শীতের আমেজে অস্থির রাজনীতি

Ecare Solutions

এবারে শীতের আমেজটা বোধকরি একটু আগেভাগেই আসতে শুরু করেছে। ঢাকার বাইরে তো বটেই, এমনকি এই ঢাকা শহরেও সন্ধ্যায় কুয়াশার বেশ আনাগোনা দেখা যাচ্ছে।

এর বিপরীত চিত্রটা অবশ্য দেখা যায় অর্থনীতি আর রাজনীতির ময়দানে। ক্রমশই উত্তাপ বাড়ছে এই দুটো জায়গায়। প্রথমে কোভিড আর তারপর রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধে নুয়ে পড়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতি। ডেইলি মিরর লিখেছে, ব্রিটেনের হাতে নাকি গ্যাসের মজুদ আছে মাত্র নয় দিনের। আর ফ্রান্সের আছে একশ’ তিন দিন চলার মতো গ্যাস। ইউরোপে যখন শীত এলো বলে, তখন গ্যাসের এমনি সংকট শীতের আগেই কাঁপাচ্ছে সবাইকে।

এরই মধ্যে একাধিক ইউরোপীয় দেশ শীতে গৃহস্থালির হিটিংয়ের ওপর কৃচ্ছ্্রতার নীতি বাস্তবায়নের কথা ভাবছে। সঙ্গত কারণেই এর ধাক্কা এসে লাগবে আমাদের বৈদেশিক শ্রমবাজার আর গার্মেন্টের রপ্তানি খাতেও। তার ওপর থাকছে রিজার্ভের ওপর খাদ্য, জ্বালানি আর সার আমদানির খরচ মেটানোর বাড়তি চাপ। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভটা এখনো কোনোমতে টিকে থাকলেও সামনে তাতে টান পড়তে পারে- এমন শঙ্কার কথা জানিয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রীও। আর এমনি একটা সংকট মুহূর্তে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারিদের তৎপরতাও লক্ষণীয়।

বিভাগীয় সমাবেশগুলোর নামে বিএনপি আবারও আরও একদফা জল ঘোলা করতে শুরু করেছে। জায়গায়-জায়গায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বিএনপির সশস্ত্র ক্যাডারদের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। ডিসেম্বরে ঢাকায় মহাসমাবেশে সরকারের পতন ঘটিয়ে বিএনপির বিজয় মিছিলের ঘোষণায় মানুষ সরকার পতনের কোনো সঙ্গত কারণ খুঁজে পাচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু আবারও আগুন সন্ত্রাসের শঙ্কায় শঙ্কিত অনেকেই। এরই মাঝে মাঠে নেমেছে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিও।

জামায়াতের নেতা-কর্মীরা খোলস পাল্টে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি নামে নতুন একটি রাজনৈতিক দলের রেজিস্ট্রেশনের জন্য নির্বাচন কমিশনে আবেদন জমা দিয়েছে। বিষয়টি নিঃসন্দেহে খতিয়ে দেখার দাবি রাখে। শতভাগ নিশ্চিত নই, তবে যতটুকু জানি একটি রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের আবেদন করতে হলে সারাদেশে তাদের গোটাত্রিশেক শাখা থাকার প্রয়োজন পড়ে। এটি নিবন্ধনের অন্যতম পূর্বশর্ত। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির এই শাখাগুলোর অস্তিত্ব এখনো চোখে পড়ছে না।

কোথাও কোনো ফরম্যাটে কোনো মিডিয়াতেই তো দলটির কোনো একটি শাখার কার্যক্রমের একটি রিপোর্টও কারও চোখে পড়েছে বলেও মনে হয় না। এও জানি যে, নিবন্ধন পেলে ত্রিশ কেন দেশের চৌষট্টিটি জেলাতেই জামায়াতিরা বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে, দোকান খুলে ধর্ম ব্যবসায় নেমে পড়বে। সে তো পরের কথা! এখন দলটি নিবন্ধনের শর্ত পূরণ করছে কিভাবে?

