‘জাগরণ সাংস্কৃতিক স্কোয়াড’ -এর আত্মপ্রকাশ

Ecare Solutions

আজ একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির সাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০২৩ সালের ১৯ জানুয়ারি আমরা একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ৩১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করতে যাচ্ছি। প্রতি বছরের মতো এবারও জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্মূল কমিটির শাখাসমূহ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করছে। এই উপলক্ষে কেন্দ্রীয়ভাবে আমরা নির্মূল কমিটির সাংস্কৃতিক স্কোয়াড-এর প্রথম জাতীয় সম্মেলনের আয়োজন করেছি।

১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে শহীদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ১০১ জন বরেণ্য নাগরিক কর্তৃক স্বাক্ষরিত এক ঘোষণার মাধ্যমে সূচিত হয়েছিল একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির অভিযাত্রা। বহু বাধাবিঘ্ন মোকাবেলা করে গত তিন দশকে নির্মূল কমিটি ধর্মনিরপেক্ষ মানবিক রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের বৃহত্তম নাগরিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে এবং বিস্তার লাভ করেছে পাঁচটি মহাদেশে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নির্মূল কমিটির সাংগঠনিক বিস্তৃতির সর্বশেষ উদাহরণ হচ্ছেÑ গত ৮-৯ ডিসেম্বর (২০২২) বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস-এ দুইদিন ব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন। ’৭১-এর গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলমান গণহত্যা বন্ধ করা এবং মিয়ানমারে গণহত্যার শিকার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দ্রুত স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দাবিতে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে ১৫টি দেশের গবেষক, আইনপ্রণেতা, বুদ্ধিজীবী, মানবাধিকার ও শান্তিকর্মী অংশগ্রহণ করেছেন। সম্মেলনে গৃহীত স্মারকপত্রে ৫৫টি দেশের দুই শতাধিক বিশিষ্ট নাগরিক স্বাক্ষর প্রদান করেছেন, যা ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্টকে প্রদান করা হয়েছে।

নির্মূল কমিটির তিন দশকের আন্দোলন ও সংগ্রামে বহু সাফল্য রয়েছে। আমাদের ধারাবাহিক আন্দোলনের কারণে ’৭১-এর শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে এবং বিচারকার্য চলমান রয়েছে। তবে আমাদের প্রধান দাবিÑ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দর্শন, ৩০ লক্ষ শহীদের স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য এখনও আমাদের আন্দোলন করতে হচ্ছে। বিএনপির মদদে ’৭১-এর গণহত্যাকারী, মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক জামায়াত-শিবির চক্র এখনও মহাদর্পে রাজনীতির অঙ্গনে বিচরণ করছে এবং ’৭১-এর পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উপর বার বার আঘাত করছে। বিশেষভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাদীপ্ত বাঙালির আবহমান সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য জঙ্গি মৌলবাদী সন্ত্রাসীদের উপর্যুপরি তাণ্ডব ও হামলায় বিপণ্ন হয়ে পড়েছে।

দুর্ভাগ্যের বিষয়Ñ দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকার কারণে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বপ্রদানকারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দল আওয়ামী লীগেও তৃণমূল পর্যায়ে মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক শক্তির ব্যাপক অনুপ্রবেশ ঘটেছে, যাদের দাপটে আন্দোলন ও সংগ্রামে পোড়-খাওয়া নেতাকর্মীরা বহু জায়গায় কোনঠাসা হয়ে পড়েছে; যা শুধু দলের জন্য নয়, দেশ ও জাতির জন্যও সমূহ বিপদের কারণ হতে পারে।

আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি কীভাবে ধর্মনিরপেক্ষ মানবতায় সমৃদ্ধ বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে। বিশেষভাবে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে গ্রামীন সংস্কৃতির বিভিন্ন অভিব্যক্তিÑ বিভিন্ন ধরনের মেলা, যাত্রা, পালা, পুতুল নাচ, কবির গান, বাউল গান তার জৌলুস হারিয়ে ফেলেছে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে এসব উৎসবের উপর নানাধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করে চিরায়ত বাঙালি সংস্কৃতির কণ্ঠরুদ্ধ করা হয়েছে। অন্যদিকে ধর্মান্ধ, মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িক অপশক্তি ওয়াজ ও জলসার নামে প্রতিনিয়ত ভিন্নমত, ভিন্নধর্ম ও ভিন্ন জীবনধারার অনুসারী মানুষদের প্রতি বিষোদগার করছে। তাদের আক্রমণ থেকে বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ, সংবিধান কিছুই রক্ষা পাচ্ছে না। বাংলাদেশকে তারা মোল্লা উমরের আফগানিস্তান বা জিয়াউল হকের পাকিস্তানের মতো মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র বানাবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে, যাদের প্রধান মদদদাতা হচ্ছে জামায়াত-হেফাজত চক্র। বাংলাদেশে গ্রামে-গঞ্জে যেভাবে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিকাশ ঘটছে, যেভাবে তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জিহাদী আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রতিরোধের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক সংগ্রাম অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।

’৭১-এর গণহত্যাকারী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং গণহত্যার রাজনীতি নিষিদ্ধকরণের জন্য আমরা সামাজিকভাবে জনমত সৃষ্টি পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কার্যক্রমও অব্যাহত রেখেছি, যার একটি আমাদের পাঠাগার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। আমরা গত ৩১ বছরে প্রায় তিনশ পুস্তিকা ও পুস্তক প্রকাশ এবং পনেরটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছি।

২০১৮ সালে জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে আমরা কেন্দ্রীয়ভাবে সাংস্কৃতিক স্কোয়াড, আইন সহায়ক কমিটি, চিকিৎসা সহায়ক কমিটি ও আইটি সেল গঠন করেছিলাম। এ বছর আমাদের জাতীয় সম্মেলনের আগে এসব সহায়ক কমিটিগুলোর সম্মেলন আমরা সম্পন্ন করতে চাই, যা আরম্ভ হচ্ছে সাংস্কৃতিক স্কোয়াডের সম্মেলনের মাধ্যমে। প্রাথমিকভাবে আমরা এর নাম রেখেছি ‘জাগরণ সাংস্কৃতিক স্কোয়াড’। তবে এ বিষয়ে সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।

৩১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে আমরা নির্মূল কমিটির সাংস্কৃতিক স্কোয়াডকে শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামোর উপর দাঁড় করাতে চাই, যাতে স্বাধীনতাবিরোধী মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে বাঙালির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রসারে এটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। এই উদ্দেশ্যে আমরা ১৯ জানুয়ারি (২০২৩) নির্মূল কমিটির সকল জেলা/উপজেলা/ইউনিয়ন/প্রাতিষ্ঠানিক শাখার সঙ্গে যুক্ত সংস্কৃতিসেবী ও কর্মীদের সম্মেলন আহ্বান করেছি। দিনব্যাপী এই সম্মেলনে বাঙালিত্বের চেতনাদীপ্ত ধর্মনিরপেক্ষ মানবতার সাংস্কৃতিক আন্দোলন তৃণমূলে সম্প্রসারিত করার কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

এই সম্মেলন এবং নির্মূল কমিটির আন্দোলনের ৩১ বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আমরা একটি স্মরণিকা প্রকাশ করব যেখানে আমাদের আন্দোলনের তিন প্রজন্মের নেতৃবৃন্দ মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সংস্কৃতি চর্চা ও প্রসারের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে লিখেছেন। সারা দেশে যেভাবে উগ্র মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক অপসংস্কৃতির বিকাশ ঘটছে, যেভাবে ধর্মের নামে হিংসা, বিদ্বেষ, বিভেদ ও সন্ত্রাসের ভাইরাস ছড়ানো হচ্ছেÑ দেশ ও সমাজকে রক্ষা করতে হলে, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তিতে রাষ্ট্র ও সমাজ গঠন করতে হলে প্রগতিশীল সংস্কৃতির ধারাবাহিক চর্চা ও প্রসারের কোনও বিকল্প নেই।

আমাদের ১৯ জানুয়ারির সম্মেলনে সমমনা সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আমাদের সম্মিলিত উদ্যোগ ও আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা অবশ্যই স্বাধীনতাবিরোধী, মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে নির্মূল করতে সক্ষম হব।

Ecare Solutions
শর্টলিংকঃ