ধর্মের নামে রাজনীতি বঙ্গবন্ধুর সংবিধানে থাকতে পারে না: শাহরিয়ার কবির

Ecare Solutions

বাংলাদেশের সংবিধানের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ‘বঙ্গবন্ধুর সংবিধানকে সাম্প্রদায়িকতার কলঙ্ক থেকে মুক্ত করুন’ শীর্ষক ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আলোচনা সভায় সংগঠনের সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির একথা বলেন।

সভাপতির প্রারম্ভিক বক্তব্যে লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সংবিধান প্রণেতা তাঁর অন্যান্য সহযোগী এবং ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মদানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে বলেন, ‘আজ আমাদের অত্যন্ত আনন্দের দিন। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির দীর্ঘদিনের দাবি আজ পূরণ হয়েছে। যে দিবসটি দীর্ঘ ষোল বছর আমরা একা উদযাপন করতাম সেই ৪ নবেম্বর আজ সরকারিভাবে পালিত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু ৫০ বছর আগে এই দিনটিতে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংবিধান গণপরিষদে উপস্থাপনের সময় বলেছিলেন, ‘আজকে আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন, সে আনন্দ আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। এই শাসনতন্ত্রের জন্য কত সংগ্রাম হয়েছে এই দেশে। আজকে আমার দল যে ওয়াদা করেছিল তার এক অংশ পালন করলো কিন্তু জনতার শাসনতন্ত্রের কোন কিছু লেখা হয় না। তারা এটা গ্রহণ না করলে প্রবর্তন করা হবে না, ব্যবহার না করলে হবে না। ভবিষ্যৎ বংশধররা যদি সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে শোষণহীন সমাজ গঠন করতে পারে, তাহলে আমার জীবন সার্থক, শহীদের রক্তদান সার্থক’। বঙ্গবন্ধু আরও বলেছিলেন- এই সংবিধান শহীদের রক্তে লেখা হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের দুর্ভাগ্য বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের দর্পণ বাংলাদেশের আদি সংবিধানের মর্যাদা আমরা রাখিনি। সামরিক বাহিনীর দুই পাকিস্তানপ্রেমী জেনারেল ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তে লেখা সংবিধান থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ইতিহাস মুছে ফেলে এর পাকিস্তানিকরণ ও সাম্প্রদায়িকীকরণ করেছিলেন, যে ক্ষত আজও আমরা নিরাময় করতে পারিনি। ৪ নবেম্বর জাতীয় সংবিধান দিবস ঘোষণার জন্য বঙ্গবন্ধুর কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার সরকারকে অভিবাদন জানিয়ে আমরা বলতেই চাই- এখন সময় হয়েছে দুই পাকিস্তানপ্রেমী জেনারেলের দ্বারা কৃত বঙ্গবন্ধুর সংবিধানকে সাম্প্রদায়িকরণের কদর্যতা থেকে মুক্ত করা। সমাজ, রাষ্ট্র ও জনগণের সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে বঙ্গবন্ধু ’৭২-এর সংবিধানে ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিলেন। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি নির্বিঘ্ন ও অব্যাহত রাখার জন্য, ৩০ লক্ষ শহীদ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ৩ নবেম্বরের শহীদদের আত্মদান চিরস্মরণীয় রাখার জন্য সরকারকে ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। ধর্মের নামে রাজনীতি বঙ্গবন্ধুর সংবিধানে থাকতে পারে না।’

আজ শুক্রবার (৪ নভেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবের আব্দুস সালাম মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট আ. ক. ম. মোজাম্মেল হক এমপি।

