কেন হলো না’ ভাবনাই আমাদের আচ্ছন্ন করে, যখনই আমাদের আলোচনায় আসেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ কিংবা শোকের মাস আগস্ট।

তেমনি বাংলাদেশের যারা প্রতিপক্ষ আর ১৫ আগস্টের যারা কুশীলব আর বেনিফিশিয়ারি, তারাও এ মাসটিকে সঙ্গত কারণেই বরাবরই বেছে নেয় বঙ্গবন্ধু আর বাংলাদেশের গোড়ায় আরও একবার জোরে আঘাত করার জন্য।

এই আগস্টেই এমনি বেশ কিছু তারিখ আছে, যা বাঙালী আর বাঙালীর ইতিহাসকে পাকাপাকিভাবে করেছে কালিমালিপ্ত। আগস্টের ১৭-তে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে তাদের প্রত্যক্ষ মদদে সিরিজ বোমা হামলায় কেঁপে উঠেছিল দেশের ৬৩টি জেলা। ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী জনসভায় বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে যে নির্লজ্জ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালানো হয়েছিল, তাতে স্র্রষ্টার অপার কৃপায় তিনি সেদিন প্রাণে বেঁচে গেলেও, শাহাদৎ বরণ করেছিলেন আইভি রহমানসহ আওয়ামী লীগের অনেক  নেতা-কর্মী।

পাশাপাশি প্রতি আগস্টকে সামনে রেখে পাকিস্তান আর পাকিস্তানীদের পাচাটা পাকিস্তানপন্থী মিডিয়াগুলো নানাভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে বাংলাদেশকে আরও এক দফা বিতর্কে জড়ানোর অশুভ চক্রান্তে। সম্প্রতি ঢাকার পাকিস্তান হাই কমিশনের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের পতাকার একটা ফিউশন ছবি আপলোড করে পাকিরা জন্ম দিয়েছে নতুন বিতর্কের। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর প্রতিবাদও হয়েছে যথেষ্ট।

আমাদের সিভিল সোসাইটি, প্রগতিশীল সংগঠনগুলো আর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আপত্তিতে বাধ্য হয়ে তারা সেই ফিউশন ছবিটি সরিয়েও নিয়েছে। এ বিষয়ে একটা ব্যাখ্যাও দাঁড় করানোর অপচেষ্টা করেছে পাকিস্তান হাইকমিশন। দেশে-দেশে তাদের দূতাবাসগুলোর ভেরিফাইড ফেসবুক পেজগুলোতে তারা নাকি এমন ধরনের ফিউশন ছবিই ব্যবহার করে! তা নিয়ে তাদের হয়ে সাফাইও গেয়েছেন অনেকে।

বলা হয়েছে, ওদের উদ্দেশ্য নাকি আসলে অসৎ ছিল না। পাকিরা ভুলে গেছে যে, আর দশটা দেশ আর বাংলাদেশ এক নয়। আর দশটা দেশে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আর তাদের দালালদের হাতে গণহত্যার শিকার হননি ত্রিশ লাখ শহীদ কিংবা সম্ভ্রম হারাননি তিন লাখ বীরাঙ্গনা।

একইভাবে গত বছরও এই আগস্টেই আমরা দেখেছি পাকিস্তানের প্রচার মাধ্যমগুলো বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের ভিডিওটিকে এডিটিং করে বঙ্গবন্ধুর বক্তব্যের শেষে ‘জয় পাকিস্তান’ জুড়ে দেয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছিল। ‘পাক বাংলা যুক্তরাষ্ট্র’ বলে একটা অদ্ভুতুরে রাষ্ট্রের ফ্ল্যাগও সে সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো হয়েছিল। অর্থাৎ বাংলাদেশের রক্তার্জিত পতাকা নিয়ে ‘ফাজলামো’ করাটা পাকিদের কাছে কোন নতুন বিষয় নয়।

পাকিরা যখন বারবার আমাদের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যেতে চাচ্ছে, আমাদেরও আর ধৈর্য ধরে বসে থাকার সুযোগ নেই। আমাদের একদিকে যেমন পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের মদদদাতা আর কুশীলবদের একটি স্বাধীন কমিশন গঠনের মাধ্যমে ভবিষ্যতের তাগিদে অবিলম্বে চিহ্নিত করতে হবে, তেমনি যুদ্ধাপরাধের জন্য দায়ী জামায়াতে ইসলাম আর ১৯০ জনের বেশি চিহ্নিত পাকিস্তানী সাবেক সেনা সদস্যের বিচারের প্রক্রিয়াটাও শুরু করতে হবে।

এটি আমাদের করতে হবে বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে কলঙ্ক মোচনের তাগিদ থেকেই নয়, পাশাপাশি কথায়-কথায় যারা পাকিদের সুরে হুক্কাহুয়া গেয়ে ওঠে, তাদের মুখটা পাকাপাকিভাবে বন্ধ করার জন্যও। তাছাড়াও ভবিষ্যতের প্রজন্মের সামনে বাংলাদেশটাকে যথাযথভাবে তুলে ধরার জন্যও এর বিকল্প নেই।

লেখক: অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)
ডিভিশন প্রধান, ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজি ডিভিশন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
আঞ্চলিক পরামর্শক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা
সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ
অর্থ সম্পাদক, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।

Ecare Solutions
শর্টলিংকঃ