এ তো গেল একটি দিক। তার চেয়েও যা অনেক গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, নির্বাচন কমিশনই তো আদালতের নির্দেশে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করেছে। তাই যদি হবে, তা হলে সেই একই নির্বাচন কমিশন এখন আবার কিভাবে জামায়াতিদের ‘নতুন বোতলে পুরনো মদকে’ রেজিস্ট্রেশন দেওয়ার চিন্তা করছে? নির্বাচন কমিশন নিশ্চয়ই কোনো সাইনবোর্ডকে নিষিদ্ধ করেনি! নিশ্চয়ই কোনো সাইনবোর্ড মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়ায়নি।

যে জামায়াতিরা একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছিল, তাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের প্রক্রিয়াটি এখনো চলমান। যখন নির্বাচন কমিশন জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করে, তার মানে সোজাসাপ্টা যা বুঝি তা হলো, এর মাধ্যমে জামায়াতের আদর্শের ধারক ও বাহক, সেদিনের সেসব মানবতাবিরোধী অপরাধীদের উত্তরসূরিদের রাজনীতি করার অধিকারও জামায়াতে ইসলামি নামক দলটির নিবন্ধন বাতিলের মাধ্যমে হরণ করা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কোনো নাজি বর্তমানে সম্ভবত আর বেঁচে নেই।

বাঙালী কোনো নাজির কথাও আমরা কোনোদিন শুনিনি। যান না একবার বার্লিনে। বিমান থেকে নেমে একবার ‘হের হিটলার’ স্লোগানটা দিয়েই দেখুন না! দেখবেন ‘কত কেজি ধান থেকে আসে কত কেজি চাল’! মুহূর্তেই আপনার ঠিকানা হবে জার্মানির কারাগার।

এটাই গণতন্ত্র। এটাই মনুষ্যত্ব। আর এর বাইরে যা কিছু, তার সবটাই পাশবিকতা আর অসৎ উদ্দেশ্যজাত।
জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরকে তো খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই সো-কল্ড বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির যে শীর্ষ নেতৃত্ব, তারা তো ছাত্র শিবিরেরই এক সময়কার নেতা। অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংজ্ঞায় এরা জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত। তারপরও এত কথা বলতে হচ্ছে। কারণ, জঙ্গিদের নেতৃত্বে গঠিত, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সংগঠন বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টিকেই নিবন্ধন দেওয়ার জন্য বিবেচনা করছে নির্বাচন কমিশন।

বরং বলা ভালো একজন ভালো নির্বাচন কমিশনার। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে দলটির আবেদনপত্রটি ঠিকমতো যাচাই-বাছাই না করে দেখলাম তিনি আবেদনপত্রটি জমা দেওয়ার দিন বিকেলেই সাংবাদিকদের জানিয়ে দিলেন যে, নির্বাচন কমিশন এই দলটির নিবন্ধনের আবেদনটি বিবেচনা করবেন। কদিন আগেই দেখেছি, উত্তরবঙ্গের একটি উপনির্বাচন স্থগিত করার পর সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে বৈঠক করে তার যথার্থতা যাচাই করে নিতে। অথচ এত বড় একটা বিষয়ে একজন নির্বাচন কমিশনার এক মুহূর্ত সময় না নিয়ে কি অবলীলায়ই জামায়াতিদের আরও একবার বাংলাদেশটাকে পাকিস্তান বানাবার লাইসেন্স দেওয়ার কথা বলে বসলেন!

নির্বাচন কমিশনে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি নিবন্ধনের আবেদনটি জমা পড়ার পর থেকেই এর প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি। তথ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকার বিষয়টির দিকে নজর রাখছে। আর জামায়াতের বিচারের জন্য আইনের বহুল প্রত্যাশিত এবং ততোধিক বিলম্বিত সংশোধনীটি অবশেষে সংসদে উত্থাপিত হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী।

দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন শেখ হাসিনা, তখন আমার এবং আরও কোটি মানুষের বিশ্বাস আছে, জামায়াতিদের এই সর্বশেষ চালটিও বানচাল হয়ে যাবে। তবে একটাই অনুরোধ থাকবে, এসব বিষয়ে কোনো মন্তব্য করার আগে একটু ভেবেচিন্তে করবেন। মনে রাখবেন, এ মাটিতে শুয়ে আছেন ত্রিশ লাখ নিরপরাধ শহীদ, যাদের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগেই আজ আমরা একেকজন এই সাহেব তো সেই সাহেব।

লেখক: অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)
ডিভিশন প্রধান, ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজি ডিভিশন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
আঞ্চলিক পরামর্শক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা
সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ
অর্থ সম্পাদক, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।

Ecare Solutions
শর্টলিংকঃ