সভায় বক্তব্য প্রদান করেন মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ভাষাসংগ্রামী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পৌত্রী সমাজকর্মী আরমা দত্ত এমপি, নির্মূল কমিটির সহসভাপতি শিক্ষাবিদ শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, ১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্টের সভাপতি ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বাংলাদেশের প্রাক্তন চেয়ারম্যান মানবাধিকার নেতা কাজী রিয়াজুল হক এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের প্রসিকিউটর (অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল) এডভোকেট মোঃ মোখলেসুর রহমান বাদল।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট আ. ক. ম. মোজাম্মেল হক এমপি বলেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম পারস্পরিক সাংঘর্ষিক। বিভিন্ন সময়ে সংবিধান সংশোধনের পরও ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’-এর জায়গাটি পরিবর্তন হয়নি।’

‘বঙ্গবন্ধু দীর্ঘ ২৩ বছরের লড়াই সংগ্রামের পর স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য যে সংবিধান প্রণয়ন করেন সেখানে তিনি তাঁর সাম্প্রদায়িকতার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা সন্নিবেশিত করেন। কারণ ভণ্ড শাসকরা বিভিন্ন সময় ধর্মকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বার বার আঘাত করেছে। তাই বঙ্গবন্ধু ধর্মকে সংবিধান থেকে দূরে রেখেছিলেন। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর স্বাধীন বাংলাদেশের অধিকাংশ সময়ই স্বাধীনতাবিরোধী মৌলবাদীরা সাম্প্রদায়িক শক্তির মাধ্যমে দেশ শাসন করেছে। যার কারণে মৌলবাদীরা নিজেদের ইচ্ছেমত সংবিধানের পরিবর্তন করেছে। তারা দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকার ফলে তাদের শেকড় সমাজের গভীর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।’

জাতীয় সংগীত গাওয়া ও ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় সর্বক্ষেত্রে ধর্মের অপব্যবহারের প্রভাব শুধু মুখে বলে বন্ধ করা যাবে না। বর্তমানে মাদ্রাসার পাশাপাশি কিছু কিছু কেজি স্কুলেও জাতীয় সংগীত গাওয়া হয় না। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের যে ৩০ ভাগ মানুষ বাংলাদেশের বিরোধীতা করেছিল, সে সংখ্যা নিশ্চয় এখন কমে যায়নি। স্বাধীনতাবিরোধীরা বর্তমানে প্রকাশ্যেই বলছে ১০ ডিসেম্বরের পর এই সরকার আর থাকবে না। নির্বাচন ছাড়া, সরকার ছাড়া, সাংবিধানিকভাবে এটা কেমন করে সম্ভব? তারা সংবিধান মানে না বলেই এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথা বলছে। পৃথিবীতে আমাদের রাষ্ট্রই একমাত্র রাষ্ট্র যেখানে স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ বলতে হয়। যারা সংবিধান মানে তারাও করণীয় সম্পর্কে সচেতন নন। আমি মনে করি, বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক সংবিধান কেবল পুনঃপরিবর্তনই নয় বরং সংবিধান সম্পর্কে আমাদের মনোজগত, চেতনা ও কর্মকাণ্ডে পরিবর্তন আনতে হবে।’

নির্মূল কমিটির দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে ৪ নবেম্বরকে সংবিধান দিবস হিসেবে ঘোষণা করায় তিনি সকলকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বলেন, ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি দীর্ঘদিন ধরে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গড়ার প্রত্যয়ে অবিচল থেকে এগিয়ে যাচ্ছে। অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষে আমরা যেন ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যেতে পারি- সেই প্রত্যাশাই রাখি।’

মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ভাষাসংগ্রামী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পৌত্রী সমাজকর্মী আরমা দত্ত এমপি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর তৈরি করা সংবিধানকে সাম্প্রদায়িকতার কলঙ্ক থেকে যেকোনোভাবে মুক্ত করতে হবে। আমরা যারা শহীদ পরিবারের সদস্য আছি তারা মনের মাঝে অনেক বেদনা নিয়ে বেঁচে আছি। বঙ্গবন্ধু মনে করতেন, ধর্ম কখনো সমাজ-সংস্কৃতি, জাতীয়তা থেকে বড় হতে পারে না। এ জন্যই বঙ্গবন্ধু সংবিধানে ধর্মকে গৌণ করে জাতীয়তাকে প্রাধান্য দিয়ে অসাম্প্রদায়িক সংবিধান রচনা করেছিলেন।’

সমাজকর্মী আরমা দত্ত এমপি পাঠ্যপুস্তকে সংবিধানের পাঠ অন্তর্ভুক্ত করে নিয়মিত চর্চার ক্ষেত্র তৈরি করার জন্য প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি বিনীত অনুরোধ জানিয়ে বলেন ’৭২-এর সংবিধান আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়, আমার সবচেয়ে বড় রক্ষক।

নির্মূল কমিটির সহসভাপতি শিক্ষাবিদ শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেন, ‘অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া ও ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দেওয়া হয় না বরং বাঙালি সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার সকল চর্চা করে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তদারকি করার কেউ নেই। সাম্প্রদায়িকতা বাংলাদেশের সমাজকে প্রভাবিত করছে। সমাজের স্তরে স্তরে ধর্মান্ধতা ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেশভূষার পরিবর্তন দেখে মনে হয়- দেশ আফগানিস্তানে পরিবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু আমরা কোনওক্ষেত্রেই এসব সাম্প্রদায়িক অপশক্তিগুলোর কর্মকাণ্ড প্রতিহত করছি না। ’

তিনি আরো বলেন, ‘স্বাধীনতাবিরোধী মৌলবাদী অপশক্তি আমাদের সমাজে এমন প্রভাব বিস্তার করেছে যে তাদের বিরুদ্ধে কেউ কোন কথা বলতে চায় না। ভয় পায়। কোন দায়িত্বশীল ব্যক্তি বলেন না যে আমার স্কুলে, কলেজে, প্রতিষ্ঠানে রাজাকার-আলবদর ও স্বাধীনতাবিরোধীদের বংশধরদের পড়তে দিব না; চাকরী দিব না। সমাজ ও রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে হলে সকল সাম্প্রদায়িক কর্মকাণ্ড প্রতিহত করতে হবে।’

১৯৭১: গণহত্যা- নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্টের সভাপতি ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, ‘জিয়াউর রহমান থেকে খালেদা জিয়া পর্যন্ত সকলেই সংবিধানবিরোধী কাজগুলি করেছেন। জেনারেল জিয়া খুনিদের লাইসেন্স দিয়েছিলেন হত্যা করার জন্য। পুরষ্কৃতও করেছিলেন। জিয়াউর রহমান ও এরশাদ যে সংবিধানের মূলনীতি তথা রাষ্ট্রের মূলনীতি নষ্ট করেছে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের আজকের নেতৃবৃন্দ কখনও তা আলোচনা করেন না।’

সংবিধানের পটভূমি তুলে ধরে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বাংলাদেশের প্রাক্তন চেয়ারম্যান মানবাধিকার নেতা কাজী রিয়াজুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশের সংবিধানে মূল যে চারটি নীতি রয়েছে তন্মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতা আমাদের সংবিধানকে বিশেষভাবে বৈশিষ্ট্যময় করেছে। বাংলাদেশের সংবিধান কেবল বাংলাদেশের জন্যই নয় বরং তৃতীয় বিশ্বের সকল নিগৃহীত-নিপীড়িত মানুষের স্বাধীনতার কথা বলে, মুক্তির কথা বলে।’

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের প্রসিকিউটর (অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল) এডভোকেট মোঃ মোখলেসুর রহমান বাদল বলেন, ‘তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশের সংবিধান একটি শ্রেষ্ঠ সংবিধান। মাত্র ১১ মাসের মধ্যে বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান রচনা করেন। যেখানে তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অসাম্প্রদায়িকতা প্রতিফলিত করেন। কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধীরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করে। আমরা চাই বঙ্গবন্ধু কন্যা পুনরায় ’৭২-এর অসাম্প্রদায়িক সংবিধানকে প্রতিষ্ঠা করবেন।

Ecare Solutions
শর্টলিংকঃ